আবারও পাহাড় ধস মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে ?

3

আবারো পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে। বর্ষার শুরুতে বিরামহীন বৃষ্টিতে এ নগরীতে পাহাড় ধসে আবারো মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো। গত শুক্রবার রাতে নগরীর আকবর শাহ ১নং ঝিলে বরিশালঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে দুই সহোদরাসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত দশজন। এ ঘটনায় নগরজুড়ে নতুনভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামে বর্ষা মানে একেকটি মরণফাঁদে পড়ে নিরীহ মানুষের মৃত্যুর সংবাদ শোনা। কয়েকদিন আগে দৈনিক পূবৃদেশের সম্পাদকীয় স্তবকে আসছে বর্ষায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা এবং প্রশাসনের নির্লিপ্ততার কথা আমরা বলেছি। আমরা সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। গরিবের কথা বাশি হলেও ফলে। আমাদের কথা কর্ণগোছর না হলেও আশঙ্কা যে শোক আর উদ্বেগে রূপ নিয়েছে-তা কে অস্বীকার করবে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হবে-এটি স্বাভাবিক হলেও পাহাড় ধসে, জলাবদ্ধতায় নালায় পড়ে অথবা বন্যার পানিতে ডুবে মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার গটনা কোনভাবেই স্বাভাবিক নয়। বৃষ্টি ¯্রষ্টা তথা প্রকৃতি প্রদত্ত কিন্তু এ পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক গতিতে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে মানুষ। সংগতকারণে বৃষ্টির ফলে পাহাড়ধসে, নালায় পড়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনার দায় মানুষকেই নিতে হবে। যেসব মানুষ বৈষায়িক লোভে অবৈধভাবে পাহাড় দখল করে পাহাড় কেটে ঘরভাড়ি তৈরি করে নি¤œ আয়ের হতদরিদ্র মানুষগুলোকে ভাড়া দিয়ে মৃত্যুর যাতাকলে নিক্ষেপ করে তাদের এ দায় নিতে হবে। দ্বিতীয়ত দায়টা অবশ্যই প্রশাসন, নগর কর্তৃপক্ষ, এসব অবৈধ কুটিরে যেসব সরকারি কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইন দিয়েছে তাদের নিতে হবে। তবে সবার আগে পরিবেশ দপ্তরকে এ দায় দিতে হয়। তাদের দায় রয়েছে পাহাড় ও প্রকৃতি সংরক্ষণ। পরিবেশ কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও নগর কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে দৃশ্যমান ইমারত তেরি করা হয়েছে বরিশালঘোনা, মতিঝর্ণা, বাটারি হিল বা আরেফিন নগরসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায়। বর্ষা আসছে কৈ আমরা কারো তেমন তৎপরতা দেখিনাই পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকির মধ্যে বসবাসকারীদের সরানোর বিষয়ে। এখন যখন ঘটনা ঘটে গেছে, তখন সবাই নড়েচড়ে বসা শুরু করছে নিঃসন্দেহে। আমরা এধরণের লৌকিক কর্মসম্পাদন আর চাই না। অতীতে আমরা চট্টগ্রাম নগরীসহ রাঙামাটি, কক্সবাজার শহর ও রামুতে পাহাড় ধসে একই ব্যাপক হতাহতের ঘটনা লক্ষ্য করেছি। রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ভারি বর্ষণে পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে ১৩ জন নিহত হওয়ার নির্মমতা এখনও মুছে যায় নি। এরমধ্যে নগরীতে পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঘটনা দুঃখজনক বটে। প্রশ্ন হচ্ছে এই মৃত্যুমিছিল থামবে কবে ? পাহাড়ের ঢালুতে বাস করা মানুষজন চাপা পড়ে নিজের জীবন, ঘরবাড়ি, আত্মীয় স্বজন সবকিছু হারায়। এই করুণ মর্মান্তিক মৃত্যুর কোনো সান্ত¡না নেই। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে এর কোনো প্রতিকারও নেই। ফি বছর এ ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিলেও কারও কোনো হুঁশ নেই। বরং লোভ ও লালসা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। সর্বগ্রাসী মানসিকতার কাছে হার মানছে আইন, কানুন মানবিকতা- সব। ফলে প্রাণ যাচ্ছে নিরীহ মানুষের।
‘পাহাড়ের ওপর থেকে গাছ কেটে, ট্রাকে ট্রাকে মাটি কেটে পাহাড়কে ন্যাড়া করে ফেললে বৃষ্টি বাদলায় তার ধসে পড়া ছাড়া আর কী কোনো উপায় থাকে? আর পাহাড়ের ঢালুর নিচে যে সমস্ত অসহায় মানুষ বসতি স্থাপন করে তাদের মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়। অকাতরে প্রাণ যায় এসব ভাগ্যাহত মানুষের। যারা সমতলে জায়গা না পেয়ে জীবনের অমোঘ টানে এই বিপজ্জনক জায়গাকেই বাসস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিল।’
যখন একটি ঘটনা ঘটে পত্রপত্রিকা-মিডিয়া পরিবেশবিদরা সরব হয়। ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের নিয়েও অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। কার বিরুদ্ধে আগে কী কী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, কী কারণে কোন সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করা যায় নি, পাহাড় ধসের কারণই বা এসব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়। কিন্তু স্বজন হারানোদের কান্নার রোল আকাশে বাতাসে মিলিয়ে না যেতেই সবাই সব কিছু ভুলে যান। আর চলতে থাকে আরেকটি মর্মন্তুদ ঘটনার জন্য নির্দয় অপেক্ষা। এই যেন নিয়ম কিংবা নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতিপূর্বে চট্টগ্রামের ১২টি পাহাড়কে ভূমিধসের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সরকারিভাবে গঠিত তিনটি বিশেষজ্ঞ কমিটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও কক্সবাজার পৌরসভার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে বসবাসকারী প্রায় ১০ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সেই সুপারিশ কার্যকর হয়নি পাঁচ/ছয় বছরেও। লাখ লাখ বছরের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখাই শুধু নয় মানুষের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য এই পাহাড়গুলোর বেঁচে থাকটাও সমান জরুরি। কিন্তু মানুষ তার লোভ ও লাভের হিংগ্র থাবা বসিয়েছে পাহাড়ের ওপর। পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি করছে। এতে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশের ওপর অব্যাহত অত্যাচারের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের পিছু ছাড়ছে না। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাসস্থান ও জ্বালানি সংগ্রহের কারণেও পাহাড় ধ্বংস হচ্ছে। পাহাড় কাটা রোধ করতে হলে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সরিয়ে দিতে হবে। আপদকালীন অবস্থায় শুধু পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থলে সরে যাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের নির্দেশ জারি করলেই চলবে না। এ জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন ব্যবস্থা জরুরি। মনে রাখতে হবে পাহাড়কে ঘিরে যদি অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা না যায় তাহলে পাহাড় কাটা কোনো দিন বন্ধ করা যাবে না। পাহাড়ের কান্নাও থামবে না।