আরিফের ইচ্ছে

27

গ্রামটা খুব বড় নয়, ছোট। গর্বে মন ভরে যায়। গ্রামে কি নেই। একটি সুশীল নদীর তীরে এই গ্রাম। নাম জাঁহানপুর। সরকারী প্রাইমারী ইশকুল,কিন্টার গার্ডেন ইশকুল,কলেজ,হাই ইশকুল, মন্দির, মসজিদে ভরপুর। গ্রামের প্রাইমারী ইশকুলের যথেষ্ট সুনাম আছে। সেই ইশকুলের মোহাম্মদ বাচেক মিঞা হেডমাষ্টার। অনেক নামডাক। গ্রামের সবাই বাচেক মাষ্টারকে পছন্দ করে। ভীষণ ভালোবাসে। তাঁর একমাত্র ছেলে কবির। ক্লাস ফোরে পড়ে। লেখাপড়ায় ভালো। তবে খুবই দুষ্টু।
স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু।
গ্রামের অনেকেই রাজাকারের ট্রেনিং দিচ্ছে। সহযোগীতা করে গ্রামের চেয়ারম্যান তোরাব আলী সরকার। আবার অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং নিতে ভারত যাচ্ছে।
চেয়ারম্যান ঘরে ঘরে রাজাকার পাঠায়। কার কার ছেলে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারত গেছে।
গ্রামে পানজাবীসেনা আসে। তোরাব আলী তাদের সেবাযত্ন করে। বাড়িতে খাওয়ায়। পুরো গ্রামে ঘুরে ওদের নিয়ে। প্রতিটি ঘর থকে মুক্তিযুদ্ধে গেছে। কার ঘরে যাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। অনেকেই তাঁর স্বজন,আত্মীয়।
রাজাকার কুদ্দুস বলে,
-চেয়ারম্যান চাচা, এই বাড়ির ছেলে লতিপ মুক্তিযুদ্ধে গেছে। এটাতো আপনার মেয়ের শ্বশুড়বাড়ি। লতিপ আপনার জামাই।
-চুপ কুদ্দুস।
পানজাবীসেনা জিগ্যেস করে,
-ও কি বলছে?
-কুচ নেহি,চলিয়ে। চয়ারম্যান উত্তর দেয়।
ওরা হাঁটে। চেয়ারম্যান ঘামে।
পানজাবীরা চলে যায়।
তোরাব আলী কুদ্দুসকে শাসায়।
-হারামজাদা, তুই আমার মেয়ের জামাইকে পাঞ্জাবী সেনাদের ধরিয়ে দিতে বলেছিস?
-আমি সত্য কথা বলেছি। মিথ্যাতো বলিনি। লতিপ মুক্তিযুদ্ধে যায়নি!
-থাম থাম,এক্কেবারে চুপ।
চারিদিকে তুমুল যুদ্ধ চলছে।
পাকসেনারা দাপটে বাঙালিদের হত্যা করছে। ছেলে,বুড়া,বুদ্ধিজীবি,শিক্ষক কাউকে বাদ দিচ্ছেনা। দেশের মানুষের চোখে ঘুম নেই।
একদিন সকালে হেডমাষ্টারের ছেলে কবির চুপিচুপি ছাদের উপরে উঠে। বাঁশের খুঁটিতে বাংলাদেশের পতাকা তোলে। কেউ জানেনা।
রাজাকার কুদ্দুস পতাকা দেখে।
একটি বার ও দাঁড়ায়না সে।
ছুটে যায় চেয়ারম্যানের বাড়ি।
হাঁফাতে হাঁফাতে বলে,
-চেয়ারম্যান চাচা,অবস্থা ভালো নয়।
-কি বলছিস,কি হয়েছে? চেয়ারম্যান প্রশ্ন করে।
-দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে!
-কে বললো,কার থেকে শুনেছিস?
– সিদ্দিক মাষ্টারের বাড়ির ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে।
– কি অলুক্ষণে কথা বলছিস! তা’হলেতো এই গ্রামে থাকা যাবেনা।
মুক্তিযোদ্ধারা মেরে ফেলবে। চলতো দেখি।
দু’জনে ছুটে যায় হেডমাষ্টারের বাড়ি।
দেখে,ঠিকই উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা।
চেয়ারম্যান সোজা হেডমাষ্টারের ঘরে ছুটে যায়।
দূর থেকে ডাকে,
-হেডমাষ্টার বাড়ি আছো?
হেডমাষ্টার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলে,
-চেয়ারম্যান সাহেব আপনি? কি মনে করে।
-কি মনে করে? এসো, উঠোনে এসো। সব দেখবে।
হেডমাষ্টার কিছু বুঝে না বুঝে উঠোনে আসে।
চেয়ারম্যানের পাশাপাশি দাঁড়ায়। বলে,
-কি হয়েছে বলুন।
ছাদের উপরে আঙুল উঁচিয়ে বলে,
-দেখো, ঐটা কি? মজা করছো? বাড়িতে স্বাধীনতার পতাকা তুলছো? দেশ স্বাধীন হয়েছে? হবে কোনদিন! এটা কে তুলছে?
হেডমাষ্টার উত্তর দেবার আগে তার ছেলে কবির সামনে এসে বলে,
-আমি তুলেছি।
হেডমাষ্টার কবিরের অমন কথায় কাঁপতে থাকে। মনে মনে ভাবে,এখন কি হবে! ছেলেকে যদি ধরে নিয়ে যায়,মেরে ফেলে। যেমন ভাবনা তাই হলো।
রাজাকার কুদ্দুসকে চেয়ারম্যান বলে,
-ওকে ধরে নিয়ে চল।
হেডমাষ্টার ছুটে চেয়ারম্যানের পায়ে লুটে পরে বলে,
-চেয়ারম্যান সাহেব,কবিরতো ছোট ছেলে। ও স্বাধীনতার কি বুঝে।
এবারের মতো ক্ষমা করে দেন।
-না- না এই অন্যায়ের ক্ষমা নেই। ওকে শাস্তি পেতেই হবে।
ঠিক তখনই চেয়ারম্যানের ছোটছেলে আরিফ ছুটে যায়।
বলে,
-আব্বা,কবিরের কোন দোষ নেই। ঐ পতাকা আমি দিয়ে বলেছি, এটা তোদের ছাদে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তুলবি। এটা উড়লেই দেশ স্বাধীন হবে।
আরিফের কথায় চেয়ারম্যান চুপ হয়ে যায়।
কা’কে কি বলবে বুঝতে পারে না।
শুধু ছোট্ট করে বলে,
-হেডমাষ্টার, তোমার ছেলেকে নিয়ে যাও।
হেডমাষ্টার আরিফকে বুকে জড়িয়ে বলে,
-সত্যি, তুমি দেশকে প্রচন্ড ভালোবাসো,হয়তো একদিন তোমার কথাই ঠিক হবে। দেশ স্বাধীন হবে।
হেডমাষ্টারের এই কথা শুনে চেয়ারম্যান রাগ করে না। স্বাধীন বাংলার পতাকা দেখে। হাসে।