আবদুর রশিদ সিদ্দিকী ও চাটগাঁইয়া ভাষাতত্ত্ব

74

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

[সারসংক্ষেপ: বিশ শতকের প্রথমার্ধ্বে চট্টগ্রামে লোকমুখে প্রচলিত বুলি বা মুখের ভাষা নিয়ে গ্রন্থ রচনার অন্যতম ‘আদি পুরুষ’ মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী (১৮৯৪-১৯৫১)। বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯১৯), চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯১৯) ও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৯১৯) প্রমুখের প্রবন্ধের কথা স্মরণ রেখেও বলা যায়, আমাদের জানামতে জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সনের (১৯০৫) গ্রন্থের বাইরে বাংলাদেশের কোনো একটি আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে একক পুস্তিকা রচনার কৃতিত্ব কেবল আবদুর রশিদ সিদ্দিকী অর্জন করেন। তাঁর চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব (১৯৩৫) গ্রন্থটি চকরিয়া, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশের বছরেই ড. মুহম্মদ এনামুল হক রচিত চট্টগ্রামী বাঙ্গালার রহস্য-ভেদ (১৯৩৫) গ্রন্থটি কোহিনূর লাইব্রেরি, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয়। তবে এনামুল হকের বইটিতে আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর উল্লেখ প্রমাণ করে-সিদ্দিকীর পুস্তিকাটি আগে প্রকাশিত। ভাষাতাত্কত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে চাটগাঁ ভাষা বিষয়ক প্রথম প্রকাশিত পুস্তিকার স্বরূপ-সন্ধান বাংলা ভাষার বৈচিত্র্যময় আঞ্চলিক ভাষার অনেক অনুদ্ঘাটিত পরিচয় উন্মোচিত হবে।]
সূচক-শব্দ: ভাষাতত্ত্ব, ভাষা, উপভাষা, লোকবুলি, আঞ্চলিক ভাষা।
সম্পাদক, সাহিত্যিক ও গবেষক মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী (১৮৯৪-১৯৫১) মুসলিম বাঙালি নবজাগরণের অনন্য ব্যক্তিত্ব। সমগ্র বাঙালি মুসলিম সভ্যতার সমাজ-সাহিত্য-ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে পত্রিকা সম্পাদনা ও উপন্যাস রচনার পাশাপাশি তিনি আপন জন্মজনপদ সমুদ্রসম্পদে সমৃদ্ধ চট্টগ্রামী সভ্যতার স্বরূপ অন্বেষণেও আত্মনিয়োগ করেন গভীর নিষ্ঠার সাথে। তারই প্রমাণ পাই তাঁর চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব (১৯৩৫) গ্রন্থ রচনা থেকে। এই গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি চট্টগ্রামের ভাষাতত্ত¡ (১৯২৯) নামে আরও একখানি ক্ষুদ্র পুস্তিকা পূর্বে প্রকাশ করেছিলেন বলে জানালেও-সে-বইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত তাঁর জীবনীগ্রন্থ কিংবা বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান গ্রন্থেও তাঁর ঐ পুস্তিকাটির কোনো উল্লেখ নেই। অবশ্য চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব (১৯৩৫) গ্রন্থেই তিনি তাঁর নিজের বুলি সম্পর্কে যতটা ‘মূলতত্ত¡ উদ্ঘাটন’ করে আয়ত্ত করেছেন তা-ই প্রকাশ করেছেন। এই গ্রন্থে তাঁর নাম ‘আবদুররসিদ ছিদ্দিকী’ মুদ্রিত হলেও তাঁর জীবনীগ্রন্থ ও চরিতাভিধান অবলম্বনে বর্তমান প্রবন্ধে তাঁর নাম মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী রূপে ব্যবহৃত এবং চট্টগ্রামের ভাষাকে চাটগাঁ ভাষা নামে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবন্ধটি প্রকৃতপক্ষে ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ভাষার স্বরূপ অন্বেষণে গবেষকের অবস্থান অনুসন্ধান করবার প্রয়াস; পাশাপাশি গবেষণার সময়-সামর্থ্যকেও বিবেচনায় রেখে বর্তমান চাটগাঁ ভাষা পরিস্থিতিও আলোচনায় আসবে।
বাংলাদেশে সংবিধান-স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা বাংলা। অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য-আজও আমাদের দেশের অধিকাংশ উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের অধ্যয়নের ভাষা যথাক্রমে ইংরেজি ও আরবি। তার কারণ যথাক্রমে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক স্বর্গলাভ। প্রথম শ্রেণির জনগোষ্ঠী আসন গ্রহণ করতে চান আমেরিকা-ইউরোপের নাগরিকত্ব নিয়ে জাগতিক সুখ-সিংহাসনে। অপর শ্রেণি অর্জন করতে চান আরববিশ্বে শ্রম বিক্রির অধিকার আর আপন ধর্মের ব্যুৎপত্তি লাভের গৌরবের সাথে পরকালের পরম সুখশান্তির অধিকার। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জনসাধারণ অনেকটা নিরুপায় হয়ে যেনো বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে কিংবা করতে বাধ্য হয়; তবে আভিজাত্য-অভিমানে এঁরাও আঞ্চলিক বাংলাকে অবহেলা করেন অবলীলায়। অবধারিতভাবে অবহেলিত হয় আঞ্চলিক ভাষাগবেষণা ও গবেষকগণ। আবদুর রশিদ সিদ্দিকীকেও সেই অবহেলা আঁকড়ে আছে বৈকি! তাইতো তাঁর জীবনীকার শফিউল আলমও কেবল ‘সাহিত্যিক ও সমাজসেবী আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর জীবনপঞ্জি লিপিবদ্ধ করেছেন’ (মাহ্মুদ শাহ্, ১৯৯০: ৭)। জন্মভ‚মির ভাষাগবেষক মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর স্বরূপটা তাই অনেকটা অনালোচিতই আছে আজও। এমনকি তাঁর সমকালেও তিনি সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হিসেবে যশস্বী হয়ে ছিলেন (শফিউল, ১৯৯০: ৯)। অনুমান অসংগত নয় যে তাঁর উপন্যাস-সম্পাদকীয় যতটা পঠিত-আলোচিত হয়েছে, ভাষাগবেষণা ততটা হয়নি কিংবা হবার সুযোগ ঘটেনি।
আবদুর রশিদের প্রপিতামহের পিতা মোহাম্মদ বাছির উদ্দিন ছিলেন বৃটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারি। তাঁদের নিবাস ছিল বর্তমান আনোয়ারা উপজেলার বরইয়া গ্রামে (বর্তমান গবেষক বিগত একুশ বছর থেকে চাকরিসূত্রে আনোয়ারায় বসবাস করছেন এবং আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে-মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর প্রতি এক অদৃশ্য নাড়ির টান অনুভব করেন)। আবদুর রশিদের পিতামহ প্রখ্যাত আলেম আহমদ আলী ধর্মপ্রচারে বেরিয়ে কক্সবাজার জেলার চকোরিয়া উপজেলার কাকরা গ্রামে হিজরত করেন। সেখানেই ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নেন মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী। ছোটবেলা থেকেই তিনি বটতলার পুঁথি পাঠের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। বেশ কিছু ফারসি কেতাবও পাঠ করেন আবার ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে কিছুদিন কক্সবাজার মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে আবার নিজ গ্রামের মধ্যবাংলা বিদ্যালয়ে ফিরে যান (শফিউল, ১৯৯০: ১৩)। কাজেই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মধ্যবাংলা বিদ্যালয় পর্যন্ত বলা যায়। ‘আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর সাহিত্য মানস গড়ে ওঠে দোভাষী পুঁথির আবহাওয়ায়, এবং তা বিকশিত হয় ফরাসি সাহিত্যের পরিমন্ডলে’ (মাহ্মুদ শাহ্, ১৯৯০: ৭)। সমকালীন খেলাফৎ আন্দোলনে যোগদান এবং চট্টগ্রামের গ্রামান্তরে এ আন্দোলনের পক্ষে বক্তৃতা করে বেড়ানোর মধ্যেও তাঁর ভাষাদক্ষতার বিকাশ ঘটে। বিশেষত আঞ্চলিক ভাষা বা কথ্য লোকবুলির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় বলে অনুমান করা যেতে পারে। তবে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নুরেন্নেহার’ (১৯১৭) নিজের প্রণয়জীবনের অভিজ্ঞতা ভিত্তিক হলেও ‘উপেন্দ্র নন্দিনী’ (১৯১৭) ও ‘মেহেরুন্নেসা’ (১৯১৭) উপন্যাস দুটির নামকরণ থেকেই বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশ নন্দিনী’ (১৮৬৫) ও ‘কপালকুন্ডলা’ (১৮৬৬) উপন্যাসের প্রভাব না হোক পাঠের অভিজ্ঞতা যে লেখকের হয়েছে তা অস্বীকার অসম্ভব। সিদ্দিকীর আত্মজীবনীতেও পাই: ‘আমি বঙ্কিমবাবুর সমস্ত উপন্যাস পড়িয়াছি, কাজেই উপন্যাস লিখিতে আমার তেমন কষ্ট পাইতে হইল না’। আবদুর রশিদ যখন লিখেন: ‘বঙ্গ সাহিত্য বাঙ্গালারই সম্পত্তি। এই সাহিত্য সেবায় জাতিধর্ম বিচারের আবশ্যক নাই।’ তখন বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাবই পাঠকের মনে উদয় হবে। কেননা, শামসুজ্জামান খানের ভাষায়: বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দু-মুসলমান বাঙালির মিলিত জাতীয়তাবাদ গড়তে চেয়েছিলেন। বাংলার মোগলপন্থী মুসলমান অভিজাতদের জন্য তা হয়নি। বঙ্কিম বলেছেন, ‘বাঙ্গালা হিন্দু-মুসলমানের দেশ-একা হিন্দুর দেশ নহে। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান এক্ষণে পৃথক, পরস্পরের সহিত সহৃদয়তা শূন্য। বাঙ্গালার প্রকৃত উন্নতির জন্যে নিতান্ত প্রয়োজনীয় যে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য জন্মে। যতদিন উচ্চশ্রেণির মুসলমানের এমন গর্ব্ব থাকিবে যে, তাহারা ভিন্ন দেশীয়, বাঙ্গালা তাহাদের ভাষা নহে, তাহারা বাঙ্গালা লিখিবেন না, বাঙ্গালা শিখিবেন না, কেবল উর্দু-ফার্সির চালনা করিবেন, তত দিন সে ঐক্য জম্মিবে না। কারণ জাতীয় ঐক্যের মূল ভাষার একতা।’ (উদ্ধৃত, শামসুজ্জামান, ২০২০)। মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী সে-সময়ে বাঙ্গালার উন্নতির আবশ্যকতা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর আলোচনা আজও আমাদের কাছে অতি আবশ্যিক এবং প্রাসঙ্গিক।
মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর সম্পাদনায় ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের বৈশাখে চট্টগ্রাম থেকে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সাধনা’ প্রকাশিত হয়। পত্রিকা সম্পর্কে তাঁর জীবনীকার লিখেন: “মাসিক পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে তাঁর ধারণা ছিল ‘পত্রিকাখানি মোসলমানী ধরনের, মোসলমানীভাবে, মোসলমানী ছাঁচেই গড়িয়া তুলিব।’ কিন্তু চট্টগ্রামের সমকালীন মুসলমানের কোন সহযোগিতা না পাওয়ায় তাঁকে বিপরীত সিদ্ধান্ত নিতে হল। … তাই তিনি পত্রিকার নাম ‘সাধনা’ রাখাই স্থির করলেন” (শফিউল, ১৯৯০: ১৩)। এতে প্রমাণিত হয় ‘সাধনা’ নামকরণ এবং এর নীতিনির্ধারণ বা সিদ্ধান্তগুলো তাঁর মননজাত নয়, বরং ভাবনার বিপরীত-সমসাময়িক বাস্তবতায় মেনে নেওয়া মাত্র। তাইতো দেখি- সম্পাদকের সাথে বিরোধ বিদ্যমান থাকলেও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ইসলামাবাদ সম্পর্কিত প্রথম প্রবন্ধ ‘ইসলামাবাদের ঐতিহাসিক বিবরণ’ ‘সাধনা’ ১ম বর্ষ: ১ম সংখ্যাতেই সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় (শফিউল, ১৯৯০: ২৫)। আবার তিনি আপন আদর্শকে সমুন্নত রেখে ‘জাতীয় জাগরণের সাপ্তাহিক সংবাদপত্র’ হিসাবে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্টে কলকাতা থেকে সম্পাদনা শুরু করেন ‘মোসলেম জগৎ’। এই সাপ্তাহিক পত্রিকায় ‘সময় থাকিতে সাবধান, বুঝে চল বৃটিশ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রবন্ধের জন্যে ২২ ডিসেম্বর ১৯২২ তারিখে মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী গ্রেফতার হন এবং তাঁর প্রবন্ধের ব্যাখ্যা দিয়ে লিখিত চিঠির প্রেক্ষিতে আঠারো দিন পর তিনি মুক্তি লাভ করেন। সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক প্রবন্ধ লেখার জন্য কাজী নজরুল ইসলামের পর তিনি দ্বিতীয় মুসলিম যিনি কারারুদ্ধ হন (শফিউল, ১৯৯০: ২৩)। কারাগারে নজরুলের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। অনুমান করা যেতে পারে এসময় তাঁর মধ্যে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার স্ফ‚রণ ঘটে প্রবলভাবে। তাই আমরা তাঁকে পাই ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘রক্তকেতু’ সম্পাদক রূপে। ‘রক্তকেতু’ ২য় বর্ষ: ১ম সংখ্যায় সম্পাদক সিদ্দিকী লিখেন: ‘সাম্প্রদায়িক বিবাদ আমার অভিপ্রেত নহে, রাজনীতি ক্ষেত্রে হিন্দু মোসলমানের একতাও কামনা করি না, …এক ঘরেতে বাস করিবার জন্য হিন্দু মোসলমানের মিলন আমার আন্তরিক বাসনা’ (শফিউল, ১৯৯০: ২৫)। গবেষকের জীবনের এই ঘটনা পরম্পরার প্রেক্ষিতে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর চট্টগ্রামী ভাষা বিষয়ক গবেষণা।
‘রক্তকেতু’ সম্পাদনা শুরুর কবছর আগেই মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী প্রকাশ করেন চট্টগ্রামের ভাষাতত্ত্ব (১৯২৯) নামে ‘একখানি ক্ষুদ্র পুস্তিকা’। ‘কিন্তু ইহাতে কৃতসংকল্পের পূর্ণ সাফল্য ঘটে নাই’ (আবদুররসিদ, ১৯৩৫: ভূমিকা)। তাই তখন থেকে আরও প্রায় ছবছর গবেষণা চালিয়ে তিনি প্রকাশ করেন চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব (১৯৩৫)। বইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য প্রকাশিত হবার বছরেই বিশিষ্ট বাংলা বৈয়াকরণ ড. মুহম্মদ এনামুল হক তাঁর চট্টগ্রামী বাঙ্গালার রহস্য-ভেদ (১৯৩৫) গ্রন্থের শুরুতে সহায়ক গ্রন্থপঞ্জিতে বইটিকে গ্রহণ করেন। এভাবে পন্ডিত এনামুল হকের গ্রন্থে বাংলা ভাষাতত্ত্বের প্রবাদ-পুরুষ জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন, ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের সাথে মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী একই পঙক্তিভুক্ত হবার গৌরব অর্জন করেন। তবে ভাষাতাত্ত্বিক সূক্ষ বিশ্লেষণ ও তাত্ত্বিক দিক থেকে সিদ্দিকীর উপরিবর্ণিত বই দুটি চলচেরা বিশ্লেষণ করলে অনেক ত্রুটি লক্ষ্য করা যাবে (শফিউল, ১৯৯০: ৬০)। কারো মতে, বিশেষত আবদুররশিদ ছিদ্দিকীর আলোচনায় ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনার নিয়ম পূর্ণমাত্রায় অনুসৃত নয় (কমরুদ্দিন, ২০১০: ১৮৮)। তবে কাল বিবেচনায় বলতে হয়: তিনি যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় রেখেছেন (শ্যামল, ২০২০: ১৪৯)। কেননা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সেকালে তাঁদের শক্তি আর সামর্থ্য অত্যন্ত সীমিত ছিল-এ সম্বন্ধে তাঁরা নিজেরাও যে ওয়াকিবহাল ছিলেন না তা কিন্তু নয়, তথাপি ক্ষেত্র প্রস্তুতের দায়িত্ব তাঁরা এড়াতে চাননি (আবুল ফজল, ১৯৬৭: ৬৫)। ভাষাগবেষণার আদি পুরুষগণের নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নে সে-কথা মনে রেখেই ভাষাতাত্তি¡ক পদ্ধতি মেনে আলোচনায় এগোতে হবে সজাগ-সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে।
চকোরিয়ার সন্তান আবদুররশিদ ছিদ্দিকীর গ্রন্থের প্রারম্ভিক বাক্যেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত: ‘উর্দ্দুই চট্টগ্রামী ভাষার বাহন, আরবী ইহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, পার্শি ইহার অঙ্গরাগ, এবং বাঙ্গালা ইহার নয়নাঞ্জন’। এমন স্পষ্ট অবস্থান দেখে ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক মনসুর মুসা মন্তব্য করেন, ‘উৎকট উপস্থাপনা ছাড়া পুস্তিকাটির অন্য কোন বিশেষ গুরুত্ব নেই’ (উদ্ধৃত, শফিউল, ১৯৯০: ৬১)। তবে তৎকালীন মুসলিম বাঙালিগণের মানসিতা মনে রাখলে মনে হয় ভাষাবিজ্ঞানীর কাছে আবদুর রশিদের ভাবনাকে ‘উৎকট’ মনে হতো না; গবেষণার গুরুত্বও উপলব্ধি করা যেতো। বিশ শতকের গোড়ার দিকে এদেশের মুসলিমদের ভাষা-ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাসের একটি চরিত্রের মাধ্যমে। সেখানে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিনের পিতা কংগ্রেস-কর্মী জালালউদ্দিনের ভাষায়:
‘আমাকে বাবা বলতেন, উর্দু না শিখিলে সারা ভারতবর্ষে মুসলমানদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান সম্ভব নয়; আমরা সেই বালক বয়সেই জানতাম যে, এই বাংলাদেশে আমরা যারা আছি, আমরা একা নই, আমাদের সঙ্গে আছে সারা হিন্দুস্থানের মুসলমান, তারা আমাদের আত্মীয় তারা আমাদের ভাই, তারা মিলেই আমাদের বৃহৎ পরিবার; পরিবারের সবার সাথে ভাব বিনিময় করতে পারব না, এটা তো হতে পারে না, অতএব উর্দু শিখতেই হবে।
আমরাও দেখতাম যখনই কোনো জ্ঞানের কথা উঠতো, ভবিষ্যতের কথা উঠত, যখনই কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে তা দলিলসিদ্ধ করবার দরকার পড়তো, উর্দু ভাষায় মুরুব্বিরা কবিতা বলতেন বা নিজের মনের কথাটি উর্দুতে প্রকাশ করতেন; আমরা আরও শুনেছি আমাদের বংশের প্রতিষ্ঠাতা হজরত শাহ সৈয়দ কুতুবউদ্দিন ছিলেন দিল্লীর দরবারে আকবর বাদশাহর সম্মানিত একজন বুজুর্গÑসেই দিল্লীতে আজ কোন ভাষায় তুমি কথা বলবে গিয়ে?-উর্দু! আমরা তাই দ্বিগুন উৎসাহের সঙ্গে উর্দু পড়তাম।’ (শামসুল হক, ২০০৯: ৩৯৩)।
বিশ শতকের গোড়ায় বেড়ে ওঠা ও ইংরেজি স্কুলে পড়তে প্রবেশ করা আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর ভাষাভাবনাও যে তেমনটাই ছিল তার পরিচয় আগেই পাওয়া যায়: ‘সাধনা’ পত্রিকা প্রকাশ-পূর্ব তাঁর চিন্তা-ভাবনা থেকে। এছাড়াও তিনি তাঁর বিয়ে সম্পর্কে আত্মজীবনীতে লিখেন, ‘রূপ ত আছেই তদুপরি বঙ্গভাষা ও উর্দু ভাষায় তাহার বেশ দখল আছে। কাজেই আমি আনন্দিত হইলাম। স্ত্রী আমার মনোমত হইল।’ স্ত্রীর ভাষাবোধ তাঁর পছন্দ হবার কারণ যে বটতলীর দোভাষী পুঁথি পাঠের পরিবেশে সিদ্দিকীর বেড়ে ওঠা ব্যক্তিত্ব থেকে বিকশিত সে-বাস্তবতা অনুভব করতে না পারলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে।
গবেষক মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর আধুনিক মনের পরিচয় পাওয়া যায় যখন তিনি ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে লিখেন, ‘অনেকে ভাষাকে প্রকৃতিগত ঐশ্বরিক বলিয়া অনুমান করিয়া থাকেন। কিন্তু এই ধারণার মূলে কোনও সত্য আছে বলিয়া আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আসে না’ (আবদুররসিদ, ১৯৩৫: ভূমিকা)। পাঠক বলতে পারেন যে, আরও অনেক আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কিত মতবাদ বিষয়ে মন্তব্য করেন: ‘কেহ কেহ বলেন, ইহা ঈশ্বরপ্রদত্ত। … কিন্তু তিনি যে ভাষাগুলি তৈয়ারি করিয়াÑবিভক্তি, লিঙ্গ, কারকাদিবিশিষ্ট করিয়া-দেশে দেশে মনুষ্যকে শিখাইয়া বেড়ান নাই, ইহা অনায়াসে অনুমিত হইতে পারে’ (বঙ্কিমচন্দ্র, ১৯৯০: ৩৪৪)। কিন্তু একটু সতর্ক দৃষ্টি দিলেই দেখা যাবেÑযেখানে একুশ শতকের বাঙালি ভাষাবিজ্ঞানী-অধ্যাপক বলেন: ‘মোটামুটি প্রত্যয়ের সঙ্গেই আমরা বলব যে, সৃষ্টিকর্তাই জীবশ্রেষ্ঠ মানুষকে ভাষার মতো আশ্চর্য এক ক্ষমতা দিয়েছেন যার সৌকর্য ও পারঙ্গমতা, সৃষ্টির অন্য কোনো প্রাণীর সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না’ (দানীউল, ২০১৩: ১৩)। অথচ বঙ্কিমচন্দ্র তখনই এমন আরও কতক মতবাদকে ‘অবৈজ্ঞানিক ও অগ্রাহ্য’ বলে ‘ভাষা অনুকৃতিমূলক’ মতবাদকে যৌক্তিক সমর্থন দেন। আবদুর রশিদ সিদ্দিকী সেই সময়ে অতোাঁ আধুনিকতা ও বিজ্ঞানমনস্কতা অর্জন করেছেন-সে কম গৌরবের কথা নয়।
চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব বইটির প্রথমে ৬ পৃষ্ঠাব্যাপী ‘ভূমিকা’ এবং ৪৪-৫১ পৃষ্ঠাব্যাপী ‘চট্টগ্রামী প্রবচন’ ব্যতীত ১Ñ৪৩ পৃষ্ঠাব্যাপী আলোচনাকে গ্রন্থ না বলে পুস্তিকা বলাই আধুনিক আলোচনায় যুক্তিসঙ্গত (আধুনিক কালে ৫০ পৃষ্ঠার চেয়ে কম পৃষ্ঠার বইকে পুস্তিকা বা বুকলেট বলে, পুস্তক/ গ্রন্থ বা বুক বলে গণ্য হয় না)। পুস্তিকাটির শুরুতে আছে ‘চট্টগ্রামী ভাষার উৎপত্তি’ দুপৃষ্ঠায় এ আলোচনা শেষ করে তিনি ‘চট্টগ্রামী ভাষার ব্যাকরণিক পরিভাষা’, ‘ক্রিয়াপদের ভিন্ন ভিন্ন রূপ’ ইত্যাদি শিরোনামে যৎসামান্য আলোচনা করেন। ‘কারক প্রকরণ’ অংশে এসে লিখেন: আমরা উর্দু হামারা অপভ্রংশে ‘আঁ-রা’ হয়। বাঙ্গালা আমি ও আমরার অপভ্রংশেও ‘আঁই ও আঁ-রা’ ব্যবহৃত হইয়া থাকিতে পারে (আবদুররসিদ, ১৯৩৫: ৭)। আবদুর রশিদ সিদ্দিকী এভাবে পুরো পুস্তিকায় অনেকটা অযথা অনবরত আরবি-উর্দুর সাথে মিলানোর আরাধনা করেছেন, আবার সংশয়ে সংকল্প ছেড়ে বাংলা ভাষার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন অবিরল। ‘বর্ণানুক্রমে দুর্ব্বোধ্য শব্দমালা’ তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘ আলোচনা। ১৫-৪৩ পৃষ্ঠাব্যাপী বাংলা বর্ণমালার ক্রমানুসারে দুর্ব্বোধ্য শব্দের ব্যুৎপত্তি-অর্থ-ব্যবহার আলোচনা দিয়েই তাঁর পুস্তিকার ভাষাতত্ত্ব গবেষণা সমাপ্ত হয়েছে। ‘ক’ বর্ণের শব্দমালাতে (২৩-২৬ পৃষ্ঠাব্যাপী) তিনি ৩৪টি শব্দের আলোচনা করেন। এতে সর্বাধিক ৮টি শব্দের ব্যুৎপত্তি দেখান উর্দু থেকে। এগুলো হলো: কেড়ে, কঁত্তে, কুঁইক্যা, কিল্লায়, কৌন্না, কন্, কন্নত্ ও ক্ষুআ। আরবিজাত শব্দ আছে ৭টি। এগুলো হলো: কুইজ্জা, কাঁইজ্জা, কজিয়া, কিলাল, কয়, কেরায়া ও কয়াল। বাংলা ভাষা থেকে উৎপন্ন শব্দ দেখিয়েছেন মাত্র ৪টি; এগুলো হলো: কুশ্শাল, কুজাড়া, কাঁইক্যা ও কিলা। অবশ্য বাংলা ভাষা থেকে আগত চাটগাঁ বুলির বেশিরভাগ শব্দই বাঙালির কাছে দুর্বোধ্য মনে হবে না। তাই বাংলা ভাষাজাত দুর্বোধ্য শব্দ সংখ্যায় কম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ক-আদ্যক্ষর যুক্ত পারসি তুর্কি ও অপভ্রংশ জাত শব্দ আছে একটি করে; এগুলো হলো যথাক্রমে কদ্দা, কাবু ও কত্তুক। বাকি বারোটি শব্দের উৎসভাষা তিনি নির্দেশ করেননি তবে বিশ্লেষণ করে অর্থ ও প্রয়োগবাক্য দেখিয়েছেন। এগুলো হলো: কুন্দি, কিত্ত, কে’নে, কৈছালি, কাইন্যা আঙ্গুল, কইচ্যা, কুচক্রাই, কুরা, কুইট্টাই, করন চইখ্যা, করৈচ্ছা ও কিল্কুনি। এতে গবেষকের নিষ্ঠার প্রমাণ পাওয়া যায়। একই সাথে তিনি চাটগাঁ ভাষা বাংলা বর্ণমালায় লিখবার পথও দেখিয়ে দেন-‘তুঁই কড়ে যাইবা?’(পৃ ২৩) লিখেন; ‘হড়ে/ হডে’ লিখেননি। তাঁকে অনুসরণ করলে চাটগাঁ ভাষা লিখবার ক্ষেত্রে অধুনা আরোপিত কিছু বিতর্ক থেকেও মুক্তি মিলতে পারে অনেক সহজে।
চাটগাঁ ভাষা লিখতে গিয়ে বিতর্কের বিষয়টা এখানে প্রসঙ্গিক মনেকরছি। বিষয়টা স্পষ্ট করা যেতে পারে। গত শতক থেকে চট্টগ্রামে জনপ্রিয়তা পায়: ‘মধু কই কই বিষ খাওয়াইলা …’, ‘তোঁয়ারা কন কন যাবি আঁর সাম্পানে …’ ইত্যাদি গানগুলো। কিন্তু গানগুলো যখন লিখার প্রয়োজন হলো তখন এলো বিতর্ক। অনেকেই লিখলেন: ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা …’, ‘তোঁয়ারা হন হন যাবি আঁর সাম্পানে …’ এতে মনে হয় চট্টগ্রামের ভাষায় বাংলা ভাষার ‘ক’>‘হ’ হয়ে যায়। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যায় চট্টগ্রামে ‘ক’ এর সাথে ই/উ যুক্ত হলে ‘ক’ অবিকৃত থাকে, যেমন-কি, কুন্নি; কিন্তু ‘ক’ এর সাথে অ/আ যুক্ত হলে ‘ক’ উষ্মতা প্রাপ্ত হয় বটে কিন্তু তা মহাপ্রাণ ‘হ’ হয় না। আর তাই কথ্ > কহ্ ধাতুজাত ক্রিয়া কই কই (কহিয়া কহিয়া) এবং হই হই ( হৈ হৈ ধ্বনি) চট্টগ্রামেও পৃথক অর্থবহ। প্রমিত বাংলায় আমরা যেমন ‘পরীক্ষা’ লিখে ‘পোরিক্খা’ উচ্চারণ করি ঠিক তেমনি চট্টগ্রামের ভাষাকে বাংলার উপভাষা মেনে নিয়ে বাংলা বানানেই লেখার পক্ষে আমরা, পড়বার বা গাইবার সময়ে চট্টগ্রামের বৈশিষ্ট্য প্রয়োগ করলেই হলো (শ্যামল, ২০১৯: ১০)। এতে করে বাঙালির কাছে যেমন চাটগাঁ ভাষার দুর্বোধ্যতা কমে বোধগম্যতা বাড়বে, তেমনি চাটগাঁ ভাষার শব্দভান্ডার হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে আবার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিও সমৃদ্ধির সোপানে আরোহন করবে। এ ক্ষেত্রে আদর্শ হতে পারেন মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম সাক্ষর জনগণ কেবল রাষ্ট্রীয় কাজে বা অফিস আদালতে প্রমিত বাংলা ব্যবহার করেন। অন্য সময় ঐ কমঅর্ধেক সাক্ষর জনগণ এবং সবসময় বেশি অর্ধেক নিরক্ষর জনগণ তাদের আঞ্চলিক বা উপভাষায় কথা বলেন। সর্বোপরি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসি বাঙালি জনগণ প্রমিত বাংলা না শিখে নিজেদের আঞ্চলিক বাংলাই রপ্ত করে। সুতরাং আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষার কাছে যেতে হলে কিছু সংখ্যক মানুষের সামান্য সময় ব্যবহৃত প্রমিত বাংলাকে আঞ্চলিক বাংলার আলিঙ্গনে প্রয়াসী হওয়া আবশ্যক (শ্যামল, ২০১৮: ৭২)। অথচ আমাদের অধিকাংশ আঞ্চলিক ভাষাগবেষক নিজের আঞ্চলিক ভাষাকে স্বতন্ত্র ভাষা বলে চালাতে চান আবার নিজের বাঙালিত্বকেও বজায় রাখতে গিয়ে বিভ্রান্তিতে ভোগেন। আমাদের আলোচ্য গবেষকও তার ব্যতিক্রম নন। তাই তিনি লিখেন, ‘চট্টগ্রাম বঙ্গদেশের সীমান্ত জেলা এবং এতদঞ্চলের অধিবাসীরাও বাঙালি, তত্রাচ এ জেলার কথ্য ভাষা বা বুলি বাঙ্গালা ভাষা হইতে স্বতন্ত্র’ (আবদুররসিদ, ১৯৩৫: ভ‚মিকা)। অথচ এই স্বাতন্ত্র্য অনুসন্ধান করতে চাইলে বাংলাদেশের চৌষট্টি জেলার স্বতন্ত্র ভাষা দাঁড় করানো অসম্ভব নয়। কেননা, ম্যাক্সমুলারের উক্তি ‘প্রতি পাঁচ মাইল অন্তর ভাষা বদলে যায়’। সে কারণে, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. মনিরুজ্জান ও ড. মো. আবুল কাসেম প্রমুখ প্রত্যেকেই চট্টগ্রামের ভাষাকে বাংলার আঞ্চলিক ভাষা বৈচিত্র্য বা উপভাষা রূপেই বর্ণনা করেছেন এবং এই উপভাষার ব্যাকরণ প্রণয়নে প্রয়াসী হয়েছেন। অবশ্য বোধগম্যতার দিক দিয়ে চাটগাঁ ভাষা (সিলেট ও নোয়াখালির মতো) বাংলা ভাষার দূরবর্তী উপভাষা।
চাটগাঁ-সন্তান ড. সলিমুল্লাহ খান তাই লিখেন, ‘আর আর জেলার লোকে বুঝিতে না পারিলেও বলিতে হইবে চট্টগ্রামের বাংলাও বাংলাই। চট্টগ্রামও বহুদিন ধরিয়া বাংলা মুলুকের তালুক হইয়া আছে। মুহম্মদ এনামুল হক চট্টগ্রামের বাংলা লইয়া-অনেক বছর আগে-ছোট্ট একটা বহি বাধিয়াছিলেন। তাঁহার অভিমত-চট্টগ্রামের ভাষা বাংলার বিকৃতি নয়, এক ধরণের বিকাশ, ইহাও বাংলা বিশেষ। তাঁহার সহিত দ্বিমত করিবার সাহস আমার নাই। তবে জিজ্ঞাসার একটা বিষয় আছেÑচট্টগ্রামে আসিয়া বাংলা যে বিশেষ রূপটা পরিগ্রহ করিল তাহার গোড়ায় আর কোন কোন ভাষার দান আছে? জিজ্ঞাসা না করিলে বোঝা যাইবে না এই বাংলাটা কেন এমন সুন্দর এমন মধুর হইল! চট্টগ্রামের বাংলায় বৌদ্ধযুগের বাংলার ছাপ এখনও মুছিয়া যায় নাই। কান পাতিলেই শোনা যায় চট্টগ্রামের বাংলারও নানান রূপান্তর, চোখ খুলিলেই নানান নামান্তর’ (সলিমুল্লাহ, ২০১৬: ০৭)। এই রূপান্তর বৈচিত্র্যকে ধারণ করেই চাঁটগা ভাষার চর্চা-গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে আমাদের বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করবার মানসে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না রবীন্দ্রনাথের উক্তি: ‘বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অংশে যতগুলি উপভাষা প্রচলিত আছে তাহারই তুলনাগত ব্যাকরণই যথার্থ বাংলার বৈজ্ঞানিক ব্যাকরণ।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯০৫: ৫৪৯)।
চট্টগ্রামের ভাষা নিয়ে বাংলা ভাষায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকাতেই প্রথম আলোচনা দেখা যায় ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে। বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই দুই মনীষী সেই কৃতিত্বের অধিকারী। তবে চট্টগ্রামের উপভাষা বিষয়ে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের আগে কেউ বিস্তৃত আলোচনা করেননি (মনিরুজ্জামান, ১৯৯৪: ৩১৮)। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকার আদর্শে আবদুল করিমের আলোচনাটি ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দেই সওগাত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে (মাঘ ১৩২৫- চৈত্র ১৩২৬) প্রকাশিত হয়। ফেব্রæয়ারি ১৯১৯ থেকে মার্চ ১৯২০ এর মধ্যে প্রকাশিত আলোচনাটিতে তিনি পালি-মঘী-রাঢ়ীয়-আরবি-ফারসি ও পর্তুগিজ ভাষার মিশ্রণে ও প্রত্যক্ষ প্রভাবে চট্টগ্রামের ভাষা কীরকম বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে উঠেছে তার পরিচয় বিশ্লেষণ করেছেন অনেকটা ভাষাতাত্তি¡কের মতো দক্ষতা দেখিয়ে। অবশ্য সাহিত্যবিশারদের আলোচনা সুলভ হয় অনেক পরে-সৈয়দ মুর্তজা আলী সম্পাদিত ইসলামাবাদ (১৯৬৪) গ্রন্থ প্রকাশের পর। ইসলামাবাদ (বাতিঘর সংস্করণ, ২০১৭) গ্রন্থের ৭৯-১৪৩ পৃষ্ঠাব্যাপী ‘চট্টগ্রামের ভাষা’ এবং ১৩৩-১৫৯ পৃষ্ঠাব্যাপী ‘দেশভেদে বঙ্গভাষার বিভিন্নতা’ নিয়ে আবদুল করিম সাবলীল আলোচনা-বিশ্লেষণ করেছেন। অবশ্য সাহিত্যবিশারদ স্বীকার করে নিয়েছেন: ‘বঙ্গদেশের নানা স্থানের ভাষার নমুনা ও তৎসম্বন্ধে অনেক কথা পন্ডিতপ্রবর ডক্টর গ্রীয়ার্সন সাহেবের লিংগুইস্টিক সার্ভে ওব ইন্ডিয়া নামক গ্রন্থ হইতে গৃহীত হইয়াছে’ (আবদুল করিম, ২০১৭: ১৫৯)। তবু ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক লিখেন, ‘আলোচনার মধ্যে নানাস্থানে গ্রীয়ার্সনের প্রসঙ্গ এনে তিনি বক্তব্য স্পষ্ট করার প্রয়াস পেয়েছেন। কিন্তু তৎসত্তে¡ তিনি কোথাও গ্রীয়ার্সনের জরিপ পদ্ধতির ওপর পূর্ণত নির্ভর করেননি’ (মনিরুজ্জামান, ১৯৯৪: ৩১৮)। গ্রীয়ার্সনের গ্রন্থ (১৯০৩) প্রকাশের ৩৩ বছর পর এবং আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের আলোচনা সওগাত পত্রিকায় (১৯১৯-১৯২০) প্রকাশের ১৫ বছর পরে প্রকাশিত মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত¡ (১৯৩৫) গ্রন্থে তাঁর পূর্ববর্তী গবেষকগণের নাম বা তাঁদের গ্রন্থ-প্রবন্ধের কোনো উল্লেখ না পাওয়া বর্তমান গবেষকের কাছে এক বিষ্ময়। বিশেষত মেনে নেয়া যায় তিনি স্বাধীন মত প্রকাশের জন্যে অপরের আলোচনাকে পর্যালোচনার প্রয়োজন মনে করেননি। কিন্তু আবদুর রশিদ যখন লিখেন, ‘চট্টগ্রামী বুলির উৎপত্তিগত কারণ যে কি, তাহা নিয়া মাথা ঘামাইতে এযাবৎ বিশেষ চেষ্টা চরিত হইয়াছে বলিয়া আমরা জানিতে পারি নাই’ (আবদুররসিদ, ১৯৩৫: ভূমিকা)। যদিও আবদুর রশিদের জীবনীতে পাই তাঁর সম্পাদিত ‘সাধনা’ পত্রিকার প্রথম বর্ষ: প্রথম সংখ্যাতেই সাহিত্যবিশারদের ‘ইসলামাবাদ’ প্রকাশ শুরু হয়; তবু আবদুর রশিদের চেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা মনে হয় এনামূল হকের চট্টগ্রামী বাঙ্গালার রহস্য-ভেদ। এনামুল হক তাঁর বইটি উৎসর্গ করলেন সাহিত্যবিশারদকে; ১৩টি সহায়ক পুস্তক-প্রবন্ধের তালিকায় সাহিত্য বিশারদের ৬টি প্রবন্ধ নাম নিলেও ‘ইসলামাবাদ’ প্রবন্ধ কেন যে নিলেন না-সে প্রশ্নের জবাবটা চাটগাঁ ভাষা গবেষণায় নতুন কোনো গবেষক আগামীতে অনুসন্ধান করবেন বৈকি।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী-লগ্নে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায়, আমাদের অর্থনীতি আর অবকাঠামোর অনেক উন্নতি হয়েছে বটে কিন্তু আজও আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন করতে পারিনি। যে-বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ, তার অস্তিত্বের স্বার্থেই বাংলা ভাষাকে সংকটমুক্ত করতে হবে। তার জন্যে চাই একটি সুষ্ঠু ভাষানীতি, সেই ভাষানীতির ভিত্তিতে ভাষার অবয়ব ও অবস্থান পরিকল্পনা। এর কোনোটাই আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি প্রকৃত বাংলা ভাষার বৈজ্ঞানিক ব্যাকরণের অভাবে। সেই আক্ষেপ রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু হয়ে আজও আমাদের অক্ষমতাকে, আমাদের গবেষণা-বিমুখতাকে ব্যঙ্গ করে। অথচ বাংলার প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে-ভিন্ন ভিন্ন মতের-পথের সমন্বয় সাধন করেই লক্ষ্যে উপনীত হওয়া অসম্ভব নয়। সেখানেই মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর মতো গবেষকগণের গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁরা মাতৃভাষা প্রেমকে পুঁজি করে সীমিত তাত্তি¡কতা নিয়ে পথ প্রস্তুত করেছেন। তাঁদের প্রারম্ভিক পথরেখা ধরেই এখন আরও সংস্কার-সংশোধন-সংযোজন করে বাংলা ভাষার উন্নত উড়ালসড়ক বিনির্মাণে এগোনো সম্ভব হবে। বাংলার আঞ্চলিক ভাষা গবেষণার ইতিহাসে তাই অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর নাম এবং তাঁর ”ট্টগ্রামী ভাষাতত্ত¡।
লেখক পরিচিতি: ভাষাবিজ্ঞানী ও কবি, সহকারী অধ্যাপক, সিইউএফ কলেজ, সিইউএফএল, চট্টগ্রামÑ৪০০০, মুঠোফোন: ০১৭১২-১৩০৭৪৭।
সহায়কপঞ্জি
আবদুররসিদ ছিদ্দিকী (১৯৩৫)। চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব। চকরিয়া, চট্টগ্রাম।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (২০১৭)। ইসলামাবাদ। বাতিঘর, চট্টগ্রাম।
আবুল ফজল (১৯৬৭)। ‘সাধনা: একটি সাহিত্য মাসিকী’, মাহে নও, (তালিম হোসেন সম্পাদিত) ঢাকা।
কমরুদ্দিন আহমদ (২০১০)। ‘মনিরুজ্জামানের কাছে চট্টগ্রামীদের ঋণ’, মনিরুজ্জামান সংবর্ধনা স্মারক, (নীলুফার জহুর, ইলু ইলিয়াস ও রুহু রুহেল সম্পাদিত), কৃতকীর্তি, চট্টগ্রাম।
চন্ডিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯১৯)। ‘চট্টগ্রামে প্রচলিত বঙ্গভাষা’ (বসন্ত কুমারের সমালোচনা), বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা। কলিকাতা।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৯০)। ‘বাঙ্গালীর উৎপত্তি’। বঙ্কিম রচনাবলী: সাহিত্য সমগ্র। তুলি-কলম, কলিকাতা।
বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯১৯)। ‘চট্টগ্রামে প্রচলিত বঙ্গভাষা’, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা। ২৬ বর্ষ ২য় সংখ্যা, কলিকাতা।
মহাম্মদ দানীউল হক (২০১৩)। ভাষাবিজ্ঞানের কথা। মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
মাহ্মুদ শাহ্ কোরেশী (১৯৯০)। ‘প্রসঙ্গ-কথা’। মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী। শফিউল আলম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
মুহম্মদ এনামুল হক (১৯৩৫)। চট্টগ্রামী বাঙ্গালার রহস্য-ভেদ। কোহিনূর লাইব্রেরি, চট্টগ্রাম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯০৫)। ‘ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ’, রবীন্দ্র-রচনাবলী (একাদশ খন্ড)। পশ্চিমবঙ্গ সরকার, কলকাতা।
শামসুজ্জামান খান (২০২০)। ‘করোনা ও বঙ্কিমচন্দ্র’, অন্য আলো, ১০ জুলাই, প্রথমআলো। ঢাকা।
শ্যামল কান্তি দত্ত (২০১৮)। সিলেটের উপভাষা: ব্যাকরণ ও অভিধান। আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
শ্যামল কান্তি দত্ত (২০১৯)। ‘ভূমিকা’। দইজ্জাত উইট্টে তুয়ান। নিতাই চন্দ্র রায়। জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
শ্যামল কান্তি দত্ত (২০২০)। ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামের ভাষা’। সাগরলতা। সিরাজুল হক সিরাজ সম্পাদিত টেকনাফ কলেজ বার্ষিকী, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ।
সলিমুল্লাহ খান (২০১৬)। ‘ভূমিকা’। পরানজুরানি। সিরাজুল হক সিরাজ, তৃতীয় চোখ, চট্টগ্রাম ।
সৈয়দ শামসুল হক (২০০৯)। বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ। অন্বেষা প্রকাশন, ঢাকা।