আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বজ্রপাত ও মৃত্যু সতর্কতার সাথে প্রয়োজন আধুনিক নিরোধক যন্ত্র

7

সম্প্রতি দেশে অস্বাভাবিকহারে বেড়ে যাচ্ছে বজ্রপাত। সেইসাথে বাড়ছে বজ্রপাতের আঘাতে হতাহতের সংখ্যাও। প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে বজ্রপাত বেশ আতঙ্ক সৃষ্টি করছে যা সাধারণ মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। কারণ বজ্রপাতের শিকারে হতাহতরা অধিকাংশ নি¤œ আয়ের হতদরিদ্র কৃষক পরিবারের সদস্য। বলা হয়ে থাকে, বজ্রপাত প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি। তবে এটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর একটিও বটে। এপ্রিল থেকে প্রায় প্রতিদিনই বজ্রদুর্যোগে মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হতে দেখা যায়। সূত্র জানায়, বজ্রপাতে আহতরা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। হাওর-বাওড়, জলাশয় ও বিল এলাকার জেলাগুলোয় বজ্রপাতে মৃত্যু বেশি। ঝড়-বৃষ্টির সময় খোলা মাঠ, নৌকা ও পথঘাটে যারা চলাচল করে তারাই এর শিকার। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বজ্রপাতের ঘটনা ১৫ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে, বজ্রপাতে একটি মৃত্যু হলে আরও ১০-১৫ জন আহত হন। অন্য দুর্ঘটনায় আহত আর বজ্রাঘাতে আহতের মধ্যে প্রার্থক্য আছে। এ দুর্ঘটনায় আহতরা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলের একটি বাংলাদেশ। এ দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ৪০টি বজ্রপাত হয়। এ অস্বাভাবিকতার কারণ হচ্ছে বায়ুমÐলে কালো মেঘ বেড়ে যাওয়া। কালো মেঘ সৃষ্টির পেছনে বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফারের পরিমাণ বাড়াকেই দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামান্য বৃষ্টিপাত বা ঝড়ো বাতাসেও ঘটছে বজ্রপাত। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আবহাওয়া সম্পর্কিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বজ্রপাত। খারাপ খবর হচ্ছে প্রতিবছর বজ্রপাতে যত মানুষ মারা যায়, তার এক-চতুর্থাংশ মারা যায় বাংলাদেশে। সুতরাং বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। সতর্ক হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেতে পারে। দুঃখজনক সত্যটি হলো, বাংলাদেশে বজ্রপাতের ওপর তেমন কোনো গবেষণা নেই। বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রকৃতি ধ্বংসের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হলেও বৈজ্ঞানিক উপায়ে এর বিহীত ব্যবস্থা রয়েছে। যা উন্নত ও স্বপ্লোন্নত অনেক দেশ ব্যবহার করে সুফল পেয়েছে বলে সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশেও বজ্রপাত প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসাবে সীমান্তে বিশেষ ধাতুতে তৈরি স্টিলের পাত পাওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনা করে প্রকৃত বিষয়টি স্পষ্ট করা যায়। পাশাপাশি এ দুর্যোগ মোকাবেলায় জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক উপায়ও বের করা জরুরি বলে মনে করি। বেশ কয়েকবছর ধরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষকরা ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির দিক থেকে বিবেচনা করে বজ্রপাতকে নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন। পাঁচবছর আগে ২০১৬ সালের ১৭ মে একে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে দেশের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত পাঁচ বছরে ভয়ঙ্কর প্রাণ-সংহারী রূপ নিয়েছে বজ্রপাত। প্রতিবছর কালবৈশাখী ও বর্ষা মৌসুমে দেশজুড়ে মাথায় বাজ পড়ে বা বজ্রাঘাতে মৃতের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন স্থানে গতকাল রবিবার একদিনেই বজ্রপাতজনিত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়জনে। এরমধ্যে, জেলার ফটিকছড়িতে দুই নারীসহ তিনজন, মিরসরাইয়ে একজন, সীতাকুন্ডে একজন, বোয়ালখালীতে একজন, কক্সবাজারের চকরিয়ায় একজন ও ফেনীর সোনাগাজীতে দু’জন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দেশের উত্তর ও দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় অন্যান্য বিভাগে এরচেয়ে বেশি। বজ্রপাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম এওয়ারনেস ফোরামের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়, বজ্রপাতে দেশে ২০২০ সালের সাত মাসেই (ফেব্রুয়ারি-আগস্ট) প্রাণ হারিয়েছে ২৪৬ জন। অন্যদিকে বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশে বিগত আট বছরে দুই হাজারের বেশি মানুষ মাথায় বাজ পড়ে মারা গেছে। এর মধ্যে গত ২০১৬ সালে বজ্রপাতে সাড়ে তিনশ’ মানুষের মৃত্যু হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে বজ্রপাতে মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা তিনশ’রও বেশি। আর ২০১৮ সালে বজ্রপাতে মারা যায় ১৬০ জন। আহত হয় শতাধিক। বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কতগুলো জরুরি নির্দেশনা মেনে চলা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে জীবন রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। এ ছাড়া, চট্টগ্রামসহ দেশের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে ইমারত নির্মাণ শর্তে প্রতিটি বিল্ডিংয়ে বজ্র নিরোধক স্থাপন নিশ্চিত করা জরুরি। পূর্বদেশের প্রতিবেদকের সাথে সহমত পোষণ করে আমরা আশঙ্কা করছি, এখনই এ দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে করোনার মতো এটিও স্থায়ী রূপ ধারণ করতে পারে।