আধুনিকতার পাঠ ও আধুনিক কবিতার বিচার

29

ড. আহমেদ মাওলা

‘আধুনিকতা’ নামক কনসেপ্ট বা ধারণা এখনো অনেকের কাছে অস্পষ্ট, ধোঁয়াশা হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের পর বিশ শতকের তিরিশের দশকে এই ধারণা আরো জটিলতর হয়। মাইকেল, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্র কেউ ‘আধুনিকতা’ শব্দটি নিয়ে গর্ব বা বিলাপ করেননি, হয়তো দরকারও হয়নি। পশ্চিমের আলোকপর্ব ও রেনেসাঁসের পরিসরে নিজের ভাবনাগুচ্ছ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন ‘আধুনিকতা’র শোভাযাত্রী এক দল বাঙালি। উনিশ শতকে কলকাতায় ইংরেজ প্রশ্রয়ে এই ‘আধুনিকতা’র জন্ম হয়। ‘আধুনিক শব্দটিতে ইউরোপীয় ভাব এবং রূপক আবহ থাকার কারণে হয়ত বাঙালিদের মধ্যে শব্দটির প্রতি প্রবল টান ও ব্যাপক ভক্তিভাব দেখা যায়। এই টানের মধ্যে ঔপনিবেশিক হীনম্মন্যতার পরিচয় স্পষ্ট। আধুনিকতার চরিত্র বিচার করতে গিয়ে দেবেশ রায় দু’টি স্তর শনাক্ত করেছেন, প্রথম স্তর ঈশ্বরগুপ্ত, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভাষার যে ভঙ্গি গুপ্তকবির শৈলী ভিন্ন হয়ে উঠেছিল তাতে পুরনো বিষয় নিয়ে আর পুরনো কবিতা লেখা সম্ভব হচ্ছিল না। এমনকি তাঁর নীতি বিষয়ের কবিতাতেও ঢুকে যাচ্ছিল তাঁর শ্লেষ আর ব্যঙ্গের ভাষা- ‘মিছে আঁখি! খুদে থাকে ঘুম যায় চড়ে ছটফট করে রাতে বিছানায় পড়ে।’
গুপ্তকবির নতুন শৈলী, নতুন বিষয়, নতুন পর্বের সূচনা-এই আধুনিকতাই সে সময় বাংলা কবিতার অবলম্বনীয় বরণ। মধুসূদনের তিলোত্তমা সম্ভব (১৯৫৯) না ধরলেও ‘মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১)-এ আধুনিকতার আরেক আরম্ভ দেখা যায়। গুপ্তকবির কবিতা আর মাইকেলের কবিতা একই আধুনিকতার আরেক আরম্ভ। গুপ্তকবির কবিতা আর মাইকেলের কবিতা একই আধুনিকতার স্তরান্তর নয়। হয়ত একই আধুনিকতার দুই বিপরীত টান।’…….কম সময়ের ব্যবধানে প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৮) বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫) এক আধুনিকতার স্তরান্তর নয়। হয়ত, একই আধুনিকতার দুই বিপরীত টান। সেই টানের বৈপরীত্যেই বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতা বোনা হয়েছে, তা বলা যাবে না। (দেবেশ, ১৯১৯:৩৫) প্রথম স্তরের আধুনিকতার মধ্যে ছিল মাটিলগ্ন জীবন, ভাষাভঙ্গি অধিক জনসম্পৃক্ত। দ্বিতীয় স্তরে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- এরা রূপান্তরিত জনগোষ্ঠির নতুন গড়ন প্রাপ্ত ইংরেজ উপনিবেশের অনুকূলেই বিকশিত। উপনিবেশিত ইংরেজ রুচিতে বর্ধিত নয়া জামানার মানুষগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক-আমজনতার সঙ্গে এদের দূরত্ব ছিল। এরা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত। এরা কলকাতার এলিট,উচ্চ বর্ণের শ্রেণিভুক্ত ছিল। কলকাতার বাইরে লন্ডন-আমেরিকার সঙ্গে এদর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। অন্যদিকে গ্রামের কৃষক, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তৈরি হয় দূরত্ব এবং বিচ্ছিন্নতা। উনিশ শতকের শেষার্ধ্বে এবং বিশশতকের প্রথমার্ধ্বে কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালির জীবনচর্যা, সংস্কৃতি, রুচি, সৃষ্টিশীল সাহিত্যে উপনিবেশ বাহিত আধুনিকতার দৃশ্যমান বস্তুগত চেহারা রূপ পেতে থাকে। এই আধুনিকতা রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে ‘কল্লোল’ (১৯২৩) কালি কলম (১৯২৬) শনিবারের চিঠি (১৯২৪) প্রগতি (১৯২৭) বিচিত্রা (১৯২৭) পরিচয় (১৯৩১) পূর্বাশা (১৯৩২) কবিতা (১৯৩৫) পত্রিকা ঘিরে তিরিশি কবিদের রচনায় ‘আধুনিকতাবাদী কবিতার পরিণত প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। বঙ্কিমের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগসূত্র বোঝা যায় কিন্তু রবীন্দ্র পরবর্তী লেখকদের? তারা তো স্ব- ঘোষিত রবীন্দ্র- দ্রোহী ছিলেন। তাদের চোখ পশ্চিমের দিকেই ফেরানো ছিলো। পশ্চিম থেকে তারা দু’হাত বাড়িয়ে ঋণ গ্রহণ করেছেন। যদিও পশ্চিম থেকে ঋণ নেয়া শুরু হয় আরো আগে মধুসূদন থেকে প্রথম পাশ্চিত্য ঋণ নেয়া শুরু হয়। তাদের পশ্চিম মুগ্ধতা ছিল নির্বিচার, দ্বিধাহীন, প্রশ্নহীন। বরং তাদের ঋণের মধ্যে ছিল উল্লাস, অনুবাদ, অনুকরণ এবং আমোদ (আইয়ুব, ১৯৯৪:১৫০), পশ্চিমের আধুনিকতাকে বুঝতে হলে, পশ্চিমের দর্শন, বিজ্ঞান, সমাজ, রাজনীতি, সভ্যতার মোটিভ বোঝা দরকার। কিন্তু তিরিশি লেখকদের পশ্চিম মুগ্ধতা ঋণ গ্রহণ ছিলো সংকোচহীন, বেদনাহীন। ফলে স্বদেশের সঙ্গে ঘটে যায় তাদের স্বেচ্ছাকৃত বিচ্ছেদ। সবচেয়ে বড়ো সমস্যা তৈরি করেন ‘আধুনিকতা’ নিয়ে। অবশ্য সে জন্য সব লেখক দায়ী নন, যারা আধুনিকতার অভিনব সবভাষ্য তৈরি করেছেন, তারা ইতিহাসের কাঠগড়ায় অবশ্যই দাঁড়াবেন। আধুনিকতা প্রশ্নে তারা রবীন্দ্র-বিরোধিতাকে যুক্তি হিসেবে সামনে এনেছেন। রবীন্দ্র-বিরোধিতা একটা না-বাচব প্রত্যয়, এই না-প্রত্যয় দিয়ে তারা আধুুনিকতার যাত্রা শুুুুরু করলেন? রবীন্দ্র-বিরোধিতা কি তবে কোনো অজুহাত? তাহলে এই আধুনিকতাকে আমরা কীভাবে দেখবো? তাদের রবীন্দ্র বিরোধিতা ছিল মূলত রবীন্দ্র-অতিক্রমের চেষ্টা। সেটা কী তারা করতে পেরেছেন? আধুনিক কবিতার বড়ো কাব্যকার বুদ্ধদেব বসু যেমন বলেন-‘আধুনিক কবিতা হলো তা, যা বোঝা যায় না, বোঝানো যায় না’ এরকম রোমান্টিক মন্তব্য করেছেন রবীন্দ্রনাথকে মনে রেখেই। এই রকম আবেগ, মুদ্রাদোষকে কী ‘আধুনিকতা’ বলা যায়? তিরিশ-পরবর্তী কবিদের কর্তব্য ছিলো আধুনিকতার পুনবিচার, প্রশ্ন করার কিন্তু কেউ সেই প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। একথা অনস্বীকার্য যে, তিরিশি কবিরা সম্মিলিতভাবে বাংলা কবিতাকে (গদ্যকেও) যে উৎকর্ষে পৌঁছে দিয়েছেন, তা অতুলনীয়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের ‘আনক্রিটিক্যাল মর্ডার্নিজম’ মুগ্ধ পশ্চিমে মনোসমর্পণ ছাড়া আর কিছু নয়। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন-‘বাঙালি অবস্থার বশীভূত, অবস্থা বাঙালির বশীভূত নয়।’ সে দিক থেকে তিরিশি কবিরা তৎকালীন উপনিবেশিত কলকাতায় ‘প্রাপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নিজেদের জন্য অনুকূল পরিসরের সন্ধান করেছেন। প্রতিকূলতার সম্ভবপর কৌশল ও কর্মতৎপরতার অনুকূল করে তোলার কোনো উদ্যোগ নেননি।’ (আজম, ২০২০:১১৮) আধুনিক বাংলা কবিতার মতো এতো জনবিচ্ছিন্ন কবিতা সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনো ভাষায় লেখা হয়নি। তিরিশের কবিরা আরোপিত একমাত্র মতাদর্শ, কাঠিন্য ও দুরুহতাকে এতোাঁ মহিমান্বিত করে দেখেছে। হয়তো এই কারণে যে, বাংলা অঞ্চল সম্ভবত একমাত্র অঞ্চল যেখানে জনসম্পৃক্ততা, জনপ্রিয়তাকে খুবই খারাপ এবং সন্দেহের চোখে দেখা হয়, শিল্পের বিচার অত্যন্ত নিম্ন শ্রেণির করে দেখা হয়। এগুলো আসলে কলোনিয়াল লিগেসির অংশ। তিরিশি কবিরা রবীন্দ্র বিরোধিতায় সজীব কৌতুহল বোধ করেছেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ থেকে মুক্তি পাননি। প্রমাণ, বুদ্ধদেব বসুর কবি রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৬), রবীন্দ্রনাথ : কথাসাহিত্য (১৯৫৫) ইত্যাদি রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করে স্ফুর্তি লাভ করেছে। তিরিশি কবিদের রবীন্দ্র-দ্রোহ শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ভাব ও রূপকের একটা সরলরৈখিক কাঠামো পেয়ে যায় ‘আধুনিক’ শব্দটির মধ্যে। যা ‘মধ্যযুগীয়’ অভিধা থেকে তিরিশি কবিদের পরিত্রাণ বা মুক্তি দেয়। উত্তরকালে ‘আধুনিক’ ‘আধুনিকতা’ ‘আধুনিক কবিতা’ আমাদের সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে গুরুত্ব পেয়ে আসছে এবং ‘আধুনিকতা’ ‘আধুনিক হওয়া’ একটা মোহ তৈরি করে বাঙালি তিরিশি আধুনিক কবিতার অর্জন : নাগরিক, সামাজিক এর পরিণতি ভালো কী মন্দ তত্ত¡ তোলনা করে দেখা যেতে পারে জীবন, বৈশ্বিক দৃষ্টি, কলাকৌশলের নির্ভরতা, উদারনৈতিক চেতনা, জাতীয়তাবাদী চেতনা, মার্কসবাদী চেতনা-এই অর্জন খুব কম নয়। ক্ষতি : আমজনতা, মাটি লগ্নতা, নিজস্ব ঐতিহ্য থেকে আধুনিক কবিতা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শিক্ষিত, নাগরিক, উচ্চকোটি মানুষের উৎপাদন এবং উপভোগের সামগ্রী হয়ে গেছে আধুনিক কবিতা। আমাদের সমালোচনা সাহিত্যে গ্রান্ডন্যারেটিভস্-বুদ্ধদেব বসু, দীপ্তি ত্রিপাঠী, অশ্রুকুমার সিকদার, অরুণ কুমার মখোপাধ্যায়, সৈয়দ আলী আহসান, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখের বিশ্লেষণ আধুনিক কবিতার জনবিচ্ছিন্নতার কোনো আলাপ নেই। তিরিশি কবিরা বাংলা কবিতার নগরপুত্র, ভূমিপুত্র নয়- এই ডিসকোর্স, সজাগ দুঃখ ও দাহ, বেদনার অগ্নি, বিক্ষোভের ঝড় ভেতরে ধারণ করতে না পারলে উপনিবেশিক চিন্তা থেকে বের হবার পথ খুঁজে পাবো কী?

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:
১. দেবেশ রায় : (১৯৯১) উপন্যাস নিয়ে, দে’জ পাবলিকেশন, কলকাতা।
২. মোহাম্মদ আজম (২০২০) কবি ও কবিতার সন্ধানে, কবিতাভবন, চট্টগ্রাম।
৩. সালাহ উদ্দীন আইয়ুব (১৯৯৪) মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।