ইঁদুর গল্প

21

পড়ার টেবিল থেকে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসে আষাঢ়। বড় গলায় বলে, বাবা,বাবা আমার অ আ পড়ার বইটা কুচিকুচি করে কেটে ফেলেছে। কিভাবে পড়ব? টিচার আসলে কি বলব? বকবে আমাকে।
আষাঢ়কে বুকে জড়িয়ে বাবা প্রশ্ন করে,- কে কাটল?
– ইঁদুর! ইঁদুর কেটেছে। আষাঢ়ের ছোট্ট উত্তর।
আষাঢ়ের কান্নার শব্দ পেয়ে মা রান্না ঘর থেকে ছুটে এসে বলে,
বেশ কিছুদিন ধরে ইঁদুর বড্ডো জ্বালাচ্ছে। তোমাকে বলা হয়নি।
তখন কেঁদে কেঁদে ছুটে আসে শ্রাবণ। সে ও বলে, বাবা, হোম টিচারের কাজ করা এ বি সি ডি’র খাতাটা খেয়ে ফেলেছে ইঁদুর। স্যার কাজ না দেখে কান মলবে, মারবে। কি করব এখন।
আষাঢ়, শ্রাবণের অভিযোগে বাবা অবাক,স্তব্ধ!
সায়ন্তনীকে বলে, তুমি আগে বলনি কেন, এভাবে ইঁদুর বিরক্ত করছে।
-আমি বাজার থেকে ইঁদুরের ঔষধ এনেছি। রাতে খাবারের সাথে মিশিয়ে দিয়েছি। আজকালের ইঁদুর ভীষণ চালাক, খায়নি! মরাতো দূরের কথা।
-তা হলে উপায় কি? বাবা সায়ন্তনীকে প্রশ্ন করে।
-শুধু তাই নয়, প্রতিদিন বিস্কিট, দুধের প্যাকেট খাচ্ছে,দামি শার্ট, শাড়ি কুচিকুচি কাটছে। সারা ঘর তছনছ করছে। কি করব ভেবে পাচ্ছিনা। এভাবে কি চলবে।
সব ঘরে দিব্যি ছুটছে। আমি কি ঘরের কাজ করব নাকি ইঁদুর তাড়াবো। তাড়াতাড়ি একটা কিছু কর। নাহয় ঘরের সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।
-আচ্ছা ইঁদুর ধরার কল বাজারে পাওয়া যায়। তা‘তে কি কাজ হবে!
-হ্যাঁ, হ্যাঁ যা, দ্রুত কর। আষাঢ়ে, শ্রাবণের মা বলে রান্না ঘরে ছুটে যায়।
সায়ন্তনীর ফোন আসে সকাল এগারটায়। ফোন ধরে। সায়ন্তনীর ছোট বোন শুক্লার ফোন। সে ছোট হলে কি, চতুর্দিকে জ্ঞানে ভরা। কি ঔষধ, কি রান্না, কি কাপড়ের দোকান, সব বিষয়ে পটু। সে বলে,
-বড়দি,কেমন আছো, ক’দিন ধরে ফোন করছ না, ব্যস্ত বুঝি? তোমার ফোন না পেলে ভালো লাগে না।
-বিরাট সমস্যায় আছি শুক্লা। বড়দি বলে।
-হঠাৎ কিসের সমস্যা বড়দি?
-ইঁদুরের। দেখনা, সকালে আষাঢ়,শ্রাবণের বই, লেখা খাতা কেটে এক্কেবারে শেষ করেছে। ওরা কাঁদছে। স্যার আসবে,বকবে।
-বড়দি তুমি ভেবোনা না,আমি দুপুরে ঔষধ পাঠাবো। একটা আঠার মত। ইঁদুরের জন্য সুস্বাদু খাবার দিয়ে একটা পেপারের উপর রাখবে।
ইঁদুর খেতে আসলে পালাতে পারবেনা। আটকে যাবে।
-ঠিক আছে, তা’হলে তাড়াতাড়ি পাঠাস। -তুমি চিন্তা করো না, দুপুরের মধ্যে পাঠাচ্ছি।
ঔষধ পাঠালো।
রাতে শুক্লার কথামত দিলো। কোন লাভ হলো না। ঐ যে আজকাল ইঁদুরেরা ও বড্ডো চালাক। একটুও খায়নি। আষাঢ়, শ্রাবণের মা, বাবা দু’জন ভাবনায় পড়ে। কি করে এই জ্বালা থেকে বাঁচানো যায়, ভাবে।
তখন পড়ন্ত বিকেল। শীতেরা খেলছে। ঠান্ডা পড়ছে। ডোর বেলটা বাজে। বিজয়া দরজা খোলে, দেখে শুক্লার বাসার দাড়োয়ান। হাতে ইঁদুর ধরার কল। দরজা খোলে বিজয়া। দাড়োয়ান বিনয় ঘরে ঢোকে।
সায়ন্তনী বিনয়কে রান্না ঘরে বসায়। বিনয় ইঁদুর ধরার কৌশল বুঝিয়ে দেয়।
একটু পরে বিনয় চা খেয়ে চলে যায়।
রাত বাড়ে। আষাঢ়, শ্রাবণ পড়ছে। হোম টিচারের সাথে সায়ন্তনী কথা বলে, ভীষণ কষ্টে আছি ইঁদুরের জ্বালায় মাষ্টারবাবু। সেদিন তোমার ছাত্ররের বইখাতা কেটেছে। ঘরের সব কাটছে। তরকারী, বিস্কিট,দুধ চিনি কিচ্ছু রাখা যাচ্ছেনা। আজকে আমার ছোট বোন ইঁদুর ধরার কল পাঠিয়েছে। দেখি কি হয়?
-আন্টি, সবকিছুর একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আজকাল। আগেকার মত কিছুই হয়না আন্টি।
-সে কেমন কথা আবার?
-যেমন, আগেকার দিনে একটা নিয়ম ছিল। নিয়ম অনুযায়ী চলত। গরমের দিনে গরম, শীতের দিনে শীত, বর্ষার দিনে বৃষ্টি। আজকাল সব উল্টো। অনেকেই বলতে শুনি, এটা নাকি জলবায়ূর পরিবর্তনে কারণে হচ্ছে।
-সে তুমি ঠিক বলেছে। সারা পৃথিবী জুড়ে তা হচ্ছে।
-তখনকার দিনে হলে ইঁদুর ক’বেই ধরা পড়তো। আজকাল সবাই চালাক, বুদ্ধিমান।
-সে তুমি ঠিক বলেছ। একবিংশ শতাব্দী ঘর দোরে এসে দাঁড়িয়েছে। ঠিক আছে, তুমি পড়াও,আমি আসি।
খাবার শেষে রান্না ঘরের কাজ চুকিয়ে পড়ার ঘরে রসালো বিস্কিট দিয়ে ইঁদুরের কল বসায় সায়ন্তনী। তারপর ভাল করে হাত-পা ধুয়ে শুতে আসে। তখন আষাঢ়,শ্রাবণের বাবা টিভি দেখছে। সায়ন্তনী বলে,
-শুক্লা ইঁদুর ধরার কল পাঠিয়েছে। ওদের পড়ার ঘরে বসিয়েছি। কি জানি, ইঁদুর ধরা পরে কিনা!
– দেখ, কি হয়। আষাঢ়, শ্রাবণের বাবা উত্তর দেয়।
ভোর হয়।
প্রতিদিনের মত সকালের নাস্তা শেষে আষাঢ়, শ্রাবণ পড়ার ঘরে পড়তে যায়।
যাওয়া মাত্র দু’জনে ছুটে আসে। হাতে ইঁদুরের কল। প্রচন্ড হৈ চৈ,আনন্দ।
বাবা, মা, বিরাট একটি ইঁদুর ধরা পরেছে। বাবা,মা, দুজনে দৌঁড়ে আসে। দেখে অবাক। ওদের চোখে হাসি,বিজয়ের আনন্দ। কে কি করবে ভেবে পায়না। বাবা বলে,
-আজকে ঐ ইঁদুরকে রেখে দেবে রান্না ঘরে। ধরা পড়া ইঁদুর দেখুক অন্য ইঁদুরেরা।
অন্য ইঁদুরেরা যাতে ভয় পায়। দেখে পালাবে।
আষাঢ় বলে,
-বাবা, সে কি করে হয়? ইঁদুর কি না খেয়ে থাকবে? না খেয়ে ইঁদুরটা মরে যাবে নাতো!
আষাঢ়ের ইঁদুরের প্রতি ভালোবাসা দেখে বাবা খুশি হয়। সত্যি আষাঢ়টা প্রাণের দুঃখ বোঝে।
তারপর ও ওদের বাবার আনন্দ ধরে না। মাও ভীষণ খুশি।
দিন যায়। ইঁদুরের শব্দ নেই।
কিন্তু বিজয়া শোবার ঘরে ইঁদুরের ছোটাছুটির শব্দ শোনে। পরের দিন বিজয়ার শোবার ঘরে ইঁদুরের কল বসায় সায়ন্তনী। সাহায্য করে আষাঢ়,শ্রাবণ। কৌতূহলে ভরা ওদের মন।
নাহ্ ইঁদুর ধরা দেয় না। দেখা যায় না, গেলো কোথায়?
কি আশ্চর্য এরপর থেকে ইঁদুরের শব্দ নেই ঘরে।
সত্যি কি ভয়ে ইঁদুর পালিয়েছে?