আস্-সালামু আলাইকুম

35

আবদুল হাই

আস্-সালামু আলাইকুম ….। এটুকু বলে এক রিষ্টপুষ্ট সুঠাম দেহের লোক, ধীরে ধীরে আমার সন্নিকটে এগিয়ে আসতে থাকে। পথে লোক সমাগম খুবই স্বল্প। আমার ভেতরটা ভয়ের কারণে শুষ্ক হতে শুরু করে। করোনা নিষেধাজ্ঞা দূরত্ব অগ্রাহ্য করে লোকটি বলে ওঠে, ‘অ-নে ক্যাঁএ্যাঁন আঁরে ন-অ চিনোন ফাঁআন্লার। আমি নিরুত্তর অপলক নেত্রে শুধু চেয়ে আছি। হঠাৎ একটু সাহস সঞ্চার করে কম্পমান কণ্ঠে তার সালামের উত্তর দিয়ে বলতে থাকি, ওয়া-লুম, আস্সালাম … ।
পরবর্তী ঐ অচেনাব্যক্তি আত্ম পরিচয় দিয়ে বলতে থাকে আর্ঁ নাম আবদুল করিম। আঁই, অ-নোর লেখার খুউব ভক্ত। ‘অ-নে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার নিয়মিত কলামিস্ট আবদুলাই সা-আব নয়না। আঁই অ-নোর বুধবাইজ্যা কলামের লাই ফউল আছিলাম। হিতারল্যাই ফত্তিক বুধবারে উ-গ্গা পূর্বদেশ পত্রিকা কিনি লইতাম। ব-উত মজা লাইগতো। এরপর কতিপয় বিশেষণে আমাকে বিশেষায়িত করতে করতে বলতে থাকে অ-দা অ-নে কোনো গোস্স্যা বে-জার হইয়েনে লেখাজোখা ছাড়ি দিয়ুন দে -না। উনি দারুণ পাম্প-পট্টির মাধ্যমে আমাকে উদ্বুদ্ধ করতে করতে বল্লেন ‘অ-দা অ-নে লেখুন অনের লেখার মান বা-লা। পথ চলতে অনেক পাঠকের সম্মান ও শ্রদ্ধা আমার হৃদয়কে আল্পুত করে। আমার খুব নিকট পড়োশী বিশ্বজিৎ চক্রবর্ত্তী, পেশায় একজন অধ্যাপক, নানুপুর লায়লা কবির কলেজে বাংলায় অধ্যাপনা করেন। বেশ ভালো লোক, তাউ উনা ভালোবাসি। আমাদের পরস্পরের সাক্ষাতে রুচিশীল আলাপচারিতার মাধ্যমে আমাদের আড্ডা বেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আমরা একে অন্যকে সম্মান দিয়ে কথা বলি। আমার পছন্দের সঠিক মানুষ। বেশ দেশপ্রেমসমৃদ্ধ মানুষ। কথাবাত্তায় উদারতা পরিচয় মিলে।
লক্ ডাউনের ধাক্কায় আমার লেখনি লক্ ডাউন প্রত্যাহার করতে বিশ্বজিৎ চক্রবর্ত্তী বাবুর ভালো রকমের চাপ আছে। আবার আমার গিন্নীরও হরহামেশা তাগেদা যাতে লেখার লক্-ডাউন আমি তুলে নেই। ও আমার নিবন্ধ পড়তে নয় শুনতে অভ্যস্ত। কথা হচ্ছে ও আমার উত্তম শ্রোতা। হয়ত; সন্দেহ হতে পারে আমার গিন্নী অক্ষর জ্ঞানহীনা। মোটেই তা নয় ও ¯œাতক শ্রেণির শেষ বর্ষের ছাত্রী থাকা অবস্থান পরিণয়ে আবদ্ধ হয় আমার সাথে। ওসময় রক্ষনশীল মুসলিম পরিবারের গৃহবধূ মানে ঘরকন্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকা চায়। তাই অনিচ্ছাস্বত্ত্বেও পড়া-লেখা শিকেই তুলতে হলো। গিন্নী আমার বৃদ্ধত্ব এবং অস্বস্থিকর অবসরটার কারণে আমাকে লেখালেখির জন্য প্রতিমুহূর্তে পীড়াপীড়ি করে থাকে আমার শুরুটা আবদুল করিমের সালামÑ যা আমার চিত্তে তড়িৎ ভীতির সঞ্চার, এর পশ্চাতে কি হেতু বিদ্যমান ছিলো তৎবর্ণনায় না গেলে পুরো নিবন্ধটাই রসহীন বোধগম্য হবে। খুব সম্ভব নব্বইয়ের দশকের একদিন তারিখ মনে নেই। এক ঠিকাদারী কার্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। শ্রমিকদের হাজিরা টাকা দিতে রিক্সাযোগে বড়পুল রাস্তা ধরে যাচ্ছিলাম। রিক্সাচালকের বয়স কম করে হলে ষাট ঊর্ধ্ব। গতিশ্লথ, অর্থাৎ ক্ষিপ্রতা নেই। পেছনে এক রিক্সা অনুসরণ করলেও আমি বেখেয়ালিপনার জন্য ঘটনা একটুও আঁচ করতে পারিনি। অগত্যা আমার পশ্চাতের রিক্সা আমার রিক্সার কাছাকাছি, তাতে চালক ছাড়া সুঠামদেহী দুই যুবক একস্বরে উঁচু কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘আস্সালামু আলাইকুম। দুদিক থেকে দু’জন আমার রিক্সার গতি রোধ করে দাঁড়ায় এবং চাকু উঁচিয়ে কমান্ড করে পকেটে টাকা পয়সা যা আছে বের কর। একজন আমার শার্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ৬০০ টাকা পেলো এবং দুজন দ্রæত শটকে পরে। ভাগ্যিস আমার পেন্টের ওয়েজ পকেটে হাত ঢুকায়নি তাতে পুরো দশহাজার টাকা ছিলো। আমি যেন সামান্য ক্ষতির বিনিময়ে বড়ো ধাক্কা খাওয়া থেকে বেঁচে গেলাম। সারা শরীর শুধু কাঁপছিলো। সে জন্য পথচারী, আমার প্রিয় পাঠকের প্রথম দর্শন এবং তার সালাম দেয়া আমার চিত্তে কম্পন এবং ভীতির সঞ্চার করেছিলো। চাট্গাঁ অঞ্চলের এক আঞ্চলিক প্রবাদ বাক্য আছে ‘যার বাপোরে কুঁইরে খাইয়ে হিতা ঢেঁ-ই দেইলেও ডঅরাই। আমার স্বীয়ক্ষেত্রে সালাম পার্টির ভীতি আজ অব্দি বিদ্যমান। করিম ভাইকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে অবমূল্যায়ন করার জন্য আমি অনুতপ্ত হলেও আলাপচারিতায় অবগত হলাম উনি শিক্ষিত-ভদ্রলোক। এক দৈনিক পত্রিকাতে কম্পোজিটরে চাকরি করতেন। এক পর্যায়ে আমাকে বল্লেন ‘মুরুব্বি অনে লেখি য-উন অ-নোর লেখা খু-উব মানসম্মত।’ তাই আজকে নব উদ্যমে লিখতে শুরু করলাম লেখাতে করিম ভাইকে ধন্যবাদ।
‘করোনা ১৯’ এর শুরু থেকে আজ অব্দি পত্রিকার জন্য লেখা দেইনি। এব্যাপারে আগ্রহ এক রকম ভাটা পড়েছে। গৃহঅন্তরিণ থেকে মনের উৎফুল্লতা হ্রাস পেয়েছে। কারো সাথে আড্ডা, গল্প, হাসাহাসি, মাতামাতি নেই। স্বজনদের বাড়িতে যাতায়াত বন্ধ। মন মানে না, কবি নজরুলের সংকল্প কবিতার দু’টো লাইন বার বার হৃদয়ের ভেতর এক স্পন্দন সৃজন করে ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে দেখবো এবার জগৎটাকে’। তা সম্ভব হয়ে ওঠে না, সরকারিতে নিষেধাজ্ঞার চাইতে ঘরের ছেলে-মেয়ের নিষেধাজ্ঞা বড়ো কঠোর। প্রথম প্রথম লক ডাউন এক আমেজ ও জৌলুস সৃজন করেছিলো। স্থানীয় সরকার পরিষদের দিনক্ষণ ঠিক হয়েছিলো। নির্বাচনে জেতার জন্য প্রার্থীরা সাহায্যের পুটলি নিয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুর ঘুর করেছিলেন। সরকারি দান, খয়রাত ২৫০০ টাকার সাহায্য সে এক অবিশ্বাস্য অবস্থা। এরাব ধহফ ঃধশব বলে একটা বাক্য যার অর্থ দাও-নাও। অবশ্য উদ্দেশ্য যা হউকনা কেন আকালে ঐ উদ্যোগ বেশ কাজে এসেছিলো। ঐ প্রতিক‚ল অবস্থায় এক নেতা স্বীয় গরোজে আমাকে মোবাইলের মাধ্যমে জানতে চাহেন ‘তুঁই ক্যাঁন আছো’ ভালো, মানেÑ আমার ছয় সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের আমরা ৫ জনই আক্রান্ত। ছোট ছেলের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ও আল্লাহর রহমতে আরোগ্য লাভ করেছিলাম। নেতা যদি তুঁই ক্যাঁন আছো বাক্যের সঙ্গে বলতেন তুঁই চলোর ক্যাঁন। তা আরো বেশী স্বস্থিদায়ক হতো। তাই ভাবি ৩নং ছাগল ছানার মতো নাচানাচি ও জিন্দাবাদ বা জয়ধ্বনি এসব আমাদের মতো হতভাগ্যদের কাজ বলা যায়। শাহানামা নামক গ্রন্থ রচনায় কবি ফেরদৌসিকে ষাট সহস্র স্বর্ণমুদ্রা প্রদানের অঙ্গিকার করেও শাহনাম প্রণয়ন শেষে কবিকে স্বর্ণমুদ্রার জায়গায় রূপ্যমুদ্রা দিতে চাইলে রাগে ক্ষোভে কবি, তাঁর জন্য বরাদ্দকৃত আবাসন ত্যাগ করে স্বীয়গ্রামে ফিরে যান। সেদিন কবির কাছে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ স্বর্ণমুদ্রা বোঝাই করা গাড়ি ফটকের সম্মুখে রাখা হয়। সেদিন কবির মৃতদেহ সমাহিত করার জন্য কবরস্থানে নিতে হচ্ছিলো।
অনেক দিনের অনভ্যাসে মনে হয় কলমের ধার হ্রাস পেয়েছে। অনেক কিছুতো লিখতে মন চায়। কিন্তু এ কিন্তুর বিশদ ব্যাখ্যা দিতে পারবোনা। যা ভালো লাগবে তাই ভালোবাসবো এবং তাই লেখবো। পাঠকদের দোয়া কাম্য। পাঠকবৃন্দ আস্সালামু আলাইকুম, ওয়া রহমাতুল্লাহে ওয়া বারকাতু। অর্থাৎ আপনাদের তরে শান্তি ও আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হউক। লিখবার প্রত্যাশা রইল।
লেখক: কলামিস্ট