আবারো বন্যার কবলে সিলেট দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান

2

 

বাংলার অপর নাম ভাটির দেশ। এ ভাটি অঞ্চল নিয়ে নানা উপখ্যানও আছে আমাদের বাংলা সাহিত্যে। বৃহত্তর সিলেটের হাওড় এবং চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশ একেবারেই নি¤œভুমি। এছাড়া দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল জুড়ে বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগর। আর এ সাগরের ¯্রােতে মিশেছে শত শত নদী। হিমালয় হয়ে ভারত ও বাংলাদেশের বুক ছিড়ে এসব নদী এসে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে। সাগর-নদীর উপকূলীয় এলাকা স্বাভাবিক নিম্নাঞ্চল হওয়ার কারণে বর্ষার অতি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে বন্যা হয়ে থাকে। একারণে বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই উপর্যুক্ত এলাকায় বন্যা হয়। এবারো বন্যার আশঙ্কা করছেন পানি, নদী ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে এবার বড় আকারের বন্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে। এর মধ্যে সিলেটে এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিয়েছে। খবরে প্রকাশ, গত কয়েক দিনের টানা ভারিবর্ষণ, উজানের পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হচ্ছে সিলেটের নিম্নাঞ্চল। সুরমার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নগরের নিম্নাঞ্চলগুলো আবারো বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। জেলার ৭টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বাড়িঘর, মসজিদ, মন্দির, রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে পড়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এমনকি সিলেট বিমানবন্দরের রানওয়ে পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিমান উঠানামাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বৃহত্তর সিলেটে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা থেকে সরকার আগামী ১৯ জুন থেকে আয়োজিত এসএসসি পরীক্ষা ২০২২ স্থগিত করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, এরই মধ্যে সুরমা-কুশিয়ারা, সারি, লোভাছড়া ও ধলাই নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সুরমা কুশিয়ারার ৪টি পয়েন্টে পানি প্রবাহ বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এর আগে সিলেটজুড়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন জেলার প্রায় ৪ লাখ মানুষ। এতে ফসলি জমির পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থারও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্ধ হয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকার গ্রামীণ সড়ক। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে শতাধিক মাছের খামার। দেশের সর্বত্র প্রতিদিন কম-বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এদিকে পানি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শুরু হয়েছে নদীভাঙন। হঠাৎ নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তা নদীর কূল উপচে চরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করছে। এতে ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদী পাড়ের মানুষের মধ্যে শঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। চরাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। সেখানকার ঘরবাড়ি পানির নিচে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট। ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের লক্ষণ এখনো দেখা না গেলেও অচিরেই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নদী খনন ও শুষ্ক মৌসুমে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার কাজ না করাসহ ওয়াপদা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির জন্য তাদের এমন অনাকাক্সিক্ষত দুর্ভোগ বলে মনে করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। বছর বছর ভেঙে যাওয়া নদী-তীর রক্ষা বাঁধগুলোর সংস্কার করা কিংবা স্থায়ীভাবে বাঁধের কাজ না করায় তাদের এই চরম খেসারত দিতে হচ্ছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নদ-নদীর পানি উপচে বন্যার পদধ্বনি কেবল নয়, এমন পরিস্থিতি আমাদের জন্য দুর্ভাবনার। সামনে ভয়াবহ বন্যার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে তা আমলে নিয়েই সরকারের এখন থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো আমাদের সাধ্যাধীন নয়। তবে যথাযথ প্রস্তুতি নিলে মানুষের দুর্ভোগ, ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নদী ভরাট হওয়ার কারণে যেমন বেড়েছে ভাঙন, তেমনি সামান্য ঢলে দুকূল উপচে আকস্মিক বন্যা ঘটায়। নদ-নদীর নাব্য রক্ষা করে একদিকে যেমন বন্যার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তেমনি সম্ভব ভাঙন ঠেকানো। আশা করছি, বন্যার্তদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা দেয়ার সংস্থান করবে সরকার। বিশুদ্ধ পানি, ওষুধপত্র এবং চিকিৎসাসেবাও প্রস্তুত রাখা দরকার। সরকার ও প্রশাসন এ বিষয়ে সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে- এটাই আমরা প্রত্যাশা করি।