আলো ছড়াবে স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর

19

সবুর শুভ

স্বাধীন বাংলায় লাল-সবুজে রাঙা পতাকার বয়স যেমন ৫০ বছর পার হল তেমনি এদেশের বয়সও একই। উন্নয়ন অগ্রগতিতে এদেশ দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচদশক পার হলেও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সূতিকাগার খ্যাত চট্টগ্রামে হয়নি কোনো স্মৃতিসৌধ। হয়নি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর। তবে এবার চট্টগ্রামে আলো ছড়াবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ ও যাদুঘর। নগরীর উত্তর কাট্টলি এলাকায় ৩০ একর সরকারি জায়গার উপর হচ্ছে এটি। নকশা প্রস্তুত। আগামী ১৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সামনে এ নকশা উপস্থাপন করা হবে চ‚ড়ান্তভাবে অনুমোদনের জন্য। এরপর শীঘ্রই নির্মাণকাজের উদ্বোধন হবে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন স্মৃতিসৌধ নির্মাণটি তদারকি করছে। নির্মাণ করবে চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ। এ উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ এবং যাদুঘর নির্মাণের প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। পরে তিনি চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এ নিয়ে মতবিনিময়ও করবেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ওই এলাকার বাসিন্দা ও সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কর্মকর্তা সাইফুদ্দিন সাকী জানান, ‘১৯৭১ সালে কাট্টলী খাল দিয়ে অস্ত্র আনা হত। পরে তা নগরীতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে সরবরাহ করা হত। এটা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এলাকা। প্রস্তাবিত স্থানের দক্ষিণে এক দফার প্রবক্তা এম এ আজিজের বাড়ি, উত্তরে সলিমপুর ওয়ারলেস টাওয়ার যেখান থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করা হয়, পূর্বে জহুর আহমদ চৌধুরীর বাড়ি। পাশে সাগর তীরের নয়নাভিরাম পরিবেশ।’
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ ও যাদুঘর নির্মাণে নগরীর উত্তর কাট্টলি ও মোহরার হামিদচরসহ একাধিক জায়গার প্রস্তাবনা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে উত্তর কাট্টলির উল্লেখিত সরকারি খাস জমিতে স্মৃতিসৌধের জায়গাটি নির্ধারণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উত্তর কাট্টলি মৌজায় ‘চট্টগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর’ নির্মাণের নির্ধারিত স্থান উল্লেখ করে সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫০ বছরেও চট্টগ্রামে স্মৃতিসৌধ নির্মিত না হওয়াটা দুঃখজনক। তবে এবার আমরা স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর নির্মাণে অনেকদূর এগিয়েছি। উত্তর কাট্টলি মৌজার নির্ধারিত স্থানকে কেন্দ্র করে দক্ষ আর্কিটেক্ট দিয়ে প্রস্তাবিত নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী ১৭ নভেম্বর সেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে চ‚ড়ান্তভাবে অনুমোদনের জন্য।’
তিনি আরো জানান, ‘কর্ণফুলীর তলদেশে নির্মিত টানেল উদ্বোধন করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে আসলে একইসাথে উদ্বোধন করা হবে উল্লেখিত স্মৃতিসৌধ ও যাদুঘর নির্মাণের কাজ।’
তথ্য মতে, নগরীর লালদীঘি মাঠ থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ঘোষণা করা হয় চট্টগ্রাম থেকে। চট্টগ্রামে আছে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক স্মৃতিস্মারক। চট্টগ্রাম হচ্ছে স্বাধীনতা-সংগ্রামের সূতিকাগার। তবুও চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ, গণকবর ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি এতদিন। তদুপরি চট্টগ্রামের মানুষ সবগুলি জাতীয় দিবসে দেশের বীর সন্তানদেরকে সম্মান জানাতে জড়ো হতে হয় শহীদ মিনারে। শহীদ মিনার ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তৈরি হলেও এখানেই সবগুলো জাতীয় দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসে সম্মান জানাতে হয় মানুষকে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৬৯ সালে নন্দন কাননের মুসলিম ইনস্টিটিউট হলের সামনে নির্মিত শহীদ মিনারটিই চট্টগ্রামের মানুষদের জন্য একমাত্র স্বাধীনতা স্মৃতি স্মারক হয়ে আছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান জানান, ‘গত ২৫ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শনে গিয়ে জানিয়েছিলেন, কাট্টলীর প্রস্তাবিত স্থানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর হবে। সেখানে প্রায় ৩০ একর সরকারি জায়গা রয়েছে।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোজাফফর আহমেদ জানান, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল চট্টগ্রামে একটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ ও যাদুঘর নির্মাণের। এর আলোকে কাট্টলির ৩০ একর জায়গায় এটি নির্মাণের নকশা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন করার জন্য চট্টগ্রামে আসলে স্মৃতিসৌধ ও যাদুঘর নির্মাণকাজেরও উদ্বোধন করবেন বলে জানান ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রনাঙ্গণের এ বীরযোদ্ধা।