আমার সোনালী শৈশব

11

 

সেই যে হলুদ পাখী বসে জামরুল গাছের ডালে, করতো ডাকাডাকি আমার শৈশবের সকালে… ক্যাকটাসের এই গানটি যখন শুনতাম আগে, আমার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিলো, সকলের শৈশবে একটি জামরুল গাছ থাকতো, আমার তো ছিলই। খুব ছেলেবেলায় আমরা তিন ভাইবোন, ছাদে সবুজ পাতায় ভরা ঝাঁকড়া, ফল ভর্তি জামরুল গাছটির কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম। হাত বাড়ালেই ফল পেয়ে যাবো। মামনির কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল, একটাও ফল ছেঁড়া যাবেনা প্রতিবেশীর অনুমতি না নিয়ে। আমরা চেয়ে থাকতাম, প্রাচীরের গায়ে দাঁড়িয়েই গল্প করতাম, গান গাইতাম, খেলতাম। যাঁর গাছ সেই কাকু বলতেন, তোমরা নাও, খাও। আমরা বলতাম মামনি বকবে খুব। উনি বাড়ি এসে ঝুড়ি ভর্তি দিয়ে যেতেন, মামণি ও গাছের ফলসা কাঁঠাল পেয়ারা দিতেন। কোনো গাছের পাতা ছিঁড়লেই মামণি এসে কান টা কিম্বা হাতে মোচড় দিয়ে বলতেন, লাগছে তোমার? ওর ও লাগছে, অহেতুক ডালে পাতায় আঘাত করোনা। সবচেয়ে অবাক লাগতো, কোনো মরণাপন্ন গাছ যা একদম শুকিয়ে ঝরে গেছে, কত জন এসে আমার মামনির হাতে তুলে দিয়ে বলতেন এখনো বলেন দেখো তো একে বাঁচাতে পারো কি না, মামণি কি ভাবে যে ওদের বাঁচিয়ে তুলতেন, আমিও অমন কত গাছ দিয়েছি, মানু দেখো না, মামণি শুধু বাঁচিয়ে তোলেন না, আরো গাছ বানিয়ে ফেলেন ওই একটি গাছ থেকে। গিয়ে দেখি কি খুশি তারা সব। মানু বলেন, দ্যাখ চিনতে পারিস ওকে? পাথরকুচি পাতা, থানকুনি পাতা, বাসক পাতা, কাল মেঘ ,তুলসী আরো যে কত কি রস খেয়েছি, শুধু আমরা নয়, পুরো পাড়ার বাচ্চারা তার ইয়ত্তা নেই। বাবা গো কি বাজে কি বাজে খেতে আমি কাঁদতাম, হাত পা ছুড়তে থাকতাম, চিৎকার করতাম, মামণি চুপ করে বসে থাকতেন। তারপর বলতেন হয়েছে সব, এবার খেয়ে নাও। তারপর মধু দিতেন একটু। আমাদের জন্মের সেই বাড়িটা, সেই ছাদ সেই জামরুল গাছ একই আছে। আমি, পাখি, দাদার ছোট্ট একরত্তি পুঁচকে বিচ্ছু, মামণি দাঁড়ালাম সেই গাছটার সামনে। কেউ হাত বাড়ায় নি। সেই প্রতিবেশী কাকু বললেন নিচ থেকে দেখে, মনা তুমি কবে এলে, তোমার মেয়ে কত্ত বড় হয়ে গেছে। খাও, জামরুল। আমি বললাম নেবো কাকু?উনি বললেন, নিশ্চয়ই নাও, আমি বলছি, মামনির দিকে তাকিয়ে বললেন, বকবেন না যেন?