আনন্দ-কান্নার মাঝে রোহিঙ্গাদের ইফতার

47

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা ধর্মীয় কাজে বেশির ভাগ সময় কাটাচ্ছেন। সিয়াম-সাধনার মাস রমজানকে বেশি গুরুত্ব দেন তারা। শরণার্থী ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা প্রতিদিন সন্ধায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন ইফতার সামগ্রী নিয়ে। কেউ নিজ ঘরে তৈরি ইফতারি দিয়ে আবার কেউ দোকান থেকে কেনা সামগ্রী দিয়ে ইফতার করেন। ইফতারে তাদের প্রধান সামগ্রী ছোলা-মুড়ি।
উখিয়ার বালুখালী ময়নাঘোনা ১১ নং ক্যাম্প’র বাসিন্দা জাহেদুল ইসলাম (৪০) বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত মিয়ানমারে আরাম-আয়েশে ছিলাম। সেখানে পবিত্র রমজান মাসে আমরা ছোলা, লেবুর শরবত ও সেমাই দিয়ে ইফতার করতাম। কিন্তু ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর তাÐবে পালিয়ে এসেছি বাংলাদেশে। এখানে গত রমজানে আমাদের অনেক রোহিঙ্গা ভাই-বোন শুধু পানি দিয়ে ইফতার করেছিল। এখন সেই অভাব রোহিঙ্গাদের মাঝে নেই।অনেক রোহিঙ্গা তাদের ক্যাম্পের অভ্যন্তরে দোকান দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা সব রোহিঙ্গাকে ছোলা, তেল, ডাল, সেমাই, পেঁয়াজ-রসুন চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য দিয়ে সাহায্য করছেন। এ সাহায্য, সহযোগিতার ফলে রোহিঙ্গারা ভাল ভাবে ইফতার করছেন। এছাড়া ছোলা-মুড়িার সাথে আছে লেবুর সরবত।
নাচ্ছিডং এলাকার ইয়াছমিনারা (২১), মিজ্জিরিপাড়ার জুলেখা (২৫), সানজিদা বেগম (২৯) ও মায়েশা (২২) জানান, বর্মীবাহিনীর হাতে তারা প্রত্যেকে তাদের মাকে হারিয়েছেন। রমজান আসলে ইফতারের সময় মাকে মনে পড়ে। তারা এমন হতভাগ্য যে মাতৃভূমি ছেড়ে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে হারিয়ে বুকে পাথর বেঁধে দিন যাপন করছেন। এরপরও এখানে তারা ভালো আছেন। মিয়ানমারের জালিম সরকারের অত্যাচার থেকে বাঁচতে এদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। মিয়ানমারে ভালোভাবে রোজা, সেহরি, ইফতার করতে পারতেন না, এখানে অন্তত সুন্দরভাবে রোজাগুলো পালন করতে পারছেন। পাশাপাশি সেহরি ও ইফতারে সমস্যা নেই। তবে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেকে শুধুমাত্র ছোলা আর মুড়ি দিয়ে ইফতার করছেন।
কুতুপালং ক্যাম্প বাজারে ইফতারি কিনতে আসা রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ নুর (২৮) বলেন, এখানে মিয়ানমারের বিভিন্ন পণ্য দিয়ে পাঁচ মিশালি শরবত পাওয়া যায়। আমরা ক্যাম্পে মা-বোনদের সাথে ইফতার করি। মাঝে মধ্যে দোকানে বন্ধুদের সাথে নিয়ে ইফতার করি। এখানে আমরা অনেক ভাল আছি।
ক্যাম্পের বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, রোহিঙ্গারা বিভিন্ন পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করছেন। তৈরি করা হচ্ছে ইফতারের মজাদার খাবার। এখানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক রোহিঙ্গা ইফতার করছেন। ক্যাম্পে তাদের মাঝে রয়েছে অনাবিল আনন্দ ও বিশ্বাস। আবার অনেকে এ সময় জীবনে ঘটে যাওয়া দুঃসহ স্মৃতি মনে করে ফেলেন দীর্ঘশ্বাস, অনেকে ভেঙে পড়েন কান্নায়। এরপরও জীবন সংগ্রাম থেমে নেই রোহিঙ্গাদের।