আবহাওয়ার সুখবর নেই

54

বৈশাখের শুরু থেকেই প্রকৃতিতে এবার তাপপ্রবাহ যেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের মেজাজেই একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকিয়েই যাচ্ছিল। নতুন বছরের হাত ধরেই প্রতিদিনই চড়তে শুরু করে তাপমাত্রার পারদ। পক্ষকাল পার হতে না হতেই তা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর ছুঁয়ে ফেলে। মধ্যিখানে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে ফণা তোলার পর ভারতের উড়িষ্যা হয়ে স্থলভাগে দীর্ঘপথ পাড়ি দেয়ার ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড গড়া মৌসুমের প্রথম শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র আবির্ভাব না ঘটলে হয়তো এতদিনে সব খরায় পুড়ে ছাই হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে যেত। কিন্তু ফণী শক্তি হারিয়ে লঘুচাপ আকারে সাগরেই মিলিয়ে যাওয়ার পর তাপপ্রবাহ ফের প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ নিতে একটুও দেরি করার ধার ধারে নি। ফলে, তাপমাত্রা আবারও ৪০ ছুঁইছুঁই। প্রাণীকূলের অবস্থা কাহিল।
আবহাওয়াবিদরাও বিরাজমান অবহাওয়ার হালহকিকত বিচার-বিশ্লেষণ করে সহসা কোনও ‘সুখবর’ দিতে রাজি নন। তারা বলছেন, ফণীর বিদায়ের পর থেকে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল ছাড়া বাকি সব অঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে চলা মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে চলতি সপ্তাহের প্রায় শেষঅবধি। এর মাঝে আবহাওয়া পরিস্থিতিতে চালু হওয়া বিচ্ছিন্ন বৃষ্টিপাত চক্রের বিক্ষিপ্ত প্রভাবে সিলেটসহ ও ময়মনসিংহসহ কোথাও কোথাও হাল্কা-পাতলা বৃষ্টিপাত হলেও অধিকাংশ অঞ্চলে তাপপ্রবাহের এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন সইতেই হবে। তবে, চলতি মে মাসের শেষ সপ্তাহে দেশের আকাশের একক নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ বৃষ্টিবলয়। তা দৃশ্যমান হতে শুরু করবে ২০ মে’র পর। এর প্রভাবে দেশজুড়ে কমবেশি বৃষ্টির দেখা মিলতে পারে বলেও আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ছ’টায় পরবর্তী ২৪ ঘন্টার নিয়মিত পুর্বাভাসে বলা হয়েছে, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। রংপুর, ময়মনসিংহ, ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং ঢাকা, রাজশাঞী, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসাথে দেশের কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টির আলামতও বিদ্যমান রয়েছে। টাঙ্গাইল, রাঙামাটি, নোয়াখালী, রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলসহ খুলনা বিভাগের উপর দিয়ে মৃদু ওথকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা কোনও কোনও অঞ্চল থেকে প্রশমিত হতে পারে। তবে, বর্ধিত পাঁচদিনের আবহাওয়ার অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নেই বলে জানানো হয়েছে। গতকাল রবিবার রাজশাহীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আর নেত্রকোণায় সর্বোচ্চ ২১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাঁদপুর ও স›দ্বীপে সামান্য পরিমাণে বৃষ্টি হলেও তা তাপপ্রবাহে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। এ অঞ্চলের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৬ দশমিক আট ডিগ্রি সেলিসিয়াসে উঠানামা করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের উষ্ণতম মাস হল এপ্রিল-মে। বাংলা বর্ষপঞ্জির ঋতু পরিক্রমায় গ্রীষ্মের হামাগুড়ির সময়। বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখের প্রথম পক্ষের বিদায়ে যাত্রা শুরু হয় মে মাসের। ২০১৭ সালের মে মাসে টানা ১৯ দিনের তাপদাহে বিপর্যস্ত হয়েছিল সারাদেশ। ওইবছর ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব জেলায় দিনের তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই। রাজশাহীতে তাপমাত্রার পারদ মৌসুমের সর্বোচ্চ ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে ছিল। কিন্তু, গত বছর মানে ২০১৮ সালের মে মাস ছিল উল্টো বৃষ্টিমুখর। ওই বছর মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে দেশে গড় বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। অধিদপ্তরের গবেষণার তথ্য বলছে, ১৯৮১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা ৩০ বছর গ্রীষ্ম ঋতুতে গড় বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু কম। কিন্তু জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির খেয়ালী আচরণের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সাল থেকে গ্রীষ্ম ঋতুতে আবহাওয়া পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ওই বছর থেকে গ্রীষ্ম ঋতুতে অতিবৃষ্টি, দীর্ঘ সময় ধরে কালবৈশাখী, অত্যধিক বজ্রপাতের প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মে মাসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, পুরো মে মাসজুড়েই দেশের অধিকাংশ এলাকায় কমবেশি দাপট থাকবে তাপদাহের। আবার সাগরও কমবেশি উত্তাল থাকতে পারে। মাসের শেষের দিকে দেশের উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি তীব্র তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য স্থানে এক থেকে দুটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি নিম্নচাপ সৃষ্টির আলামত রয়েছে, যার একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। উল্লেখ্য, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আবহাওয়াবিদরা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাকে তীব্র তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মাঝারি এবং ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু তাপপ্রবাহ হিসেবে গণনা করেন।