আল মাহমুদ : কবি ও কথাশিল্পী মুহাম্মদ তাফহীমুল ইসলাম

110

কমরুদ্দিন আহমদ। কবি, গবেষক, সাংবাদিক, অধ্যাপক। নব্বইয়ের দশকে শুরু করেন লেখালেখি। যার ফলশ্রুতিতে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধের ডজনখানেক বই। বাঁশখালী ডিগ্রী কলেজের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনার পাশাপাশি বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত। কবিতাপ্রেমিক এই কথাশিল্পী বাঁশখালীস্থ নিজ গ্রাম পুকুরিয়ায় গড়ে তুলেছেন ‘কাব্যনিলয়’। যেখানে ভোরের মিষ্টি রোদের কিরণ থেকে হরেক ফুলের জন্ম হয়। কবি কমরুদ্দিন আহমদ ২০১৫ সালে সদ্য প্রয়াত সোনা­িল কাবিনের কবি আল মাহমুদকে নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধগ্রন্থ ‘আল মাহমুদ : কবি ও কথাশিল্পী’ প্রকাশের দুঃসাহসী প্রয়াস দেখান। এই গ্রন্থে আল মাহমুদের সাহিত্যকর্মকে ১৪টি প্রবন্ধে বিভক্ত করে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আল মাহমুদের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালী কাবিন’ এর জন্মভূমি চট্টগ্রাম থেকে কবি আল মাহমুদকে নিয়ে এটিই প্রথম একক গবেষণামূলক প্রবন্ধগ্রন্থ।
আল মাহমুদ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তিনি রেখে গেছেন তাঁর মুন্সিয়ানার দলিল। গ্রাম বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ দৃশ্যপট, নর-নারীর প্রেম বিরহ, রাজনীতি নিয়ে রচনা করেছেন কালজয়ী সাহিত্য। আল মাহমুদ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মতো স্বশিক্ষিত, স্বাভাবিক জাত কবি। তিনি শুধুমাত্র একজন কবি বা লেখকই নন; স্বদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক লড়াকু বীর মুক্তিযোদ্ধাও! দেশের প্রতি একজন কবি আর কেমন করেই বা দায়বদ্ধ থাকতে পারে। কাব্যিক চেতনা আল মাহমুদকে যুদ্ধে নিয়েছে, জেলে নিয়েছে। দেশের প্রতি, কবিতার প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই আল মাহমুদের দ্বারা এমনটা সম্ভব হয়েছে। যদিওবা কাব্যিক এই মহাপুরুষ বিদায় বেলায় কিংবা জীবদ্দশায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁর শ্রম, সাধনার যথাযথ পায়নি। এটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু না বৈকি। একজন আল মাহমুদকে ধারণ করার সেই শক্তি হয়তো এখনো এই রাষ্ট্রের হয়নি। তারপরেও কবি আল মাহমুদ অন্তিম যাত্রায় ভক্ত, পাঠকের নিকট যা পেয়েছে তা কাব্যিক জীবনের মাইলফলক নয় কি।
আল মাহমুদ কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ রচনা করলেও সর্বমহলে তাঁর পরিচিতিটা ‘কবি আল মাহমুদ’ বলেই! হতে পারতো গল্পকার বা ঔপন্যাসিক কিংবা প্রাবন্ধিক আল মাহমুদ। কিন্তু তা হয়নি। কেন হয়নি? আল মাহমুদ কবিতার শুদ্ধতম পুরুষ। অন্যান্য সাহিত্য কর্মের চেয়ে তাঁর কবিতা ভারী, বিশাল। সৃষ্টি সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনযোগী না হয়ে মানের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখার কারণেই কাব্যতাত্তি¡ক বিচারের নিরিখে আল মাহমুদকে মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ’র কাতারে দাঁড় করানো যায়। আল মাহমুদের সমসাময়িককালের আরো অনেকেই সৃষ্টি সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও এপর্যায়ে আসতে পারেননি। লেখক তাঁর প্রবন্ধে তাদের সেই সৃষ্টিকে আগাছা বলে অভিহিত করেছেন। কবি আল মাহমুদের কবিতায় প্রেম থেকে শুরু করে দেশ চিন্তা, অনিয়ম, অসঙ্গতি, ইতিহাস কাব্যিকরূপে স্থান পেয়েছে বিস্তর। কাব্যিক রচনায় আল মাহমুদ স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত ছন্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছেন সমানভাবে। লেখক আল মাহমুদের কবিতা নিয়ে এভাবে সুবিস্তীর্ণ আলোচনা করেছেন ‘আবহমান বাংলাকাব্যে আল মাহমুদ’ প্রবন্ধে।
কবি আল মাহমুদের প্রধানতম সাহিত্য সৃষ্টি ‘সোনালী কাবিন’। সোনালী কাবিন আল মাহমুদকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়, পরিচয় করিয়েছে কবিতার মহান সাধকরূপে। কমরুদ্দিন আহমদ তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘সোনালী কাবিন : জৈবিক সংকটের শিল্পরূপ’ এ তা নিয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা করেছেন। সোনালী কাবিন এর চৌদ্দটি চতুর্দশপদী কবিতায় ওঠে এসেছে নারী প্রেমসহ বিবিধ প্রসঙ্গ। এখানে কবির যৌবনে নারীকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছা প্রস্ফুটিত হয়েছে গোলাপরূপে। লেখক সোনালী কাবিনকে কবি আল মাহমুদের ভরাযৌবনের তেজোদীপ্ত সোনালী ফসল বলে আখ্যায়িত করেছেন। সোনালী কাবিনের পর আল মাহমুদের কাব্যিক অবয়বে আসে বিশাল পরিবর্তন। তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বাসের কবি। ধর্মীয় বিশ্বাস যেন তাঁর মাথায় গেঁড়ে বসে। সোনালী কাবিন যেন কবির জৈবিক সব চাহিদা মিটিয়ে ফেলে! ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ কাব্যগ্রন্থে কবির ব্যক্তিগত আত্মিক সংকটের চিত্র ফুটে ওঠলেও ‘সোনালী কাবিন’ হয়ে ওঠে জৈবিক সংকটের প্রেসক্রিপশন। লেখক ‘সোনালী কাবিন’ নিয়ে এই প্রবন্ধে বিশদ আলোচনা করেছেন।
কবি আল মাহমুদ কাব্যসাধক নয় শুধু, একজন সুনিপুণ ছড়াশিল্পীও। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো ছড়াতেও রয়েছে তাঁর অবাধ বিচরণ। ছড়াতে তিনি প্রেম-প্রকৃতির পাশাপাশি তুলে এনেছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনবোধ। শিশুসাহিত্যে আল মাহমুদের সৃষ্টি খুবই সুখপাঠ্য। কবি আল মাহমুদ ছড়াতে স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ছন্দের স্বার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আল মাহমুদ অতীতের নিয়মকে উপেক্ষা করে চিন্তা করেছেন নতুন কিছু। লেখক কবির সৃষ্টির আলোকে তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ‘আল মাহমুদের ছন্দ ও উপমা’ ‘আল মাহমুদ : ব্যতিক্রমধর্মী ছড়াশিল্পী’ প্রবন্ধে। কবি আল মাহমুদের কাব্যগ্রন্থে কাহিনীর বিচরণ নিয়ে লেখক সবিস্তর আলোচনা করেছেন ‘আল মাহমুদের কবিতায় কাহিনীকাব্যের খন্ড-আস্বাদ’ প্রবন্ধে।
সব্যসাচী লেখক আল মাহমুদ কবিতা, গল্পের পাশাপাশি রচনা করেছেন উপন্যাসও। কবি আল মাহমুদের হাতে রচিত হয়েছে ‘কাবিলের বোন’ ‘ডাহুকি’ ‘উপমহাদেশ’র মতো ইতিহাসসমৃদ্ধ উপন্যাস। আল মাহমুদের উপন্যাসের প্রধানতম উপজীব্য নারী। কবি নিজে নায়ক বেশে উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠককে ঘুরিয়েছেন নারীর চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত। উদ্বেলীত যৌবন আকাক্সক্ষার সাথে ছল না করে আল মাহমুদ নারী দেহের গন্ধ শুঁকার বাসনাকে সাহিত্যের ভাষায় উপন্যাসে বর্নণা করেছেন লজ্জা-শরম ফেলে! আল মাহমুদের উপন্যাসে নরনারীর বিচিত্র কাহিনী লেখক উপস্থাপন করেছেন ‘আল মাহমুদের উপন্যাস : নরনারীর বিচিত্র হৃদ্যতার সাতকাহন’ প্রবন্ধে। লেখক এই প্রবন্ধগ্রন্থে আল মাহমুদের উপন্যাস ‘ডাহুকি’ ‘উপমহাদেশ’ ‘অর্ধেক মানবী’ ‘কাবিলের বোন’ নিয়ে আলোচনা করেছেন আলাদাভাবে।
কবি আল মাহমুদ একজন সিদ্ধহস্ত গল্পকার। আল মাহমুদ শুরুর দিকে কবিতায় বিচরণ করলেও পরে গল্পের ক্ষেত্রেও নিজের আসন সুসংহত করার সক্ষমতা লাভ করেন। তিনি রচনা করেছেন ‘পানকৌড়ির রক্ত’ ‘সৌরভের কাছে পরাজিত’ ‘গন্ধবণিক’ ‘আল মাহমুদের গল্প’ ‘জলবেশ্যা’ ‘মীরবাড়ির কুরসীনামা’। বরাবরের মতো রোমাঞ্চকর কাহিনীঘেরা গল্প নির্মাণেও আল মাহমুদ রেখে গেছেন মুন্সিয়ানার ছাপ। লেখক আল মাহমুদের গল্পকে মূল্যায়ন করেছেন ‘আল মাহমুদের ছোটগল্প’ প্রবন্ধে। কবি আল মাহমুদের প্রবন্ধ নিয়ে কমরুদ্দিন আহমদ আলোচনা করেছেন বইয়ের ‘প্রাবন্ধিক আল মাহমুদ’ প্রবন্ধে। আল মাহমুদ দেশ স্বাধীনের পর দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরে চট্টগ্রামের দৈনিক কর্ণফুলী পত্রিকার সম্পাদক হন। এসময় তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, দেশাত্মবোধসহ নানা বিষয়ে বহু প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখান থেকে বাছাইকৃত প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘আল মাহমুদ প্রবন্ধসমগ্র’ ‘দিন যাপন’ ‘কবির আত্মবিশ্বাস’। প্রবন্ধের ক্ষেত্রে আল মাহমুদের ভূমিকার কথা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে এই বইয়ের ‘প্রাবন্ধিক আল মাহমুদ’ প্রবন্ধে। এছাড়াও বইয়ের সর্বশেষ প্রবন্ধ দুটিতে আলোচনা হয়েছে ‘আল মাহমুদের কবিতায় নন্দনতত্ত¡ ও লোকসংস্কৃতি’ ও ‘আল মাহমুদের কবিতায় মিথের ব্যবহার’।