আদালতে পুলিশের অভিযোগপত্র দাখিল

64

লালখান বাজারে একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনার মামলায় তিনমাসে অভিযোগপত্র দিল খুলশী থানা পুলিশ। অভিযুক্ত দুইজন। গত ৩১ মে মহানগর হাকিম আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আবু হাসনাত মিশু। অভিযুক্ত দুইজন হচ্ছেন, লালখান বাজার হাইলেভেল রোড এলাকায় বসবাসকারী মো. ছিদ্দিকের ছেলে মো. এমরান (২৫) ও বাঘঘোনা এলাকার গার্ড মৃত খোরশেদ আলমের ছেলে মো. আকবর হোসেন। এর মধ্যে মো. এমরান আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তবে আদালতে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন মামলার বাদী আশরাফ উল আলম। অভিযোগপত্রের উপর নারাজি দাখিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী তদন্তের ফলাফল বাদীকে জানানোর পর প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাকে কোনো কিছুই জানাননি তদন্ত কর্মকর্তা। এ কারণে আমি অধিকতর তদন্ত চেয়ে বিচারকের কাছে নারাজি পিটিশন দাখিল করব।
এদিকে দোকানে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আসামির জবানবন্দির সাথে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে থাকা তার তৎপরতা মিলছে না। তাছাড়া আরেক ক্যামেরার ফুটেজে একই সময়ে বেশ কিছু দূরে টহল ডিউটিতে থাকতে দেখা গেছে গার্ড আকবরকে। কিন্তু আসামি তার জবানবন্দিতে দারোয়ান ওই গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে একইসাথে ঢুকেন বলে উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি নাশকতা কি না তদন্ত করে দেখতে পিবিআই অথবা ডিবি পুলিশের চৌকষ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়ার জন্য সম্প্রতি সিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদনও করেছিলেন মামলার বাদী আশরাফুল আলম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার চুড়িহাট্টা-নিমতলী ট্র্যাজেডির মতো হতে পারত লালখান বাজারের এ ঘটনা। লাগিয়ে দেয়া আগুনে যদি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হত তাহলে লালখান বাজার এলাকায় ব্যাপক প্রাণনাশের সম্ভাবনা ছিল। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রæয়ারি রাজধানী ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় প্রাণ হারান ৭১ জন। তারও আগে ৩ জুন ২০১০ পুরান ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলী মহল্লায় অগ্নিকান্ডে প্রাণ হারান ১১৯ জন।
মামলার এজাহারে বাদী আশরাফুল আলম নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, রিজেন্সী গ্যাস হাউজ নামের দোকানটির মালিক দিদারুল আলম মাসুম। দোকানটি পরিচালনা করেন বাদী আশরাফ। ৩১ মার্চ দিনগত রাত ১টা ৪৫ মিনিট থেকে ২টার মধ্যে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতিকারীরা অসৎ উদ্দেশ্যে দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে দোকানে থাকা ৩ লাখ টাকার জিনিসপত্র পুড়ে যায়। দুষ্কৃতিকারীরা নগদ ২ হাজার টাকাও নিয়ে যায় বলে উল্লেখ আছে মামলার এজাহারে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে ৩০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে নেন। মামলাটি বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৮০/৩৪ ধারায় দায়ের করা হয় বলে জানান খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুজ্জামান। এজাহারটি দায়ের করা হয় গত ৫ এপ্রিল। মামলার পর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও পেনড্রাইভ জব্দ করে পুলিশ। ফুটেজে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৫ এপ্রিল লালখান বাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মোহাম্মদ এমরানকে। তাকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সিলিন্ডারের দোকানে ঢুকার কথা স্বীকার করে ক্যাশে ৫০০ টাকা পাওয়ার কথা জানান। এরপর তাকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। ৬ এপ্রিল আসামি মোহাম্মদ এমরানকে মহানগর হাকিম শফি উদ্দিনের আদালতে হাজির করলে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হন। বিচারকের সামনে দেয়া মাত্র ১০ লাইনের সংক্ষিপ্ত ওই স্বীকারোক্তিতে এমরান জানান, ‘আমার নাম মোহাম্মদ এমরান। আমি রেস্টুরেন্ট বয়। সেদিন রাতে সিকিউরিটি আকবর মিয়া আমাকে ডেকে বলে টাকা পয়সার বিষয়ে গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে একটা কাজ আছে। আমি রাজি হই। আকবর আমাকে নিয়ে ওই দোকানে যায়। সেখানে সিসি টিভি ক্যামেরা দেখি। সে তখন দোকানের চালায় ভর দিয়ে কায়দা করে সেখানে নামে। আমি পরে নামি। আমাকে বলে টাকা পয়সা কি আছে খুঁজে দেখার জন্য। আমি কেবল একটা ৫০০ টাকার নোট নিই। আকবর আমাকে একটা গ্যাস লাইট দিয়ে বলে আগুন লাগিয়ে দিতে। আমি প্রথমে মানা করি। পরে সে কাগজ এনে দিয়ে বলে এখনি আগুন ধরা যদি জীবন বাঁচাতে চাস। গার্ড বলে সে রিক্স নেবে কোনো সমস্যা নেই’। ওই দিন মো. এমরান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বেশ কৌশলে। তার জবানবন্দিতে গার্ড আকবর হোসেনের নাম আসায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনে। আকবরকে গত ৯ এপ্রিল লালখান বাজার এলাকা থেকেই গ্রেপ্তার করে খুলশী থানা পুলিশের একটি দল। এরপর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। রিমান্ডে এমরানের মুখোমুখি হয় গার্ড আকবরকে।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমরান লালখান বাজারে তার বাবার হোটেল দেখাশুনা করেন। তার বাবার ২টি হোটেল আছে। আকবর ও এমরান পূর্ব পরিচিত। গার্ড আকবর এমরানকে বলে কাজ আছে টাকা পয়সার বিষয়ে একটা গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে। এমরান বাজি হয়ে যায়। এমরান দোকানের সিলিংয়ের উপর দিয়ে উঠে গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে প্রবেশ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে এরপরের কথাগুলো আদালতে দেয়া এমরানের জবানবন্দির হুবহু মিল রয়েছে।
এ বিষয়ে বাদীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, যে টেবিলের ড্রয়ার থেকে টাকা নেয়ার কথা আসামি বলছে সেখানে কোনো ড্রয়ারই নেই। আর গার্ড আকবর হোসেন একই সময়ে ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। যা সিসি ক্যামেরার ফুটেজে রেকর্ড হয়েছে। এসব কোনো কিছুই আসেনি মামলার তদন্তে।
তথ্য মতে, রিজেন্সি গ্যাস হাউসে দু’টি সিসি ক্যামেরা ছিল দুই রুমে। যে রুমে সারিসারি করে গ্যাস সিলিন্ডার রাখা হয়েছে সেখানে একটি এবং অফিস রুমে একটি। এমরান সিলিন্ডার থাকা রুমে প্রথমে ঢুকে বেশিক্ষণ ছিল না। ক্যামেরায় রেকর্ড হয় ১ মিনিট ২৯ সেকেন্ড। তখন রাত ১ টা ৪১ মিনিট। সেই রুম থেকে আরেক রুমে যাওয়ার আগে সেখানে থাকা সিসি ক্যামেরাটি বন্ধ করে দেয়। এমরান হয়তো চিন্তা করেছিল সিসি ক্যামেরা একটাই আছে ভেতরে। এরপর এমরান অন্যরুমে ঢুকে কাগজ কুড়াতে থাকে। সেখানে পাওয়া পেপার দিয়ে টেবিলের উপরসহ আরো কয়েক জায়গায় আগুন লাগায় হাতে থাকা গ্যাস লাইটার দিয়ে। কিন্তু টেবিলের উপর থাকা দামি ল্যাপটপটিও নেয়ার চেষ্টা করেনি। ওই রুমে রাত ১ টা ৫১ মিনিট পর্যন্ত ছিল এমরান।
এদিকে সিএমপি কমিশনারের কাছে দেয়া বাদীর আবেদনে আরো বলা হয়েছিল, এমরানের জবানবন্দি ও সিসি ক্যামেরা ফুটেজে দৃশ্যায়ন পরস্পর বিরোধী। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানালে তারা নানা কৌশলে এড়িয়ে যান। এ অবস্থায় পিবিআই বা ডিবির মাধ্যমে মামলাটি তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য রেব করা আবশ্যক।
অন্যদিকে জবানবন্দিতে এমরান নিজেকে হোটেল বয় বলেছেন বিচারকের সামনে। কিন্তু সিএমপি কমিশনারের কাছে দেয়া বাদীর লিখিত আবেদন ও পুলিশের তদন্তে এমরান তার বাবার হোটেল দেখাশুনা করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখিত দুই আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী মাহমুদুল হক জানান, অ্যাকচুয়াল কোর্ট বন্ধ থাকায় নারাজি দেয়ার সুযোগ নেই। আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। যখনই আদালত খুলবে তখনই নারাজি দাখিল করা হবে।