আমি নাকি দুষ্টু ভীষণ

200

আমি নাকি দুষ্টু ভীষণ, শিবুকান্তি দাশের কিশোরকবিতার বই।এ বছর ফেব্রæয়ারির বইমেলায় বইটি প্রকাশ করেছে আদিগন্ত প্রকাশন। মোট ২৬টি কিশোরকবিতা নিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। কিশোরদের নানান ভাবনা তাঁর লেখায় উপজীব্য হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি,এ দেশের সবুজ পল্লীপ্রকৃতি, নিজ গ্রামের প্রতি লখকের মায়াবী আকর্ষণ,দেশপ্রেম- এসব অনুসঙ্গও এ বইতে উঠে এসেছে। দেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ,ভাষা আন্দোলন,এমনকি দেশের সমসাময়িক সমস্যাবলী নিয়েও লিখতে ভোলেননি সমাজ সচেতন কবি শিবুকান্তি দাশ।
বইতে শিবুকান্তি দাশ যে কিশোরের মনস্তাত্বিক চিত্রকল্প এঁকেছেন, সে কিশোর একজন সুবোধ কিশোরই শুধু নয়, সে কিশোর মাঝে মাঝে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী, শুধু তাই নয়, কিশোরোত্তীর্ণ বয়সে বয়ঃসন্ধি কালের এক ব্যক্তিমানসের প্রতিনিধি হয়েও ধরা দেয় এ বইয়ের কিশোর চরিত্রগুলো। তাঁর বইয়ের কিশোরেরা কোন সামাজিক অসঙ্গতি দেখলে নিশ্চুপ বসে থাকে না, তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠতেও জানে। বইয়ের প্রথম কবিতা ‘সত্য কথা বলব’ তে সে প্রতিবাদী কিশোরকে আমরা দেখতে পাই এভাবে-
ষোল বছর বয়সে শেষ বিদ্যালয়ের পাঠ
বাবার হাতটা ধরে চিনি অজানা পথ-ঘাট
এখন আমি বুঝতে পারি রঙ্গিন-কালো রূপ
অসঙ্গতি দেখলে পরে থাকি না তো চুপ।
বইতে শিবুকান্তি দাশের কিশোরেরা সব সময় কিন্তু সুবোধ কিশোরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়নি। সে কিশোরেরা মাঝে মাঝে বাবা মায়ের অবাধ্য হয়ে ওঠে। সে কিশোরকেই আমরা বলতে পারি দুষ্টু কিশোর, যাকে নিয়ে ‘আমি নাকি দুষ্টু ভীষণ’ বইয়ের নামকরণ, সে দুষ্টু কিশোর কোনো কিছুতেই ভয় পায়না, েেস কিশোরকে কেউ চোখ রাঙালে সেও চোখ রাঙায়, সে কিশোর মায়ের নিষেধ অমান্য করে ব্যামো হওয়ার ভয় উপেক্ষা করে আইসক্রীম খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে, সে কিশোর মায়ের ঘুমিয়ে থাকার সুযোগে ঘর থেকে পালাতে চায়, সে কিশোরকেই অলঙ্করণ করেছেন শিবুকান্তি দাশ। তবে সে কিশোর শেষাবধি প্রকৃতির আহবানের প্রতি অনুগত এক কিশোর হিসেবেই ধরা দিয়েছে এভাবে-
আমায় যেনো ডাকে কারা
মুক্ত হাওয়ার পরে
ঘর ছেড়ে বের হতে আমার
মনটা কেমন করে,
শুধু মনটা কেমন করে।
(আমি নাকি দুষ্টু ভীষণ)
প্রকৃতির সৌন্দযের প্রতি অবনত সে কিশোর তাইতো উঠোন পাশে ফুটে ওঠা রক্তজবা, কচি সবুজ ঘাসের ডগা, ঝিরিঝিরি বয়ে যাওয়া ভোরের হাওয়া, আকাশে ডানা মেলা পাখির আহবান উপেক্ষা করতে পারেনা, তাই সে নিজেও হয়ে ওঠে পাখি, প্রকৃতির মাঝে নিজেকে আকাত্ম করে দেয় সে এমনিভাবে-
কী যে ভালো লাগে আমার মন হয়ে যায় পাখি
পাখির ডানায় উড়তে উড়তে দৃষ্টি দূরে রাখি
হঠাৎ দেখি হারিয়ে গেলাম নীল আকাশের ভাঁজে
হাজার তাঁরার মাঝে।
(শুভ সকাল)
অথচ, ‘মা ঘুমিয়ে গেলেই আমি পালাই পালাই’ বলে যে কিশোর নিসর্গের আহবানে মায়ের অবাধ্য হতে চেয়েছিল, সময়ের বিবর্তনে একসময় সে কিশোর মায়ের প্রতি তার ভাবকাতরতা উপেক্ষা করতে পারেনা। সে কর্ণফুলির পারে নিরবে নিভৃতে অবস্থান করা মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার টান অনুভব করে তীব্রভাবে। ‘মায়ের কাছে যাব আমি’ কবিতায় সে আবেগের তীব্রতা প্রকাশিত হয়েছে এভাবে-
মায়ের কাছে থাকব গিয়ে যেমন ছিলাম আগে
মরিচপোড়া পান্তা ভাতে সুখের পরশ জাগে।
শুধু মাতৃপ্রেমই নয়, দেশপ্রেমও প্রগাঢ় হয়ে ধরা দিয়েছে এ বইয়ে।‘এই যে আমার সোনার দেশ’ কবিতায় কবি এমন একটি সুখী বাংলাদেশের চিত্র এঁকেছেন, যে দেশে সকাল হলে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে, যে দেশে অরুণ আলোর ঝিকিমিকি মনে পুলক জাগায়, যে দেশে এখনো দুর্গা-অপু আম পাতার বাঁশিতে ভেঁপু বাজায়। আর সেই সুন্দর বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়ার জন্য তিনি গাঁয়ের পথেই আমাদের আহবান জানিয়েছেন-
‘এই যে আমার সোনার দেশটা দেখবে যদি এসো গাঁয়ে
আম কাঁঠালের গন্ধ পাবে, বসবে যদি বটের ছায়ে’।
(এই যে আমার সোনার দেশ)
শিবুকান্তি দাশ দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে শিশু কিশোরদের পরিচয় করিয়ে দিতে ভোলেন নি। তাই তাঁর কবিতায় দেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা এসেছে, এসেছে ভাষা আন্দোলনের কথা। শুধু তাই নয়, শিশু কিশোরদেরকে এ দেশের সঠিক ইতিহাসের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আহবানের কথা, সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণার কথা। জাতির জনকের প্রতি তিনি তাঁর প্রণতি জানিয়েছেন এভাবে-
বঙ্গবন্ধু জাতির পতা বিস্ময়ের বিস্ময়!
তাঁর হাতে হাত ধরে আসে স্বাধীনতার জয়
আজকে তিনি নেই কাছে নেই অর্ঘ্য জানাই ফুলে
আমরা যেন কেউ কখনো যাই না তাঁকে ভুলে।
(বঙ্গবন্ধুর ডাকে)
বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরদের নিয়ে শিবুকান্তি দাশ এ বইতে লিখেছেন একাধিক কবিতা। কিশোর বয়সের এ সন্ধিকালে কিশোরদের মধ্যে যে মানসিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়, তা উল্লেখিত হয়েছে তাঁর কবিতায়।‘বয়ঃসন্ধিকাল’ কবিতায় কবি নিজেই বলেছেন, ‘এ সময়টায় মনটা নাকি উড়–উড়– হয়’। উড়–উড়– মনের সে কিশোরেরা এভাবেই ধরা দিয়েছে এ বইতে-
‘সেই আমিটা কেমন কেমন হলাম যেন দ্যাখো
আগের মতো কেউ কি এখন আমায় মনে রাখো?’
(কীসের নেশায়)
‘এমন উড়–উড়– ভাবটা বুঝতে চায় না কেউ
আঠারতে বুকের ভেতর উঠাল পাতাল ঢেউ’
(আঠারতে পা দিয়েছি)
আঠারতে পা দেয়া বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরের প্রতি অভিভাবকগণ মাঝে মাঝে বিরূপ আচরণ করেন, শিবুকান্তি দাশ তাঁর কবিতায় এভাবেই তা প্রকাশ করেছেন, যা আমাদের মনে সহানুভূতির উদ্রেক করে-
‘মাঝে মাঝে তেড়ে আসে ক্ষুব্ধ বাবার হাত
কৈফিয়ত চায় ঘরে ফিরতে হচ্ছে কেনো রাত’
(আঠারতে পা দিয়েছি)
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরকে নিয়ে লিখেছেন। ‘ছুটি’ গল্পে এমনি এক কিশোর ফটিকের চরিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে কবিগুরু বলেছিলেন,‘তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই । শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না । স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে’।
তবে সব কিছু অতিক্রম করে বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরদের নিয়ে লেখা কবিতাগুলো কিশোরদের প্রতি অভিভাবকদের ও সমাজের দায়বদ্ধতার প্রয়োজনীয়তার প্রতিই ইঙ্গিত প্রদান করে। আর বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরদের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। সুন্দর কবিতাগুলোর সাথে রং তুলির আচঁড় কেটে শিল্পী নাসিম আহমেদ আরো জীবন ঘনিষ্ট করে তুলেছেন। বেশ বড় সাইজের বোড বাইন্ডিং বইটির বিনিময় মূল্য রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা মাত্র। সর্বপরি সংগ্রহে রাখার মতো একটি চমৎকার বই ‘আমি নাকি দুষ্টু ভীষণ’।