আমেরিকার গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে ভুলুণ্ঠিত করে বিদায় নিতে হবে ট্রাম্পকে

15

কাজি রশিদ উদ্দিন

তিনি পাগল, রাগী, জেদি, ঝগড়াটে ও উগ্র, তবে নিজ সমর্থকদের কাছে হিরো। এমন এক হিরো, যিনি এমেরিকার গণতন্ত্রকে কলংকিত করলেন। যিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘বিশ্বাসঘাতক প্রতারক’ অভিহিত করেছেন এবং ঘৃণা-বিদ্বেষকে স্বীয় রাজনীতির ভিত বানিয়েছেন। পাঠকদের জানার কথা, বিদ্বেষের রাজনীতি করা এই ব্যক্তির নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। ট্রাম্প আমেরিকান ইতিহাসের প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের ওপর কমপক্ষে পঁচিশবার বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণার মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করেছেন। কিন্তু কোনো একটি অভিযোগও প্রমাণ করতে পারেন নি। প্রথম বছর তিনি মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএনের বিরুদ্ধে ‘ফেক নিউজ’ ছড়ানোর অভিযোগ আরোপ করেন এবং এই চ্যানেল বয়কটের আবেদন জানান। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিয়ণমতান্ত্রিক ফল সামনে আসার আগেই ট্রাম্প তার জয়ের ঘোষণা করেন এবং এ ঘোষণা এ বছরের সবচেয়ে বড় ফেক নিউজে পরিণত হয়। এই হঠকারী ট্রাম্প, যিনি অন্যের ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে তার সম্মান নিয়ে টানাহেচড়া করেছেন। আজ নিজেই সারা বিশ্বে ফেক নিউজের নিদর্শনে পরিণত হয়েছেন।
ট্রাম্প শুধু একজন ব্যক্তির নাম নয় বরং এটি একটি রীতিনীতির নাম। আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা ট্রাম্পের মতো রাজনীতিবিদকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বিরাজমান দেখতে পাই। যারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রতারণার অভিযোগ আনেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দাবানোর চেষ্টা করেন। ধর্ম-বর্ণ-ভাষার বৈষম্যের ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ এবং নিজের সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করেন। ট্রাম্পের পরাজয় দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ডানপন্থীদের স্বার্থান্ধ রাজনীতির পতনের সুচনা। এ ধরনের রাজনীতিবিদ নেতা শুধু মিথ্যা ওয়াদা করেন। জনগণকে জুলুম, অবিচার থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখান এবং শাসক হওয়ার পর নিজেরা জালিম হয়ে যান। তারা দরিদ্রের ওপর ঊর্ধ্বমূল্য চাপিয়ে দেন; অথপর অযোগ্যতা ও দুর্নীতিকে আড়াল করার জন্য বিরোধী পক্ষের ওপর দুর্নীতির অভিযোগ আরোপ করেন। যখন অন্যদের ওপর আরোপিত দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয় না। তখন ট্রাম্পের মতো নেতাদের শেষ আশ্রয়স্থল হয় দেশপ্রেম। তখন তারা বড় বড় ‘দেশপ্রেমিক’ হয়ে যান এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘দেশের শত্রæ’ অভিহিত করতে থাকেন। ট্রাম্প তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ওবামাকে শুধু এ জন্য বিশ্বাসঘাতক অভিহিত করেছেন যে, তিনি তার বিরোধী দলের ছিলেন এবং তার বর্ণ ছিল ভিন্ন। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ওবামা আমার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করিয়েছেন এবং এটা বিশ্বাস ঘাতকতার নামান্তর ; ওবামা প্রেসিডেন্ট হয়ে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের এক করেছেন। আর ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। ট্রাম্প শুধু শ্বেতাঙ্গদেরকে নিজের শক্তি বানানোর চেষ্টা করেছেন। যে কেউ ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন। তিনিই ‘দেশের শত্রæ’ অভিহিত হয়েছেন। ট্রাম্প নিউ ইয়ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের মতো পত্রিকার বিরুদ্ধেও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আরোপ করেছেন। তার দেখা দেখি কয়েকটি গণতান্ত্রিক দেশের সরকারও মিডিয়াকে দাবানোর চেষ্টা শুরু করে দেয়। কিন্তু মিডিয়াকে উপদেশ গ্রহণের নিদর্শন বানানোর প্রচেষ্টাকারী ট্রাম্প আজ নিজেই উপদেশ গ্রহণের নিদর্শনে পরিণত হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য, ট্রাম্প ২০১৫ সালে লন্ডনের মেয়র সাদেক খানের ব্যক্তিত্বের ওপর আক্রমণ শুরু করেছিলেন। ট্রাম্প তার প্রথম নির্বাচনী অভিযানে ঘোষণা করেছিলেন ‘তিনি মুলসমানদের আমেরিকায় প্রবেশ বন্ধ করে দেবেন। সাদেক খান এই বক্তব্যের নিন্দা প্রকাশ করেছিলেন। তাই ট্রাম্প সাদেক খানকে কয়েকবার অযোগ্য বলে অভিহিত করে বলেন, লন্ডনের এক নতুন মেয়র প্রয়োজন। সাদেক খান ট্রাম্পের পছন্দের মানুষ ছিলেন না। কারণ তিনি মুসলমান বিদ্বেষ ও গোড়ামিকে ভিত্তি করে রাজনীতি করা ট্রাম্পের সাদেক খানকে ভালো লাগত না। কিন্তু যেখানে ট্রাম্পের নিজের স্বার্থ, সেখানে তিনি মুসলমান হলেও বাদশাহদের সাথে নাচতেও গর্ব অনুভব করতেন। ট্রাম্পের এ ‘ইউটার্ন তাকে পরাজয় থেকে রক্ষা করতে পারেনি। আর ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ-মুসলমান। বৃদ্ধ-যুবক সবাই মিলে ট্রাম্পকে পরাজিত করেছেন। এটা একজন ব্যক্তির গণতান্ত্রিক দেশে কিছুটা কম বয়সি নেতা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। কিন্তু আমেরিকা ৭৮ বছর বয়স্ক জো বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে এ বার্তা দিয়েছেন যে, তাদের একজন এমন চিন্তাশীল ও অভিজ্ঞ নেতার প্রয়োজন। যিনি আমেরিকাকে এক করে রাখতে পারেন। জো বাইডেন আদর্শিক বা অনেক বড় বিপ্লবী নেতা নন। ত্রিশ বছর বয়সে প্রথমবার সিনেটর হন এবং আটাত্তর বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট হলেন। তাঁর জয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমনা হ্যারিস গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছেন। যার কারণে জো বাইডেনকে আফ্রিকান বংশোদ্ভুত ও এশিয়ান মার্কিনিরা বিশাল সংখ্যায় ভোট দেন। ট্রাম্প মার্কিন সমাজে এতটাই বিদ্বেষ ও শংকা ছড়িয়ে দেখেছিলেন যে, বিজয়ের ঘোষণায় বাইডেনের সমর্থকরা অতি আবেগের কারণে কাঁদতে থাকেন। তাদের মনে মনে হয়েছে। আমেরিকা দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা অর্জন করল।
অপরদিকে ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা দেন। তার অভিযোগ, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তবে আদালতেই তিনি জয়লাভ করতে পারেননিÑ বরং হেরে গিয়েছেন। তবে তাকে হোয়াইট হাউস থেকে বেরিয়েই যেতে হবে। ট্রাম্পের সুর এখন বেশ নরম হয়ে গেছে। এতেই তার সর্বশেষ কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছে। তবে হোয়াইট হাউজ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তার জন্য মিথ্যা বলা কঠিন। তিনি যা কিছুই মিথ্যা বলবেন, টুইটার সহ সব মার্কিন টিভি চ্যানেলে বিশ্বকে জানিয়ে দেবে, ট্রাম্প মিথ্যাবাদী, মিথ্যা বিশ্বকে বিভক্ত ও অনিরাপদ করে দিয়েছে। সময় এসেছে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে মিডিয়া ট্রাম্পের মতো মিথ্যাবাদী ও আত্মম্ভরীদের সামনে বুক টান করে দাড়িয়ে যাবে এবং তাদের মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করে জনগণকে এমন অশিষ্টাচারীদের থেকে মুক্তি দেবে।
এখানে বলে রাখা ভালো মার্কিন নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোসেফ বাইডেন। তিনি ইলেক্টোরাল ও পপুলার উভয় ভোটে বিজয় লাভ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫৩৮ ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের ২৭০টি যিনি জিতে নেন। তিনিই বিজয়ী হন। এবারের নির্বাচনে জো বাইডেন পেয়েছেন ৩০৬টি ইলেকটোরাল ভোট, অন্যদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন ২৩২টি। বিজয়ী বাইডেন পপুলার ভোট পেয়েছেন প্রায় আট কোটি ৬০ লাখেরও বেশি পপুলার ভোটে ট্রাম্পকে পরাজিত করেন বাইডেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাথে সাথে নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেন নি। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য হচ্ছে, বিজয়ী প্রার্থীকে পরাজিত প্রার্থীর অভিনন্দন জানানো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ঐতিহ্যের ব্যত্য ঘটিয়েছেন। উল্টো বলেছেন, নির্বাচনে তিনিই বিজয়ী হয়েছেন। ৪ নভেম্বর হোয়াইট হাউজে প্রেস ব্রিফিংয়ে নিজেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। এরপর একের পর এক টুইটে ট্রাম্প নির্বাচনে আমিই বিজয়ী। বলে প্রচার করেন। জো বাইডেনের কাছে পরাস্ত হয়েছেন। ট্রাম্প কিছুতেই তা মানতে রাজি নন।
গত ১৬ নভেম্বর একবার টুইটে তিনি নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেন এই বলে যে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলেই বাইডেন জিতেছেন। এর পরেই আবার টুইট করেছেন; হার মানার কোনো প্রশ্নই ওঠেনা, আমরাই জয়লাভ করব।Ñ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই ভোট জালিয়াতি ও চুরির অভিযোগ তোলেন। তিনি কয়েকটি রাজ্যে ভোট চুরির মামলা করেন। কিন্তু আদালতে সেসব মামলা খারিজ হয়ে যায়। তারপরও ট্রাম্পের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন রাজ্যে তদন্ত করা হয়, ভোট পুনঃগণনা করা হয়। তদন্ত ও পুনঃগণনা শেষে নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্মকর্তা তথা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অর্থাৎ সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (সিআইএসএ) স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, এই নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সুরক্ষিত নির্বাচন; তারা এ কথাও জানিয়ে দেন। ‘এ নির্বাচনে কোনো ভোট মুছে যাওয়া বা অন্য কোনো ধরনের জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তাই ট্রাম্পের পুরো আচরণ আমেরিকার জন্য বিবৃতকর হয়ে উঠছে। তবে বড় সত্য হচ্ছে, হোয়াইট হাউজ ট্রাম্পের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এর মালিকানা এখন জো বাইডেনের হাতে।
ইতিমধ্যে জো বাইডেন তার বিজয়ী ভাষণে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ঐক্য, সহনশীলতা ও সহযোগিতার সমাজ গড়ে তোলাই হবে আমার কাজ। তিনি বলেন, আর বিভাজন নয়, বিভেদ নয়, ঐক্য চাই। কোন রাজ্য নীল আর কোন রাজ্য লাল তা দেখবো না। আমি দেখবো যুক্তরাষ্ট্রকে। কে আমাকে ভোট দিলো আর কে দিলোনা, তা নয়। আমি সবার প্রেসিডেন্ট হতে চাই। ট্রাম্পের ফল না মানার তৎপরতার বিরুদ্ধে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন গণতন্ত্রকে দুর্বল করবে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো নির্বাচনে পরাজিত হয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তা মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং নির্বাচন সুষ্ঠ হয়নি। কারচুপি হয়েছে ইত্যাদি বলে, সে দেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে খেলো ও ভুলুণ্ঠিত করে গেলেন এবং এর ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করলেন এবং একটি খারাপ নজির স্থাপন করলেন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট