আপাতত বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় যাচ্ছে না সুন্দরবন

74

ইউনেস্কোর ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের’ তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্তি আপাতত এড়াতে পেরেছে বাংলাদেশ। আজারবাইজানের বাকুতে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৩তম সভায় সুন্দরবনকে ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত হয় বলে বৃহস্পতিবার প্যারিসে বাংলাদেশের দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ব্যাপক সংখ্যায় শিল্প কারখানা নির্মাণের কারণে সুন্দরবন ‘মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে’- এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে ‘বিপদাপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (আইইউসিএন)। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার ছিল ২১ সদস্যের বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ওপর। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় কোন কোন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন থাকবে, কোনটি বাদ যাবে এবং কোন নিদর্শন ঝুঁকিতে রয়েছে- সেসব বিষয়ে ২১ সদস্যের ওই কমিটিই সিদ্ধান্ত নেয়।
কোনো বিশ্ব ঐতিহ্যের নাম বিপন্ন ঐতিহ্যের তালিকায় ওঠা মানে হলো, ওই বিশ্ব ঐতিহ্য কেন কতটা ঝুঁকির মুখে রয়েছে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানানো এবং সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া। সুন্দরবনকে ওই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের এই অভয়ারণ্য থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে সরকারের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পকেও জটিলতায় ফেলে দিতে পারত।
দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাকুতে চলমান বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৩তম সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর সুন্দরবনকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত হয়। খবর বিডিনিউজের
বাংলাদেশের পক্ষে কিউবা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং চীন সুন্দরবনকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার নতুন একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করে। আলোচনাকালে আজারবাইজান, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত, তিউনিসিয়া, তানজানিয়া, বুরকিনাফাসো, উগান্ডা, জিম্বাবুয়ে ও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতসহ ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র ওই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দেয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘কমিটিতে সুন্দরবন সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রশংসিত হয়। কমিটি সদস্য রাষ্ট্রসমূহ উন্নয়ন কর্মকান্ড ও পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনকে স্বাগত জানান’।
সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৬ সালের মার্চে আইইউসিএন-ইউনেস্কোর প্রতিনিধি দল রামপাল প্রকল্প এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখে। তাদের প্রতিবেদনে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সুন্দরবনের জন্য ‘মারাত্মক হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রকল্পটি অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে বলা হয়। তা না হলে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা বাতিল করে একে ‘বিপন্ন’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। পরের বছর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪১তম সভায় আলোচনার পর সুন্দরবনকে ‘বিপন্ন’ তালিকায় যুক্ত করার প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়।
রামপাল প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের থাকলেও ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার ও আইইউসিএন রিঅ্যাকটিভ মনিটরিং মিশনের ওই প্রতিবেদন আসার পর সরকার দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। সেই সঙ্গে ওই এলাকায় অরিয়ন গ্রæপের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন না করার কথাও ইউনেসকোকে জানানো হয়। ইউনেসকোর সেই সভার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ সরকাররের এসব পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল অয়েল স্পিল অ্যান্ড কেমিকেল কনটিনজেন্সি প্ল্যানের খসড়া প্রণয়ন ও কৌশলগত পরিবেশ মূল্যায়নের (এসইএ) সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়।
সেই সঙ্গে ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচারের (আইইউসিএন) রিঅ্যাকটিভ মনিটরিং মিশনের ২০১৬ সালের সব সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বলা হয়, যেখানে রামপাল প্রকল্প বাতিল করতে বলা হয়েছিল। সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারকে প্রতিবেদন দিতে বলেছিল হেরিটেজ কমিটি।
এরপর গত এপ্রিলে আইইউসিএন আবারও সুন্দরবনকে ‘বিপন্ন’ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় তোলার সুপারিশ করে। সেখানে বলা হয়, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করে তা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও সুন্দরবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পর্যালোচনা না করেই নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে প্রবাহমান পায়রা নদীর তীরে আরও দু’টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা তুলে ধরেও উদ্বেগ প্রকাশ করে আইইউসিএন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনের উজানে ১৫০টির বেশি শিল্প প্রকল্প চালু আছে, যেগুলোর সঙ্গে নৌ ও খনন কার্যক্রম পানি ও প্রতিবেশগত বৈচিত্র্যের বাড়তি হুমকি সৃষ্টি করছে। ওই সুপারিশ গ্রহণ না করে এবারের বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এ বছর বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির একটি বিশেষজ্ঞ দলকে আমন্ত্রণ জানাবে এবং আগামী ফেব্রæয়ারির মধ্যে হালনাগাদ তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন দাখিল করবে।
দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে কৌশলগত পরিবেশ মূল্যায়নের (এসইএ) প্রক্রিয়া শুরু করার যে প্রতিশ্রæতি বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে, তাকে সভায় স্বাগত জানানো হয় বলে জানিয়েছে প্যারিস দূতাবাস। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সিদ্ধান্ত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক- ই- ইলাহী চৌধুরী কমিটির সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কমিটি বাংলাদেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্রতি সমর্থন জানালো এবং সেই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করলো’।
তৌফিক- ই-ইলাহী চৌধুরী এই সভায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি কাজী ইমতিয়াজ হোসেনও আছেন এই প্রতিনিধি দলে।