আরবীদের দৃষ্টিতে বাঙালি মাত্রেই মিসকিন

229

বাঙালি যত বড়ই হোক না কেন আরবীদের চোখে তারা মিসকিন। লক্ষাধিক অর্থ ব্যয়ে অনেকে দুবাই এসেছেন একব্যাগ স্বপ্ন নিয়ে। তপ্ত মরুবক্ষে তন্দুরি চিকেন বনেছেন স্বপ্ন বাস্তবায়নের নির্ঘুম প্রতিযোগিতায়। দিনের পর দিন বালি খেয়ে খালি উদর পূর্ণ করেছে। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির যোজন যোজন মাইল দূরত্ব অবলোকনে তপ্ত অশ্রুতে সিক্ত হয়েছে বালিশ। সাহারার মরুপ্রান্তরে প্রবাহমান লু-হাওয়া দেহের সাথে মনটাও ঝলসে দিয়ে গেছে। নিজের আর্থিক দৈন্যতা, সঞ্চয়ের শূন্যতা পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন কেউ বুঝতে চায় না। কারণ পিতৃ প্রদত্ত নামের পীঠে ‘দুবাই ওয়ালা’ নামক প্রকান্ড একটা স্ট্যাম্প লেগেছে। নিজের চাহিদা না মিটুক তাদের বিরাট ক্ষুধা মিটাতে প্রত্যহ নতুনভাবে জন্মগ্রহণ করতে হচ্ছে ধরণীর এই রং-বেরং এর মানুষের মাঝে। তুমি কি জানো- প্রবাসীরা কতো কঠিন পরিশ্রম করে ? তুমি কি জানো- তারা ঠান্ডা খাবার খেয়েও হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ? শরীরে রোগের উপস্থিতি টের পেয়েও অর্থাভাবে চিকিৎসা নিতে পারেনা এমন প্রবাসী শ্রমিক তুমি কি দেখেছো ? মায়ের অপারেশনের জন্য কিংবা বোনের বিয়ের খরচ যোগানোর জন্য কতো প্রবাসী অমানুষিক পরিশ্রম করছে ? আমি সেই প্রবাসীদের নীরব কান্না শুনেছি। লোনা জলে গন্ড সিক্ত হতে দেখেছি। পারস্য উপসাগরের তীরে নীলাভ ফেনিল তরঙ্গে তাদের স্বপ্নের ভেলা ভেসে যেতে দেখেছি এই আমি। আমি দেখেছি তাদের ধুসর স্বপ্নগুলি মরুভূমির বালির সাথে মিশে চিক চিক করে বিদ্রুপের হাসি হাসতে। ওরা ঈদের দিন কম্বল মুড়ি দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আনন্দের কান্না করে। সেই আশি/নব্বই দশকের বাংলাদেশ এখন আর নেই। বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে। আগে বিদেশি পত্রিকায় কঙ্কালসার শিশু আর কোমর পানিতে হাতে ভিক্ষার থালা সমৃদ্ধ অর্ধালোঙ্গ বয়স্ক নারী পুরুষের ছবি দেখা যেত বেশি। যে ছবিগুলি দেখে আমরা প্রবাসীরা বিদেশি কলিগদের সামনে মাথানত করে থাকতে হত। বিদেশিদের চোখে তখন বাংলাদেশ মানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর দুর্ভিক্ষের দেশ। শুনেছি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাহেব দেশি-বিদেশি পত্রিকায় এইধরনের ছবি ছাপানোর জন্য সাংবাদিকদের অনুপ্রাণিত করতেন। এবং বলতেন এই ধরনের ছবি বিদেশে পাবলিশ হলে আমরা (বাংলাদেশ) বেশি বেশি বিদেশি সাহায্য পাবো। আফসোস হয় আমাদের অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের ভিক্ষাভিত্তিক মানসিকতা দেখে। আজ বাংলাদেশ নিজ অর্থে পদ্মাসেতু করেছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে। অর্থনীতিতে ও শিক্ষায় পাকিস্তানকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বাগাড়ম্বরের জবাবে পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা নতুন প্রধানমন্ত্রীকে বলছে আল্লাহর ওয়াস্তে আগে বাংলাদেশ বানিয়ে দেখাও। প্রধানমন্ত্রীও একদিন আফসোস করে বলেছিলেন- বাংলাদেশ হার চিজ ছে হাম ছে আগে নিকাল গেয়া। (বাংলাদেশ সবকিছুতে আমাদেরকে পিছে ফেলে আগে চলে গেছে)। এখন আগেরমত অবস্থা নেই। বাঙালিদের কদর বেড়েছে। বিদেশি পত্রিকায় এখন আর আগের মত খরা-বন্যা দুর্ভিক্ষের চিত্র দেখানো হয় না। বিদেশি পত্রিকায় এখন শিরোনাম হয়- ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল’। প্রবাসীরা গর্বিত। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, প্রবাসীরা এখনো অবহেলিত। তাদের কোন ভোটাধিকার নেই। তাদেরকে সহজ কিস্তিকে ঋণ দেয়া হয় না, সরকারি প্লট দেয়া হয় না, বিনা শুল্কে গাড়ি আনার সুযোগ নেই। দেশে প্রবাসীদের পরিবারের নিরাপত্তা নেই। বিমানবন্দরে, দূতাবাসে ও কনস্যুলেটে প্রবাসীদের নানামুখী হয়রানী করা হয়। আমরা আরবীদের করুণা পাই কিন্তু স্বদেশীদের করুণা আকাশ কুসুম। অথচ প্রবাসীদেরকে বলা হয় রেমিটেন্স সৈনিক। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়েছে। ফজিরাহ থাকাকালীন সময়ের কথা। মাঝে মাঝে বাসায় পাক করতে ইচ্ছা না করলে বাইরে খেয়ে নিতাম। ফজিরাহ ছোট্ট শহর। পরিচিতজন প্রচুর। ভাত খেলে বাংলাদেশি হোটেলে যেতে হয়। সেখানে গিজগিজে পরিবেশ। আমি রাতে বেশিরভাগ রুটি খাই। ফজিরা হতে একটি পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট আছে আল মাদহাব রোডে। হোটেলটির মালিক, কর্মচারি সবাই আমাকে চেনেন। কারণ আল জামান রেস্টুরেন্ট আমার কাস্টমার। আমাদের কোম্পানির অয়েল, ঘি তাদেরকে আমিই সাপ্লাই করে থাকি। ওই হোটেলের দুটি জিনিস আমার পছন্দ, ডাল ফ্রাই আর ফিশ ফ্রাই। মাঝে মাঝে আমার বস দুবাই থেকে এরিয়া ভিজিটে এলে তাকে নিয়ে এই হোটেলেই ফিশ বিরিয়ানি খেয়ে থাকি। দেড় পোয়া/ আধ কেজি ওজনের আস্ত শেয়েরি মাছ ফ্রাই এর সাথে ফ্রাইড রাইস অবর্ণনীয় সুস্বাদু রসনা তৃপ্তকারী এক লাঞ্চ। পাকিস্তানি পেটুক বস যতবারই ফজিরাহ আসেন ততবারই রুটিন করা এই লাঞ্চ। যেদিন রান্না করার সময় হয়না সেদিন হোটেল জামান এ ফিশ বিরিয়ানি। আর রাতে হলে ডাল ফ্রাই এর সাথে একটি তন্দুরি রুটি (নান)। একদা রাতে ডাল ফ্রাই আর রুটি খাওয়ার জন্য জামানে ঢুকলাম। প্রচন্ড ভিড়। বসার জায়গা নেই। দুই চেয়ার অলা একটি টেবিল খালি হতেই এক ওয়েটার আমাকে বসিয়ে দিল। কী খাবো আর জিজ্ঞেস করেনি, কারণ আমি দিনে ফিশ বিরিয়ানি খাই আর রাতে ডাল ফ্রাই আর রুটি খাই। এটা তাদের জানা কথা। ইত্যবসরে এক মাঝবয়সী আরবী সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সামনের চেয়ারে কেউ আছে কিনা। আমি ‘না’ বলতেই ভদ্রলোক বসে পড়লেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন খাবার অর্ডার করেছি কিনা। আমি বললাম, আমার অর্ডার দিয়ে দিছি। আরবী লোকটি চিকেন টিক্কা, মাটান কারি, শামী কাবাব রাইস আর রুটি দুটিই অর্ডার করলেন। আরবীদের দেখেছি যথেষ্ট পরিমাণে খাবার অপচয় করে থাকে। একদা বৈকালে চা খেতে এক বাঙালি হোটেলে বসেছিলাম। এক আরবী যুবক এসে থপ করে আমার সামনের চেয়ারটায় বসে খাবারের অর্ডার দিলেন। আমি চা খেতে খেতে টেবিলে তার জন্য চিকেন বিরিয়ানি এলো। ফিশ ফ্রাই এলো, চিকেন চিলি­ ও তন্দুরি রুটি এলো। সাথে চা এককাপ ও সেভেন আপ এর একটা ক্যান। আরবী যুবকটি দুইহাতের আস্তিন গুটায়ে খাওয়া আরম্ভ করলেন এইভাবে-একমুষ্ঠি বিরিয়ানি মুখে দেয়। একটুকরা রুটি মুখে দেয়। অতঃপর একচুমুক চা, একচুমুক সেভেন আপ। অন্য কাস্টমারেরা আড় চোখে তাকে দেখছে। দশ মিনিটে যখন খাবার শেষ করে উঠলো তখন দেখলাম, তার বেঁচে যাওয়া খাবার থেকে আরও দুজন খেতে পারবে। ফিরে আসি আমার ফজিরার হোটেলের প্রসঙ্গে। আমার জন্য রুটি আর ডাল এসে গেছে। সামনা-সামনি বসা তাই সৌজন্য হেতু আমার সাথে খেতে আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি মৃদু হেসে বললেন- বিসমিল্লাহ্। বুঝলাম আমাকে খেতে এজাজত দিলেন। আমি শুরু করতেই তার খাবার এসে টেবিল পুরোটাই ভরে গেল। এবার তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন, বললেন- ফাদ্দাল। আমি বিনয়ের সাথে বললাম, শোকরান। দেখলাম তিনি চিকেন টিক্কা, শামীকাবাব, মাটানকারী এক এক করে আমার প্লেটে তুলে দিচ্ছেন। আমি যতই না করছি উনি ততোই খান খান বলছেন। আচ্ছা কি আর করা, ভাবলাম বিলটা নাহয় আমিই দিয়ে দেবো। কিন্তু তাও পারলাম না। উনি আমার আগেই উঠে আমার বিল সহ দিয়ে দিলেন। কাউন্টারে মালিক বসা ছিল। তাকে বললাম আমিতো ওই আরবীকে চিনি না। আপনি আমার বিল নিলেন কেন জিজ্ঞেস না করে। হোটেল মালিক বললেন- না নিলে উনি রাগ করবেন। উনি প্রতিদিন এরকম দুয়েক জনের খাবারের বিল দেন। মাঝে মাঝে বাইরে থেকেও ধরে নিয়ে আসেন কাওকে কাওকে। আমি বিব্রতবোধ করলাম। তাহলে কী এই আরবী আমাকে মিছকিন মনে করে খাইয়ে দিলেন ? সারাপথ গাড়িতে ভেবেছি। নিজেকে মিসকিন মিসকিন লাগছে। অনেক আরবী বাঙালিদের প্রতি এভাবে করুণা করে থাকে। বলে থাকে কুল্লুমিছকিন। (সবাই গরীব)।
রমজান মাসে আরবী অধ্যুষিত এলাকার কোন মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে দেখা যায় নামাজের পর অনেক আরবী বাঙালি বা ইন্ডিয়ানি দেখলেই হাতের ভেতর ২০/৫০/১০০ টাকা ঢুকিয়ে দেয়। এভাবে সারা রমজান চলতে থাকে। বাঙালিরা সংকোচ করলেও ভারতীয়রা উৎফুল্ল চিত্তে হাত বাড়িয়ে নেয়।

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক