আমার অপরাধ আমি শিক্ষক!

7

বাবুল কান্তি দাশ

সময়ের ঘূর্ণাবর্তে মানবসভ্যতা এগুচ্ছে যতটুকু পিছিয়ে যাচ্ছে মনে হয় তার বহুগুণ। পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা কোথাও কোথাও ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে। মূল্যবোধের অবক্ষয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে শিক্ষা মানুষকে মান-হুঁেেশ রূপান্তর করার কথা সেখানে আজ নিকষ কালো অন্ধকারের ছায়া।শিক্ষার্থী,অভিভাবক, সমাজ যেখানে শিক্ষকদের মান মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সদা তৎপর ছিলেন, আজ দেখা যায় তার বিপরীত চিত্র। শিক্ষকদের লাঞ্ছনা অবমাননা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষক সমাজ।সুধীমহল,সারস্বত সমাজ, রাষ্ট্র নির্বিকার নির্ল্লিপ্ত।শিক্ষক সমাজের অপমান,
অশ্রদ্ধা,অসম্মানের প্রতিবাদ প্রতিরোধে মেরুদÐহীন!
ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক হত্যা ও সমাজ কর্তৃক নিরাপরাধ শিক্ষককে জুতার মালা পরানো সমাজের অবক্ষয়ের চরম উদাহরণ। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের শিক্ষকের উদ্দেশ্যে লেখা সেই ঐতিহাসিক চিঠির কথা আমরা জানি।আব্রাহাম লিংকন অনেক জ্ঞানী ছিলেন বলে শিক্ষককে কত সম্মান দেয়া যায় ও কত ক্ষমতা দেয়া যায় তা তাঁর মুল্যবান চিঠিতে তিনি সেদিন তা উল্লেখ করেছিলেন! দিল্লির বাদশাহ আলমগীর এর কথা আমাদের স্মরণে আছে।
বাদশাহ আলমগীর নিজ সন্তানকে সুশিক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষককে কি বলেছেন আমরা জানি।ভাষা পÐিত ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সেই বহুল শ্রæত এবং উদ্ধৃত – গুণির কদর না করলে গুণি জন্মায় না।এ রকম অনেক উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় জ্বল জ্বল করছে,গেঁথে আছে আমাদের স্মৃতিতে। দুর্ভাগ্য এই,ইতিহাস পড়ি কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করি না! বর্তমান সময়ে তার বিপরীত ভয়াবহতা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে আমরা কোথায় প্রবিষ্ট হচ্ছি!বর্তমানে যার ভয়াবহতা তুলনামূলক ভাবে বাড়ছে।পÐিত চাণক্যের একটি শ্লোক এরকম –
‘লালনে বহুবো দোষাস্তাড়নে বহুবো গুণাঃ
তস্মাঃ পুত্রঞ্চ শিষ্যঞ্চ তাড়ায়েন্নতু লালয়েৎ’।
অর্থাৎ পুত্রকে আদর দিলে বহু দোষ জন্মে, কিন্তু তাহাকে শাসনে রাখিলে অনেক গুণ দেখা যায়। সেহেতু পুত্রকে ও শিষ্যকে শাসন করা উচিত, আদর দেওয়া উচিত নহে।আমরা মানি আর না মানি এ উপমহাদেশে পÐিত চাণক্যের অনেক বিশ্লেষক ও গবেষক সমর্থক আছেন।যাঁরা চাণক্যের উপদেশগুলোকে যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত মনে করেন। পৃথিবীতে একমাত্র শিক্ষকরাই পরের সফলতায় আনন্দ উপভোগ করেন।কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের এভাবে স্ট্যাম্প দিয়ে কোনোকালে পেটায়নি এবং পেটাবেও না। যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের শাসনে রাখার ব্যবস্থা ছিল এবং অভিভাবক ও সমাজ জোড়ালো সমর্থন যুগিয়েছিল আমাদের সন্তানরা অনেক বেশী সুশৃঙ্খল এবং বিনয়ী ছিল।ছিল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। আর সেসকল শিক্ষার্থীরাই বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে এনেছিল ভাষার অধিকার ফিরিয়ে, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দেশের স্বাধীনতা।অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পরেছে অগ্রভাগে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পরছে সামাজিক বিশৃঙ্খলায়। নেতৃত্বের ইশারা ও আশকারায় নিপতিত হচ্ছে অন্ধকার জগতে। বিবেকহীন এ শিশু কিশোররা যে ধ্বংসাত্মক মনোভাবে নিয়ে বেড়ে উঠছে সার্টিফিকেট শিক্ষা তাদের কোন কাজে আসবে? আমার দৃষ্টিতে – শিক্ষিত কিন্তু বিবেকহীন জাতির চেয়ে অশিক্ষিত কিন্ত মানবিক জাতিই উত্তম। শিক্ষক সমাজ কোথাও আক্রান্ত হলে অভিভাবকরা এগিয়ে আসত, এগিয়ে আসত সমাজ।কিন্তু বর্তমানে পরিদৃষ্ট হয় বিপরীত চিত্র। বরঞ্চ এনারা উপভোগ করেন শিক্ষকদের অপমান লাঞ্চনা। প্রতিকার ও প্রতিরোধে থাকেন নির্বিকার। শিক্ষকতা কি তাহলে অপরাধ!
এ কোন্ চিত্র ? এ কোন সমাজ? শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পড়ায় আর প্রশাসন নীরব?এলাকার বিদগ্ধজনরা নীরব দর্শক!কেউ কেউ শিস দেয়,কেউ কেউ দেয় হাততালি। আর যাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, গড়িয়ে পড়ছে চোখের জল তারা কোনঠাসা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিগুলোও যথেষ্ট অরাজনৈতিক, আঞ্চলিক প্রভাবমুক্ত, সা¤প্রদায়িকতামুক্ত ও মানসম্মত সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের দ্বারা গঠনে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া উচিত এবং তদনুগ নির্দ্দেশনা ও তদারকি থাকা জরুরী। প্রীতি মোহ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ যেন না থাকে। কমিটির নির্বাচিত সদস্যগণ ঐ স্তরের শিক্ষাগ্রহণ কালে কেমন ছিলো? তিনি শিক্ষা ক্ষেত্রে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, ক্রীড়া ক্ষেত্রে কোনো দক্ষ ছিলো কি না?না কি আসতো আর যেতো,আর কোনো রকম পাস! এ রকম সদস্য কি মান উন্নয়ন করবে?আর শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান প্রদানে উৎসাহিত করবে? ক্ষেত্র বিশেষ শিক্ষকদেরও ভুল সংশোধন,পরিমার্জন পূর্বক পরিশীলিত পরিশুদ্ধ হয়ে আদর্শানুগ চলনে প্রবৃত্ত হতে হবে। ব্রিটিশ সময়ে বাঙালীর সচেতনতা দেখে,মন-মানসিকতা বিবেচনা করে কবি গুরু দুঃখ করে লিখেছিলেন-
‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী
রেখেছো বাঙালী করে মানুষ করনি’!
যে জাতিকে এত কিছু দিয়ে গেলেন সে জাতির প্রতি কবির এত আক্ষেপের কারণ কি?
শিক্ষকরা আজ খুব অসহায়। শিক্ষকদের সকল বিষয় আমলে নিয়ে যথাযথ মুল্যায়নের সময় এখন। শিক্ষকই সমাজের মডেল, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন দ্রষ্টা। দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি,ঐতিহ্য রক্ষার প্রতিনিধিত্বকারীর রূপকার। তাই সর্বজনীন বাংলাদেশীর সংস্কৃতির লালন পালন কারীর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়নে ভেদাভেদ ভুলে দ্রæত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। পাশাপাশি অন্যায়ের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক।এ জাতির মানবিক মুল্যবোধ আশানুরূপ না বাড়লে এর পরিণতি চরমহারে সবাইকে দিতে হবে। জাতির কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্য রক্ষা,অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সর্বোপরি উন্নয়ন সমৃদ্ধ স্থিতিশীল রাষ্ট্র বিনির্মানে শিক্ষক, শিক্ষা, প্রতিষ্ঠানকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে প্রয়াসী হতে হবে। অর্জন স্থায়ীত্ব লাভ করবে।পরিশেষে এটাই স্মরণে রাখি – নিজত্ব হারিয়ে কাউকে খুশি করতে গেলে দুর্গতির সীমা থাকবে না এবং যা ইচ্ছে তা করবে,তা কিন্তুরে চলবে না, ভালো ছাড়া মন্দ করলে পরিস্থিতি ছাড়বে না।