ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গর্বের বাংলা ভাষা

3

অমল বড়ুয়া

মানবজাতির আন্তঃযোগাযোগ, ভাব-বিনিময়, আত্মপ্রকাশ ও সৃজনশীলতার অনবদ্য মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। পুরো পৃথিবীই উর্বর বিবিধ ভাষার আতিশয্যে। পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৭,১১১ টি ভাষায় কথা বলা হয়। বিশ্বের প্রায় অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা মাত্র ২৩ টি ভাষা তাদের কথা বলার ক্ষেত্রে ব্যাবহার করে থাকে। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রচারিত ১১টি ভাষা হল চাইনিজ, ইংরেজি, হিন্দি-উর্দু, স্প্যানিশ, আরবি, পর্তুগীজ, রাশিয়ান, বাংলা, জাপানি, জার্মান ও ফরাসী। মানুষের ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘সৃজনশীলতা বা সঞ্জননী’ ক্ষমতা। প্রতিটি মানুষ তার নিজ নিজ ভাষা আয়ত্ত করার সহজাত গুণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং সে যেই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিবেশ-বেষ্টিত ভাষিক সমাজের অন্তর্গত, সেই সমাজে সে দৈনন্দিন ভাষাপ্রয়োগের মাধ্যমে তার নিজস্ব ভাষাজ্ঞান বিকশিত করে। এরকম অনন্য প্রকাশ ক্ষমতা সম্পন্ন ভাষা একান্তই মানবিক বৈশিষ্ট্য; মানুষ ছাড়া আর কোন প্রাণী এই ক্ষমতার অধিকারী নয়। দেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে। নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাগি টলারম্যানের মতে, ‘পৃথিবীতে মানুষই হলো একমাত্র প্রাণী যাদের ভাষা আছে, এই ভাষার কারণে আমরা অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা হয়েছি।’ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে জানা যায়, আফ্রিকার মানুষেরাই সর্বপ্রথম ভাষার ব্যবহার করেছিল। গবেষকদের ধারণা, বর্তমান পৃথিবীর যত মৃত বা জীবিত ভাষা আছে, সেসবের আদি উৎস হলো আফ্রিকার ঐসব প্রাচীন মানুষদের ভাষা। পৃথিবীর ভাষাগুলোকে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেমন: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী, অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠী, আফ্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠী, চীনা-তিব্বতি ভাষাগোষ্ঠী, মালয়-পলিনেশীয় ভাষাগোষ্ঠী, নাইজার-কঙ্গো ভাষাগোষ্ঠী, দ্রাবিড়ীয় ভাষাগোষ্ঠী ইত্যাদি। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের গবেষণামতে, মানুষ পূর্ণাঙ্গ ভাষা খুঁজে পায় প্রায় ১ লাখ বছর আগে। হিত্তিক ভাষা ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এশিয়া মাইনরে বর্তমান ছিল। তুখারিখ ভাষা চীনীয় তুর্কিস্তানে ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্যমান ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের আঞ্চলিক ভাষাগুলোর আদিম উৎস অনার্য ভাষা।
বাংলা ভাষা বিকাশের ইতিহাস ১৩০০ বছর পুরনো। চর্যাপদ এ ভাষার আদি নিদর্শন। বাংলা ভাষার লিপি হলো বাংলা লিপি। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ থেকে বাংলায় হিন্দু ব্রাহ্মণগণ সংস্কৃত ভাষার চর্চা করত, কিন্তু স্থানীয় বৌদ্ধরা প্রাকৃত ভাষার কোন কোন রূপে কথা বলত, যাকে অনেক ভাষাবিদ উল্লেখ করেছেন মাগধী প্রাকৃতের পূর্ব রূপ হিসেবে। প্রথম সহস্রাব্দে বাংলা যখন মগধ রাজ্যের একটি অংশ ছিল তখন মধ্য ইন্দো-আর্য উপভাষাগুলি বাংলায় প্রভাবশালী ছিল। এই উপভাষাগুলিকে মাগধী প্রাকৃত বলা হয় এবং এটি আধুনিক বিহার, বাংলা ও আসামে কথিত হত। এই ভাষা থেকে অবশেষে অর্ধ-মাগধী প্রাকৃতের বিকাশ ঘটে। বাংলা ভাষার পূর্বপূরুষ হল প্রোটো-গৌড়-বাংলা, যেটি এসেছে প্রোটো-গৌড়-কামরূপ ভাষা থেকে, যা পরবর্তীতে প্রোটো-মাগধী ভাষা বা মাগধী প্রাকৃত থেকে এসেছে। বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের সদস্য। বাংলা ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোত্রে। সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপত্তির কিংবদন্তি থাকলেও বাংলা ভাষাবিদরা বিশ্বাস করেন, বাংলা মাগধী প্রাকৃত এবং পালির মতো ইন্দো-আর্য ভাষা থেকে এসেছে। ‘প্রাকৃত’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ‘স্বাভাবিক’ এবং ভাষাগত অর্থ- জনগণের ভাষা। প্রাকৃত ভাষা থেকে দুটি ভাষা সৃষ্টি হয়েছে- একটি ‘পালি’, অন্যটি ‘অপভ্রংশ; ‘অপভ্রংশ’ কথাটির অর্থ বিকৃত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অপভ্রংশের কাছে প্রত্যক্ষভাবে ঋণী। অপভ্রংশ ভাষা থেকে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে উৎপত্তি লাভ করে আমাদের ‘বাংলা ভাষা’।
প্রথম সহস্রাব্দের শেষের দিকে অর্ধ-মাগধী থেকে অপভ্রংশের বিকাশ ঘটে। সময়ের সাথে সাথে বাংলা ভাষা একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিকশিত হয়। আর বাংলা ভাষার এই বিকাশের সময়কাল ধরা হয় ১০০০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালকে। সেসময় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের স্থানীয় আপভ্রংশ ছিল পূর্ব অপভ্রংশ বা অবহট্‌ঠ (‌অর্থহীন ধ্বনি), সেটা থেকেই অবশেষে আঞ্চলিক উপভাষাসমূহের বিকাশ ঘটে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলা ভাষা কিছু ক্রমবিবর্তন, পরিবর্তন ও পরিমার্জনের ভেতর দিয়ে আধুনিতকার দিকে ক্রমাগ্রসর হয়েছে। এই পর্যায়গুলো হলো-প্রাচীন বাংলা যার আদিনিদর্শন ‘চর্যাপদ’ ছিল এই সময়কার লিখিত নিদর্শন, যা ছিল মূলত: ভক্তিমূলক গান। এই সময়কালে বাংলা ভাষায় আবির্ভাব ঘটে আমি, তুমি ইত্যাদি সর্বনাম এবং ‘ইলা, ‘ইবা, ইত্যাদি ক্রিয়া বিভক্তির। ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যযুগীয় বাংলার সময়কালের গুরুত্বপূর্ণ লিখিত নিদর্শন ছিল চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এই সময়কালে বাংলা ভাষার শব্দের শেষে ‘অ’ ধ্বনির বিলোপ, যৌগিক ক্রিয়ার প্রচলন, ফারসি ভাষার প্রভাব সাহিত্যে লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনো ভাষাবিদ এই যুগকে আদি ও অন্ত্য এই দুই ভাগে ভাগ করেন। প্রত্ন বাংলা ছিল পাল এবং সেন সা¤্রাজ্যের প্রধান ভাষা। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে-বর্তমান এই সময়কালকে বাংলা ভাষার আধুনিক যুগ বলা হয়, আর এই সময়ে বাংলা ভাষায় ক্রিয়া ও সর্বনামের সংক্ষেপণ ঘটে, যেমন তাহার→তার; করিয়াছিল→ করেছিল।
সারা বিশ্বে সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৩০ কোটিরও অধিক লোক দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ব্যবহার করে। বাংলা শব্দভান্ডার হল বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার যার মূল এবং আদি উৎস পালি এবং প্রাকৃত ভাষা দ্বারা। বাংলা ভাষাতে পরের কালে ফার্সি, আরবি, সংস্কৃত এবং বিভিন্ন ভাষা থেকে ঋণশব্দ এবং পুনঃঋণশব্দ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাষার সংস্পর্শে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার শব্দভান্ডার বর্তমানে হয়ে উঠেছে অসংখ্য শব্দসমৃদ্ধ ও বিচিত্র। বাংলা ভাষা একটি মিশ্রভাষা। আরবি, তুর্কি, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, ইংরেজি শব্দের ছড়াছড়ি রয়েছে বাংলায়। এই মিশ্র জাতিগত, ভাষাগত, শঙ্কর-মিশ্রণ বাঙালি জাতির ঔদার্য এবং সহনশীলতার কথাই ব্যক্ত করে। বাংলায় প্রায় ৭৫,০০০ পৃথক শব্দ রয়েছে, যার মধ্যে: ৫০,২৫০ (৬৭ শতাংশ) শব্দ ‘তৎসম’ (সংস্কৃত ভাষা থেকে সরাসরি গৃহীত); ২১,০০০ (২৮ শতাংশ) শব্দ ‘তদ্ভব’ (বাংলা ভাষার শব্দসমূহ যার উৎস পালি এবং প্রাকৃত ভাষা দ্বারা হয়েছে); বিদেশী- শব্দ প্রায় ৫০০০ টি। ১৭৩৪ থেকে ১৭৪২ সালে বাংলা ভাষায় প্রথম অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করেন পর্তুগীজ খ্রিস্টান পাদ্রী ম্যানুয়েল দ্য আসুম্পসাঁও। তবে ১৭৭৮ সালে ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হালেদ ইংরেজি ভাষায় ‘অ্যা গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল লেঙ্গুয়েজ’ নামে প্রথম আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ বই রচনা করেছিলেন। ১৮৩২ সালে বাঙালিদের মধ্যে প্রথম ‘গ্র্যামার অফ্ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ নামক বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন রাজা রামমোহন রায়।
১৯৫০-এর দশকে ভারতের বিহার রাজ্যের মানভূম জেলায় বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন হয়। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রæয়ারি পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে) বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবীতে শহীদ হন সালাম, বরকত, জব্বার, শফিক, রফিক, শফিউদ্দীন প্রমূখ ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীগণ। ১৯৬১ সালের ভারতের অসম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় একইভাবে বাংলা ভাষা আন্দোলন সংঘঠিত হয়। হাজার বছরের পথ চলায় বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে গৌরব ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। ১৯১৩ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যকে মহিমান্বিত করেছে। বর্তমান বিশ্বের ভাষাসমূহের মধ্যে বাংলা ভাষাই বিশ্ব মাতৃভাষার প্রতিনিধিত্ব করছে তার মধুময় প্রকাশভঙ্গি, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও ঋদ্ধ ঐতিহ্যের জন্য। যার ফলে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রæয়ারির এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা প্রদান করে। বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষি হিসেবে সর্বত্র বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার ও চর্চার মাধ্যমে আমাদেরকেই এই মহান ভাষার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মর্যাদা রক্ষায় অঙ্গিকারাবদ্ধ হতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট