আলোকসজ্জায় আতিশয্য মানায় না!

4

পবিত্র রমজানের শুরুতে ব্যক্তিগতকাজে নগরের বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। গিয়ে তো চোখ ছানা বড়া। দেখা গেল নগরের সকল মার্কেট, কোথাও কোথাও ফুট ডিভাইগাঁর, গুরুত্বপূর্ণ মোড়েও আলোক সজ্জার মহাধুমধাম। অথচ দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোতে প্রান্তিক পর্যায়ের ভোক্তাদের কষ্টের সীমা নেই। সাথে আছে ঘন ঘন লোডশেডিং। অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এবং টিভিতে সরকার দেশের চাষিদের রাত এগারোটা থেকে ভোর সাতটা পর্যন্ত সেচ পাম্প চালানোর নির্দেশ দিচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সমুদ্র পৃষ্ঠের নোনা জল নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করছে। ভূ-অভ্যন্তরের পানির স্তর দিনে দিনে নেমে যাচ্ছে। এ বিরূপ অবস্থায়ও কৃষককে জলসেচের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তারপরও কৃষক তাঁর ঘুম হারাম করে গভীররাতে সেচযন্ত্র চালাতে হয় বৃষ্টি উৎপাদন বাড়াতে। কিন্তু দুভার্গ্য যে কৃষিপণ্যের যথাযথ মূল্য কী তারা পাচ্ছেন ? প্রশ্ন হলো দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি তখন কেন নগরের মার্কেটগুলোতে এই অহেতুক আলোকসজ্জা।
পিডিবি’র তথ্য অনুযায়ী দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেঘাওয়াট। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৩-২৪ হাজার মেগাওয়াট। এ হিসাব আমদানীকৃত বিদ্যুৎসহ। তারপরও দেশে গড়ে ২ থেকে ২.৫ হাজার মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি। ঘাটতির অন্যতম কারণ হলো, দেশে ১৭০ টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থাকলেও ৫৫/৬০টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি চালু আছে। সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকে ৫০-৫২টি কেন্দ্র। আবার আংশিক চালু বা বন্ধ থাকে ৬২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। দেশের বেশিভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো আমদানীকৃত জ্বালানি নির্ভর। এর মধ্যে গ্যাস নির্ভর কেন্দ্র হচ্ছে ৫১ শতাংশ, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নির্ভর হচ্ছে ৩৫ শতাংশ, কয়লা নির্ভর ৮ শতাংশ। বাকীগুলো অতিনি¤œ পর্যায়ে পানি ও সৌর বিদ্যুৎ ইত্যাদি। এক্ষেত্রে দেখা যায় গ্যাস, কয়লা, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি আমদানী নির্ভর। এই জ্বালানি আমদানী করতে হয় কষ্টার্জিত ডলারের মাধ্যমে। করোনা মহামারী , ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। ফলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও ডলার সংকট চলছে।
এহেন অবস্থায় দেশের মার্কেট ও ভবনগুলো আলোকসজ্জা দেশের অর্থনীতিতে কী অবদান রাখছে। অন্যভাবে বলা চলে এর কোন প্রয়োজন আছে ? অথচ বিদ্যুতের জন্য দেশের কৃষি শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রপ্তানী অন্যতম খাত পোশাকশিল্প মুখথুবড়ে পড়ার অবস্থা সেখানে আলোকসজ্জা করে জনগণের পকেট কাটার ব্যবস্থা আর কিছু নয়।
চাটগাঁইয়া একটি অশোভন প্রবাদ আছে, যার সাথে এই আলোকসজ্জার হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। প্রবাদটি হলো ‘পোদত নাই তেনা-মিঠা দি ভাত খানা’ বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি সুস্থ নয়। দেশের ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে নয়টিতে লাল সংকেত। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংক আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একে অন্যের সাথে মার্জ বা একীভূত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পরামর্শ দিয়েছে। ইতিমধ্যে পদ্মা বাংকের সাথে এক্সিম ব্যাংক একীভূত হওয়ার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বাংকগুলোর অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা-প্রাণে বাঁচি। অর্থাৎ তোর কুকুরগুলো সামাল দে। এই কুকুরগুলো হলো দেশের ব্যাংকমেরে এবং অবৈধ উপায়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা ব্যক্তিবর্গ। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, ধর্মপ্রাণ বাঙালিদের আকৃষ্ট করার নামে প্রতিষ্ঠিত শরীয়া ব্যাংকগুলোর অবস্থা বড়ই করুণ। এই ব্যাংকগুলোর মালিক হচ্ছেন এমন এক গ্রæপ যার কপালে বেহেস্তের দাগ জ্বল জ্বল করছে। তার নেতৃত্বে প্রায় সকল ব্যাংকগুলো ফুটো করে দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার ও ব্যাংকগুলোর বারোটা বাজিয়ে দেয়া দরবেশ খ্যাত এখন দেশের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টাবটে। রাষ্ট্র ক্ষমতা যখন ব্যবসায়ী গ্রæপের কবজায় থাকে তখন এর চেয়ে বেশিকিছু আশা বাতুলতা মাত্র। যে কারণে সরকার বাজার ব্যবস্থা সিন্ডিকেট ভাঙতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল ক্ষমতায় থাকার পরও জনগণ কষ্টে ভুগছেন।
কম বৃষ্টিপাত, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, চাহিদার বিপরীতে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও শিল্প কারখানায় জ্বালানীর অভাবে উৎপাদন হ্রাস, ডলার সংকট ইত্যাদি কারণে দেশের আর্থিক কাঠামো সন্তোষজনক নয়। তাহলে আমরা ফুটানির জন্য আলোকসজ্জা করে কেন নিজেদের পায়ে কুঠারাঘাত করছি। বাজার সিন্ডিকেটের কারণে এই অসংগতি। উত্তর বঙ্গের কৃষক ১০ টাকা কেজি দরে বেগুন বিক্রি করছে। আর শহরে নগরে যে বেগুন ৮০/৯০ টাকা কেজি। তরমুজ বিক্রি হচ্ছে কেজি হিসাবে। খেজুরের উপর শতভাগ শুল্ক আরোপ করা হলো। অথচ রোজাদারের কাছে রোজা ভাঙ্গতে প্রথম খেজুর খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নতের আমলটি কৌশলে অথবা অন্য কোন গোষ্ঠির ইঙ্গিতের বাস্তবায়ন নয় তো ? আল্লাহ ভালো জানেন। সম্প্রতি ইফতার মাহফিলকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। দেশে সিন্ডিকেট করে গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। মাথায় আসে না ইসলামী আকীদা পালনে এত অসহযোগ কেন। এদেশের ৯৫ শতাংশই মানুষ মুসলিম। মনে হচ্ছে মুসলমানদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উপর কারো কালো থাবা অগ্রসরমান।
বাংলাদেশ আমাদের। তিনলক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন। এ স্বাধীনতার অর্জনকে ধুলায় ধুসরিত হতে দেয়া যাবে না। পুঁজিবাদী সমাজ তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নানাবিধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তেমনি দেশের ভেতরে ও বাইরে অনেক চক্র আছে যারা এ স্বাধীনতাকে অর্থবহ হতে দিতে চায় না। অতএব দেশের জনগণও অর্থনৈতিক স্বার্থ সমুজ্জ্বল করতে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। মিতব্যয়ি হতে হবে। অহেতুক কোন আনন্দ লাভের আশায় দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া যাবে না। অনতিবিলম্বে ফুটানি দেখানো বা বাজার ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করার জন্য মার্কেটসহ সকল স্থাপনার প্রয়োজন অতিরিক্ত আলোকসজ্জা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে জ্বালানি ক্রয় করে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তাকে অপচয় করা যাবে না। প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া অতি জরুরি।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব)