আমার নিশীথ রাতের বাদলধারা

6

ডেইজী মউদুদ

‘আমার নিশীথ রাতের বাদলধারা, এসো হে গোপনে, আমার স্বপনলোকের দিশেহারা’ বর্ষামঙ্গলের কবি রবীন্দ্রনাথের পক্ষেই লেখা সম্ভব এই ধরনের চরণ। গত পহেলা আষাঢ়ের আগমনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতিতে বর্ষা ঋতুর সূচনা ঘটে। ঋতুচক্রে আষাঢ় ও শ্রাবণ এ দু মাস বর্ষাকাল হলেও এবার বর্ষা এসেছে আগাম। গ্রীষ্মকালের শেষের দিকে বৈশাখ মাস থেকেই আমরা বৃষ্টির দেখা পেয়েছি। প্রচÐ খড়তাপে যখন মানুষের জীবন প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন মাঝে মাঝে হঠাৎ বৃষ্টির একটি শীতল ঝাপটা, কিংবা গুরু গুরু মেঘের গর্জন, কখনো বা বৈশাখী ঝড়ো হাওয়া আমাদের কাছে বর্ষার আমেজ নিয়ে আসে। কবি তাই বর্ষাকে নব যৌবনা নামে ডেকে লিখেছিলেন : ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে/ জলসিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ রভসে/ ঘন গৌরবে নব যৌবনা বরষা/ শ্যাম গম্ভীর সরসা’। বর্ষায় প্রকৃতি এতই সজীব আর প্রাণময় হয়ে উঠে , এই সৌন্দর্য্যে কবিমন চঞ্চল না হয়ে থাকতে পারেনা। চÐীদাসের ‘সদাই ধেয়ানে চাহে মেঘপানে না চলে নয়ানতারা / বিরতি আহারে রাঙাবাস পরে যেমতি যোগিনী পাড়া’ কিংবা বিদ্যাপতির ‘এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’ এসব চরণ বর্ষার রূপচিত্র দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। আর বর্ষা মানেই কালিদাশ, আর কালিদাশ মানেই মেঘদূত! কর্মে অবহেলা করায় যক্ষকে নির্বাসনে পাঠায় বিন্দ্যাপর্বত থেকে রামগিরিতে । বিরহী যক্ষ আকাশে এক খÐ মেঘ দেখতে পেয়ে মেঘকে দূত করে তার প্রিয়ার কাছে বার্তা পাঠায় । মেঘদূতে মহাকবি কালিদাশ বর্ষাঋতুকে বিরহী ঋতু হিসেবে চিহ্নিত করে যক্ষের বিরহবেদনা কে মানবায়িত করে তুলেছেন। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পদগুলুতে আকাশে কালো মেঘ দেখলে কালো কৃষ্ণকে মনে পড়ে যেতো রাধিকার। মেঘের গুরু গুরু গর্জনে যেন কৃষ্ণের বাঁশির সুর কানে বাজতো রাধিকার। ঈশ্বরগুপ্ত যখন বলছেন , সর্বদাই হুহু কওে মন/ বিশ্ব যেন মরুর মতন’ তখন ই আরেক কবি লিখছেন , বর্ষার বিল কবিতায় লিখছেন’ ‘এমনই পবিত্র স্থান/ বাতাসে জুড়াই প্রাণ/ অজানা আবেশে করে / হৃদয় শিথিল/ পানাজল ঘাস গাছে / কত কি মাধুরী আছে / ভুলাইয়েছে একবারে ভূবন নিখিল ’। তবে বর্ষাকে বাংলা সাহিত্যে বিচিত্র রূপে, বিচিত্র মাধুরীতে শুধু অসাধারণ নয়, একবারে অনন্য সাধারণ করে তুলেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকর্মে বর্ষা এসেছে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায়। কবিতা ,গান, ছোট গল্প আর উপন্যাসে বর্ষাঋতু নানা বর্ণে নানা সুষমায় পেয়েছে অপূর্ব সাহিত্যমর্যাদা। শান্তিনিকেতনে কবি বর্ষা উৎসব পালন করতেন বর্ষা বন্দনার মধ্য দিয়ে। বর্ষার গান , বর্ষার কবিতায় ছাতিমতলা মুখর হয়ে উঠতো। জমিদারীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি বজরায় চড়ে কবি যখন উত্তাল পদ্মায় ভাসতেন, তখন তিনি পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনকে অত্যন্ত কাছে থেকে নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাঁর এই চিন্তা চেতনার প্রতিফলন পাই তাঁর কবিতা ও ছোট গল্পগুলোতে। বর্ষায় উন্মত্ত পদ্মার খলখল ছলছল তরঙ্গ, গ্রামের মানুষগুলোর জীবনযাত্রা, নৌকা করে নদী পারাপার, অঝোর বর্ষণে কিশোরী বধূটিকে বিদায় দেয়ার দৃশ্য কিংবা শ্মশানঘাটে শবদেহ নিয়ে কারো অন্তিম যাত্রা কবিকে মর্মাহত করেছেন। এই মর্মবেদনা তাঁর কবিতা আর ছোটগল্পগুলোর পরতে পরতে বিধৃত। জীবিত ও মৃত , খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, পোস্ট মাস্টারসহ বহু গল্পে আমরা বর্ষা ঋতুর চমৎকার বর্ণনা দেখতে পাই। গান আর কবিতার ছত্রে ছত্রে বর্ষা সুরে আর বাণীতে ছুঁয়ে যায় আমাদের হৃদয়। আষঢ়ে বাদল নামে নদী ভরভর , মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর, দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া, বর্ষার উৎসবে জেগে উঠে পাড়া’
আর কবি নজরুল বিদ্রোহী কবি হলে ও তাঁর মনোজগতে অসাধারণ প্রভাব ফেলেছে আষাঢ় আর শ্রাবণ মাস। তাঁর বিরহ আর বেদনার ক্ষণগুলো সব সময় বর্ষাঋতুতেই এসেছিল । তাই আষাঢ় আর শ্রাবণ কবির কাছে বিরহের মাস হিসেবেই চিহ্নিত। শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে কিংবা শাওন আসিল ফিরে সে কেন এলোনা, মেঘের ডমরু ঘনঘোর বাজে , বিজরী চমকায় আমারো মন ছায়, মনের ময়ূর যেন সাজে ’ এরকম অসংখ্য গান আর কবিতায় বর্ষার বিরহী রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি।
নিয়ম অনুযায়ী কিছুদিন আগে হাল্কা বৃষ্টি শুরু হলে ও গ্রীষ্মের ধুলোমলিন জীর্ণতা ধুয়ে ফেলে গাঢ় সবুজের সমারোহে প্রকৃতি সেজেছে পূর্ণতায়। নদীতে উপচে পড়া জল, আকাশেও ঘন মেঘের ঘনঘটা। কেউ কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই। গ্রীষ্মের দাবদাহে মানুষ যখন পুড়ছে তখন ব্যাপক আয়োজনে বর্ষার এই ঝুম ঝুম বৃষ্টির বরণডালা অনেক আগেই মনে করিয়ে দিয়েছে বর্ষাতো এসেই গেছে।বর্ষার সতেজ বাতাসে জুঁই, কামিনি, বেলি, রজনীগন্ধা, দোলনচাঁপা আরো কত ফুলের সুবাস। লেবু পাতার বনেও যেন অন্য আয়োজন। উপচে পড়া পদ্মপুকুর রঙিন হয়ে ফোঁটে বর্ষাকে পাওয়ার জন্য। কেয়ার বনেও কেতকীর মাতামাতি।আষাঢ় বাংলা সনের তৃতীয় মাস। এটি বর্ষা মৌসুমে অন্তর্ভুক্ত দুই মাসের প্রথম মাস। আর নামটি এসেছে পূর্বাষাঢ়া নক্ষত্রে সূর্যের অবস্থান থেকে।অেেনকেই মনে করেন , বর্ষা যেমন আনন্দের, তেমনি হঠাৎ বিষাদে ভরিয়ে তোলে জনপদ। তবুও বর্ষা বাঙালি জীবনে নতুনের আবাহন।
আদিকাল থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় বর্ষাঋতু নিয়ে রয়েছে উচ্ছ¡সিত বন্দনা, অনুরাগ ও স্তুতি। রহস্যময়ী এ বর্ষার রূপ, বৈচিত্র্য, চমক, বর্ণচ্ছটা এবং আকাশ- প্রকৃতির গভীর মিতালী শিল্প-সাহিত্যের সরস উপকরণ হিসেবে আবহমানকাল থেকেই অনুপ্রাণিত ও স্পন্দিত করছে শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকদের। কবির কবিতায়, শিল্পীর সুরে-গানে, চারুশিল্পীর তুলির আঁচড়ে, চলচ্চিত্রের সেলুলয়েডে, নকশীকাঁথার ফোঁড়ে ফোঁড়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ভাÐারে বর্ষার অপরূপ রূপ বর্ণনা, স্থিতি ও ব্যপ্তি মূর্ত ও চিরকালীন হয়ে আছে।বর্ষা ফুল ফোটায়। বর্ষার এই শীতল আবহাওয়ায় গাছে গাছে কদম ফুলের সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।বর্ষার প্রথম মাস আষাঢ়ের অগ্রদূত কদম ফুল। যেন কদম ফুল আষাঢ়কে স্বাগত জানায়।বর্ষার আগেই গাছে গাছে কদম ফুল ফুটেছে।
বর্ষা কবিদের ঋতু। বর্ষা নিয়ে কবিরা লিখেছেন অসংখ্য কবিতা-গল্প-গান। বর্ষা মানেই সময়-অসময়ে ঝমাঝম বৃষ্টি, কর্দমাক্ত পথঘাট, খাল-বিলে থৈ থৈ পানি, নদীতে বয়ে চলা ছবির মতো পাল তোলা নৌকার সারি।বর্ষার নতুন জলে স্নান সেরে প্রকৃতির মনও যেন নেচে ওঠে। ফুলে ফুলে শোভিত হয় প্রকৃতি।তাল তমাল শাল পিয়াল আর মরাল কপোতের বন বীথিকায় চোখে পড়ে বকুল, কদম, জারুল, পারুল, কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়াসহ অসংখ্য ফুল। তবে আগাম ও অতি বর্ষণ যতই দুর্ভোগের কারণ হউক না কেন, বর্ষায় আমাদের প্রাণের ঋতু, প্রিয় ঋতু। বর্ষার জল আমাদের ধরণীকে সিক্ত করে, প্রকৃতিকে সজীব করে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক