আবারও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি বাজার নিয়ন্ত্রণে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে

10

শীতের আমেজ এখনও কাটেনি। বাজার শাক-সবজিতে ভরপুর। চাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ভোজ্য তেল, মসল্লাসহ প্রয়োজনীয় সব নিত্যপণ্যের বাজারে কমতি নেই। এলসি খোলা হচ্ছে আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি, আমদানি চলছেই; এরপরও ক্রমান্বয়ে কাচা বাজারে শাক-সবজি,মাছ-মাংস, মুদির বাজারে চাল, তেলসহ সব নিত্যপণ্যের দাম ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ মূল্য বৃদ্ধিকে অভিজ্ঞমহল আসন্ন রমজানের বাজারের পূর্বাবাশ বলে মনে করেন। সূত্র জানায়, প্রতিবছরের মতো এবারও রমজান সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের তৎপরতা শুরু হয়েছে। তাদের কৌশলী পদক্ষেপ, রমজানে একসাথে দাম না বাড়িয়ে এখন থেকে ক্রমান্বয়ে দাম বাড়ালে ভোক্তাসাধারণ সংক্ষুব্ধ হবে না। প্রশাসনের হয়রানির সুযোগ পাবে না, তদুপরি তাদের মুনাফাও প্রত্যাশিতভাবে ঘরে উঠবে। অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা-চট্টগ্রামের অসাধু ব্যবসায়িরা ইতোমধ্যে এ জাতীয় পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। পরিকল্পনার অংশ হিসাবে ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের খুচরা বাজারগুলোয় সব ধরনের ডাল, ভোজ্যতেল, আদা-রসুন-পেঁয়াজ, হলুদ-মরিচ, চিনি-লবণ এমনকি খেজুরের দামও বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে মাছ, গরুর মাংস, হাঁসির মাংস ও মুরগির দামও বেড়েছে। সরকারি বাজার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি সংস্থা টিসিবির তথ্যমতে, এক মাসের ব্যবধানে খুচরা বাজারে অন্তত ১৬ ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, রমজানের আগে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর মূল্য যে পরিমাণ বাড়ানো হয়, পরে তা আর কমানো হয় না। কাজেই বাজারের নিয়ন্ত্রণ যাতে দুষ্টচক্রের হাতে চলে না যায়, সে জন্য এখনই সরকারি পদক্ষেপ জরুরি। কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
রমজানকে বলা হয় সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। পবিত্র এ মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করেন। অথচ এ রমজানেই বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফা লাভের আশায় নিত্যপণ্যের দাম অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, যা মেনে নেয়া যায় না। আমরা দেখেছি, সময় ও সুযোগ বুঝে অতি মুনাফালোভী অসাধু একটি চক্র প্রায়ই বাজারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে থাকে, এবারও যার ব্যতিক্রম ঘটবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যোগসাজশের মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থার স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করা হলে একদিকে ভোক্তাস্বার্থের হানি ঘটে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর পড়ে এর বিরূপ প্রভাব। বিগত কয়েক বছরে সরকারের আন্তরিকতা ও নানামুখী পদক্ষেপ সত্তে¡ও পণ্যের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি কেন রোধ করা যায়নি, তা খতিয়ে দেখা উচিত। উদার বাণিজ্য ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী গুটিকয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকলেও এ ক্ষেত্রে সরকারের শক্ত কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় টিসিবিকে কার্যকর করাসহ সরকারের উচিত নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। দেখা গেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে কথাবার্তা উঠলে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা পরস্পরকে দোষারোপ করে থাকেন। এভাবে একপক্ষ অপর পক্ষকে দোষারোপ করলেও মূলত এটি যে অসাধু ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এছাড়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসাবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অনেক সময় বিশ্ব বাজারে মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দেওয়া হয়। তবে বাস্তবতা হলো, দেশে বছরজুড়ে পণ্যমূল্যে আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের বিপরীত চিত্রই পরিলক্ষিত হয়। ব্যবসায় মুনাফা অর্জন স্বতঃসিদ্ধ ও স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু মুনাফা অর্জনের নামে নীতিজ্ঞানহীন অনৈতিক কর্মকাÐ সমর্থনযোগ্য নয়। ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘবে আন্তরিক হলে সারা বছর তো বটেই, রোজা-ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবেও বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে আমাদের বিশ্বাস। মনে রাখা চাই, এবারের রমজানও কোভিডকালীন সময় বিরাজ থাকবে। এ সংক্রমণ এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও স্থিতিশীল নয়। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের উচিৎ মানবিক চেতনায় সিয়াম-সাধনার মাসকে সম্মান করা। মানুষের কষ্ট হয়, এমন ব্যবসা থেকে মুক্ত থাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ সব ধরনের পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারের পাশাপাশি দেশের ব্যবসায়ীরাও আন্তরিক হবেন, এটাই প্রত্যাশা।