আমাদের ছড়া কবিতায় একুশ

39

একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ আমাদের অহংকার। বাঙালি জাতি হিসেবে গর্ব করার মত অনেক অর্জন আমাদের রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম অর্জন হল ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারি বাংলার দামাল ছেলেরা ঢাকার রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে বাংলাভাষাকে প্রতিষ্ঠা করে গেছে। সেই আত্মত্যাগ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জানতো যে, বাঙালির কন্ঠ রোধ করা গেলে তাদের শাসন শোষনের পথ আরো প্রশস্ত হবে। কিন্তু বীর বাঙালি তা আঁচ করতে পেরে তাদের রুখে দিয়েছির। রাদজপথ উত্তপ্ত করে কন্ঠে কন্ঠে স্লোগান উঠেছিল “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই”। এ আমাদের প্রাণের দাবী। এ লড়াই মাযের ভাষায় কথা বলার লড়াই।
ভাষার মাস এলে আমরা স্মরণ করি সেই বীরদের যারা মায়ের ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিল। আর ঘৃণা করি তাদের যারা মায়ের ভাষার শত্রূ হিসেবে চিহিৃত। এই শত্রূরাই আবার ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের স্বাধনতা আন্দেলনের বিরোধিতা করেছিল। যে ভাষা আন্দোলনের পথ বীর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, সেই আন্দোলনেও তারা আমাদের দমাতে পারেনি। কী করে পারবে ? বাঙালি যে একতাবদ্ধ। একতাবদ্ধ জাতিকে কে রুখবে? কার এত বুকের পাটা? মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যারা জীবন দিয়েছে তাদের সম্মান জানাতে আমরা আমাদের সর্বত্র বাংলাভাষা চালু করার আন্দোলন আজও চালিয়ে যাচ্ছি। এখনো ইংরেজির দাপট যত্রতত্র প্রত্যক্ষ করি এক শ্রেণির তথাকথিত এলিট গোষ্ঠী বাংলার সাথে ইংরেজি মিশিয়ে এ জগাখিচুরি ভাষা ব্যবহার করছে। এসব শুনলে গায়ে জ্বালা ধরে যায়।
আমাদের ভাষা আন্দোলন মহান একুশকে কেন্দ্র করে অনেক ঋদ্ধ সাহিত্য রচিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ছড়া-কবিতা। এসব ছড়া-কবিতা দীর্ঘ ৬৯ বছর ধরে আমাদেও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। করেছে ফুলে ফলে সুশোভিত। বাংলা ভাষার মহান কবিরা এইসব ছড়া-কবিতা লিখে বাংলাভাষাকে পৃথিবীর দরবাওে পৌঁছে দিয়েছে। সেই সব ছড়া-কবিতার কিছু কিছু অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরলাম-
“আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত
যে ভাষায় আমি মা’কে সম্বোধনে অভ্যস্ত
সেই ভাষাও স্বদেশের নামে।
এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে
আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।”
-মাহবুবউল আলম চৌধুরী
ঢাকার রাজপথে মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে কয়েকজন ছাত্র শহিদ হন। এ সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিক লেখা এ কবিতা। সেদিন বুলেটের মত বিধে যায় শাসক শ্রেণির মর্মমূলে। কবিতাটি নিষিদ্ধ করা হয়। কবির বিরুদ্ধে জারী করা হয় হুলিয়া। একটি কবিতার শক্তি কতখানি সেদিন সেটা প্রমাণ হয়ে যায়।
“মাগো ওরা বলে
সবার কথা কেড়ে নেবে
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না
বলে মা তাই কি হয়?
তাইতো তো আমার দেরি হচ্ছে।
তোমার জন্য কথার ঝুড়ি নিয়ে
তবেই না বাড়ি ফিরবো।
লক্ষী মা রাগ করো না
মাত্র তো আর ক’টা দিন।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এ কবিতা পাঠ করলে দুখিনী মায়ের জন্য বুকটা হু হু করের ওঠে। মায়ের এ অপেক্ষা যেন শেষ হতে চায় না। সন্তান হারা মায়ের এ আকুতিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যায়। এ হচ্ছে একুশের কবিতা।
কবি আল মাহমুদ যখন লেখেন-
“পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিলো যে অগ্নি
ফেব্রূয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।
প্রভাতফেরি প্রভাতফেরি
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।”
এ কবিতায় উঠে এসেছে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিকন্যা প্রীতিলতার কথা। যে আন্দোলনে প্রেরণা যুগিয়েছে আমাদের স্বাধীকার আন্দোলনের। শক্তিমান কবির এ কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে বাংলা ভাষার প্রতি গভীর মমতা। যে মমতা থাকে মায়ের প্রতি সন্তানের।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এক কবিতা তো ইতিহাস হয়ে টিকে আছে যা যুগ যুগ ধরে মানুষের কন্ঠে গীত হয়ে আকাশ বাতাস মুখরিত করে রাখছে। যে গান ছাড়া আমাদের একুশ, আমাদের প্রভাতফেরি চিন্তাই করা যায় না। গাছে গাছে ফুটে থাকা পলাশ শিমুলের অপরূপ বর্ণনায় এ কবিতা আমাদের মননে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে। যেমন-
“ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রূয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?
আমার সোনার দেশের রক্তে বাঙানো ফেব্রূয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?”
এ গান, এ কবিতা কখনো মুছে যাবার নয়।
কবি কে জি মোস্তফা লেখেন-
একুশের গানে দৃঢ় শপথের বাক্য
কথা আর কাজে এক সে কথার সাক্ষ্য
মিছিলে মিছিলে আজ একটিই লক্ষ্য
ফুলে ফুলে গাথা হোক মানুষের সখ্য।”
একুশ আমাদের শপথের বাক্য, মিছিলে মিছিলে ফুলে ফুলে গাথা মানুষের সখ্যের কথা বলেছেন কবি। কেননা এই ঐক্য আর সখ্যই আমাদেও মুক্তিযুদ্ধ অবধি নিয়ে গেছে। যা আমাদের দৃঢ় মনোবল আর একতাবদ্ধ হতে প্রেরণা যুগিয়েছে।
কবি নির্মলেন্দু গুণ তার কবিতায় বলেছেন এভাবে-
“শহিদের পাশে থেকে হয়ে গেছি নিজেই শহিদ
আমার আঙুল যেন শহিদের অজস্র মিনার হয়ে
জনতার হাতে হাতে গিয়েছি ছড়িয়ে।
আমার কিসের ভয়?
আমিও অমর হবো, আমাকে কী মাল্য দেবে দাও।”
একুশের শহিদেও কথা ভেবে নিজেকেই শহিদ ভাবছেন কবি। কেননা ভাষার জন্য যারা শহিদ হয়েছেন তাদের বীরের মর্যাদা কবির কাম্য। তাই তিনি বলছেন, আমাকে কী মাল্য দেবে দাও।
একুশ নিয়ে কবি ফারুক নওয়াজের অসাধারণ কবিতাটি এরকম-
“ভাটিয়ালি সারি জারি কবিগানে
একুশ আমাকে বার বার টানে
শেকড়ের কাছে যেতে সে আমার
পথ করে দিল নামার
একুশ আমার, চিরকাল ধরে আমার।”
হ্যাঁ কবির কথার সাথে তাল মিলিয়ে বলতে হয়; একুশ আমার আমাদের একুশ গোটা বাঙালির। বাঙালির প্রতিনিধি হয়ে তিনি একুশকে মূল্যায়ন করেছেন। কেননা এমন আন্দোলন গোটা দুনিয়ায় বিরল। এই বিরল গৌরবের অংশিদার আমরা বাঙালিরা। এ আমাদের অহংকার। একুশ নিয়ে কবি ফারুক নওয়াজের আরো অনেক কবিতা রয়েছে যা আমাদের মূল্যবান সম্পদ।
“কৃষ্ণচূড়া তোমার এ নাম কে দিয়েছে কে?
মিশকালো না হয়ে যদি লাল হয়ে ফুটবে,
আলতা রঙে এমন যদি সাজবেই বার বার
তোমার কেন কৃষ্ণচূড়া নাম হয়েছে আর?
………………………
আমার আরো দুই সোনাভাই আসাদ মতিউর
মিছিল নিয়ে পেরিয়ে চলি রক্ত সমুদ্দুর।
বর্ণমালার স্বর্ণমালা গাথতে গেল যেই
রফিক, সালাম কেউ আসেনি বাড়িতে কেউ নেই।”
কিশোর কবিতার স্বাপ্নিক কবি সুজন বড়–য়ার কবিতায় ফুটে উঠেছে একুশ নিয়ে কাব্যিক বর্ণনা। তার কবিতার উপমা, চিত্রকল্প, অনুপ্রাস আর ছান্দিক উপস্থাপনা পাঠককে এক অনিন্দসুন্দর ভূবনে পৌঁছে দেয়। একুশ নিয়ে সুজন বড়–য়ার অন্য সব কবিতার বেলায়ও এ কথা খাটে। তাঁর কবিতায় পাঠক তন্ময় না হয়ে পারে না।
আমাদের ছড়ার ভূবনের আর এক উজ্জ্বল নাম লুৎফর রহমান রিটন। রিটন আামদের শিশুসাহিত্য। আমাদের অহংকার। একুশ নিয়ে তাঁর একটি ছড়া-
“মিছিলের পথ ধরে চলতে গিয়ে
মাতৃভাষার কথা বলতে গিয়ে
হাসিমুখে বুকে গুলি নিয়েছিল ওরা
ওদের জন্য এই ফুলের তোড়া।”
মাতৃভাষার কথা বলতে গিয়ে আমাদের বীর তরুণরা বুকে গুলি নিয়েছিল। হাসিমুখে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ওরা মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করে গেছে। ওদের জীবনের বিনিময়ে আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারছি। তাদের জন্য কবির সাজানো ফুলের তোড়া, সেই বীর তরুনদের প্রতি আপরিসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে এ ছড়ায়।
ছড়াকার জাহাঙ্গীর আলম জাহান লিখেছেন-
“রেল গাড়িতে খোকন তো নয় আসলো খোকার লাশ
কে করেছে ল²ীমায়ের এমন সর্বনাশ।
রাখতে গিয়ে মায়ের ভাষা বাংলা ভাষার মান
সোনার খোকন বুক ফুলিয়ে ঝরিয়ে দিল প্রাণ।”
মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে গিয়ে খোকন ফিরে এল লাশ হয়ে।
মায়ের বুক খালি করে হায়েনার উল্লাস আমাদের মন দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়।
এমন ত্যাগ আর কোন জাতির বেলায় ঘটেনি, যা আমাদের বেলায় ঘটেছে। ত্যাগের মহান আদর্শে বলিয়ান বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের গর্ব।
ছড়াকার উৎপলকান্তি বড়ুয়া লিখেছেন-
“কৃষ্ণচচূড়ার লালে আগুন হাসে সবুজ পাতা
ফাগুলে হয় বর্ণমালার সকল গল্পগাথা।
বায়ান্নতে বীজ লাগালাম গর্বভরে বলি
বিশ্ব বাগান জুড়ে এখন ফুটলো ভাষার কলি।”
হ্যাঁ, বিশ্ববাগান জুড়ে আমাদেও লাগানো বায়ান্নের বীজ আজ ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়ে আলো ছড়াচ্ছে। এ আলোয় আজ বাঙালি জাতি আলোকিত। সেই আলোকজ্জ্বল দিনের কথাই উৎপলকান্তি বড়ুয়া তাঁর ছড়ায় বলতে চেয়েছেন। ভাষা হচ্ছে মায়ের মত। সেই মা আমাদের চেতনা জুড়ে বহমান। সেই ভাষায় নিজের মত্ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পেরে আজ আমরা ধন্য। এই ভাষার আলপথ ধরে আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা। ভাষার সাথে স্বাধীনতা এই বন্ধন চিরকালীন। তাই ভাষার জন্য জীবন দেয়া সব শহিদের প্রতি রইল আমাদের অপরিসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। এসো সেই ভাষাকে আমরা রক্ষা করি। বুকে টেনে নেই।