আরাকানী বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত সীমান্তের বিদ্রোহীদের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে

12

গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত চলছিল মিয়ানমারসংলগ্ন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে উত্তেজনা। এজন্য বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কয়েকদফায় সতর্ক করেছিল। পরে দুই দেশের মধ্যে সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা সীমান্ত উত্তেজনা বন্ধ হয়। সূত্র জানায় সীমান্তে উত্তেজনার মূল কারণ ছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক আরাকানি বিদ্রোহীদের দমন। সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে গোলাগুলির বেশকিছু শেল বাংলাদেশ সীমান্তে এসে পড়েছিল তখন। শূন্য রেখায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছিল। তবে এবার যে জন্য সীমান্তে অস্থিরতা বিরাজ করছে তা দেশটির সরকার আর বিদ্রোহীদের কারণে নয়, বরং বহুধা বিভক্ত বিদ্রোহীরা পরস্পরের মধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় উত্তেজনা চলছে। জানা যায়, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরসা ও আরএসও’র মধ্যে এ সংঘাত চলছে। উভয়ের মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধে বান্দরবানের তুমব্রæ সীমান্তের শূন্যরেখার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির এলাকা পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে ২ রোহিঙ্গা নিহত ও একাধিক ব্যক্তি আহত হন। ঘটনার সময় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে আগুন দেখা যায়। যা ক্রমান্বয়ে পুরো শিবিরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ আগুন কারা দিয়েছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ সময় ওই শিবিরের রোহিঙ্গারা বান্দরবানের তুমব্রæ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেন। এসব ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এলাকায় বিজিবি সদস্যদের সতর্ক টহল বাড়ানো হয়েছে। তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এ ধরনের সংঘাত বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুেেলাতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশেষজ্ঞরা। গত বছর বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা শিবিরে আরাকানী স্বশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অপতৎপরতা লক্ষ করা গিয়েছিল। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরৎ যাওয়া আর না যাওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। এসময় বেশ কয়েকজন বিদ্রোহীর হতাহত হওয়ার ঘটনার খবরও আমরা জেনেছিলাম। স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে শিবিরগুলোতে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। কিন্তু বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মাঝে এ জাতীয় সংঘাত ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের করণীয় কী হবে, সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সীমান্তের ওপারে যাই হোক, এর প্রভাব যাতে বাংলাদেশের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে না পড়ে সেদিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে বিজিবিসহ স্থানীয় প্রশাসনকে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে মাত্র। এটি বাংলাদেশের দুর্বলতা নয়, উদারতা। মনে রাখতে হবে তারা কিন্তু শরণার্থী নয়। সুতরাং তাদের যেকোন বাড়াবাড়ি সরকার কঠোর হাতে দমন করবে-এমনটি প্রত্যাশা আমাদের। বিদ্রোহীরা যাতে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে না পারে সেই ব্যাপারে সীমান্ত রক্ষীদের আরো কঠোর হতে হবে। আমরা লক্ষ করে আসছি, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পর থেকে দেশটির সরকার এবং স্বশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের সাথে ভালো আচরণ করছে না। তারা নানা ইস্যুতে সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করে একধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস চালিয়ে আসছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারের নিক্ষেপ করা বেশ কয়েকটি মর্টার শেল বাংলাদেশের ভূখÐে এসে পড়েছে। বাংলাদেশের আকাশসীমায় বারবার ঢুকে পড়ছে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার। মর্টার শেলের আঘাতে একজন নিহত ও কয়েকজন আহতও হয়েছেন। ওই পরিস্থিতিতে ঘুমধুমসহ সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের চরম আতঙ্কে দিন কেটেছিল। উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে ৩০০ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছিল। সীমান্তরক্ষীসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য হলো, অতীতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযান করেছিল দেশটির বিদ্রোহী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে। এবার তারা নিজেরাই তুমুল সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটাই ক‚টনীতির অংশ হওয়া উচিত। এমনিতেই আমরা ১১ লাখের বেশি মিয়ানমারের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি, যা আমাদের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফেরত তো নিচ্ছেই না, উলটো বাংলাদেশ সীমান্তে তাদের নিক্ষেপ করা মর্টার শেল ও গোলা এসে পড়ছে। মিয়ানমারের এ তৎপরতা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক জটিল আকার ধারণ করবে। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ক‚টনৈতিক পন্থায় এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। আমরা আশা করব, ভবিষ্যতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করবে এবং বাংলাদেশ সীমান্তে যেকোন উত্তেজনা নিরসনে দেশটির সরকার আন্তরিক ভ‚মিকা রাখবে।