আদর্শবান, সৎ ও সংগ্রামী জননেতার প্রতিকৃতি নুরুল আলম চৌধুরী

17

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

সাবেক এমপি, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মরহুম নুরুল আলম চৌধুরীর জীবন একজন আদর্শবান, ত্যাগী, পরিচ্ছন্ন ও পরিশীলিত রাজনীতিকের ধ্রুপদী দৃষ্টান্তস্থল হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। দল ও আদর্শের জন্য এমন অবিচলিত, আপসহীন, সংগ্রামী মনোভাবাপন্ন মানুষ, নিঃস্বার্থপ্রাণ নেতা-যে কোন দলের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ছিলো তাঁর অগাধ আস্থা, নিঃশর্ত ভালোবাসা ও প্রশ্নাতীত আনুগত্য; প্রয়োজন হলে চোখ বন্ধ করে যেকোন মুহূর্তে নির্দ্বিধায় নিজের জীবনটা বিলিয়ে দিতে পারতেন তিনি।
আহা ! নুরুল আলম চৌধুরীরা দল ও দেশের জন্য কত বড় অ্যাসেট ছিলেন, সেটা কিভাবে বুঝাবো আমি বুঝতে পারছি না। আওয়ামী লীগের চরম দুর্দিনে, জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে তাঁর মৃতদেহ মাড়িয়ে যখন ক্ষমতার মসনদে বসার জন্য বেঈমান খোন্দকার মুশতাক বঙ্গভবনে প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ করতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলা, তখন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্রিমিনাল ল’ইয়ার কসবার এমপি সিরাজুল হক (বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের পিতা) ছাড়া একমাত্র চট্টগ্রামের তরুণ এমপি নুরুল আলম চৌধুরীর চোখ ও কণ্ঠ থেকে তখন ক্রোধের অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিলো। সেই বৈরী সময়ে যখন বঙ্গবন্ধুর নামোচ্চারণ নিষিদ্ধ সংলাপে পর্যবসিত হতো, তখন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, নুরুল আলম চৌধুরী, এসএম ইউসুফ, মৌলভী সৈয়দ ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর ন্যায় অঙ্গুলিমেয় ক’জন নেতাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির পতাকা উড্ডীন রেখেছিলেন।
তোমার চরণে প্রণাম জানাই শ্রদ্ধেয় নুরুল আলম ভাই।
নুরুল আলম চৌধুরীরা যেকোন দলের জন্য অহংকার, শ্লাঘার মণিরত্নস্বরূপ ছিলেন। এখন তো আওয়ামী লীগের সুসময়। আওয়ামী লীগ সরকার দু’দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত; আওয়ামী লীগ দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল; কত মন্ত্রী, মেয়র, এমপি আওয়ামী লীগের। সুখের পায়রারা যখন ঘুরঘুর করছে, ছ’দশক পূর্বে নুরুল আলম চৌধুরীরা কী বন্ধুর বৈরি পরিবেশের মধ্যে আওয়ামী রাজনীতির ফুল ফোটাতে কত কষ্টই না করেছেন। একদিকে পুলিশ, অন্যদিকে আইয়ুব-মোনায়েমের গুÐা লাঠিয়াল বাহিনী, তাদের ঠেঙানি, লাঠির গুতো খেয়ে, ছুরি-চাপাতির কোপে জর্জরিত হয়ে আওয়ামী রাজনীতিকে বুকের ধনের মত আগলে রাখতে হয়েছে তাদের। সে কী কঠিন, দুঃসহ পরিস্থিতি। কিন্তু নুরুল আলম চৌধুরী, এসএম ইউসুফ, ইদরিস আলম, আশরাফ খান, মৌলভী সৈয়দ, মহিউদ্দিন চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী, খালেকুজ্জামান, মোছলেম উদ্দিন, প্রশান্ত বড়–য়া, ভবানী, বদন দীদারি, নুর মোহাম্মদ চৌধুরী, শাহ বদিউল আলম, সম্পদ বড়–য়া, জয়নাল আবেদিন প্রধানদের কী বুকের পাটা, কী অসীম সাহস, চারণের মতো তাঁরা ৬ দফার ফেরি করেছেন; কিবরিয়া ও সুলতানুল কবির চৌধুরীর বাহুবলে ছাত্রলীগ ঘাঁটি গাড়তে পেরেছিলো স্কুল-কলেজে।
নুরুল আলম চৌধুরী সম্পর্কে অনেক কথাই বলা যায়। তিনি একজন সফল রাজনীতিবিদ ছিলেন যেমন তিনি সংসদ সদস্য, রাষ্ট্রদূত ব্যাংকের পরিচালনা এবং চা বোর্ডের সদস্য ছিলেন ইত্যাদি; কিন্তু এসব পরিচয়কে ছাপিয়ে তাঁর যে পরিচয়টা বড় করে বলতে ইচ্ছে করে, সেটা হচ্ছে তিনি একজন সফল ও সার্থক রাজনীতিবিদ ছিলেন। রাজনীতির সূত্রই তাঁর এসব প্রাপ্তি। রাজনৈতিক জীবনেও মানুষ যা কিছু পাওয়ার আশা করে তিনি তাঁর জীবনকে বৈষয়িক ব্যাপ্তির নিরিখে হিসেব করলে দেখা যায়, তাঁর জীবনে সব সাফল্য একে একে ধরা দিয়েছিলো। তিনি ভরপুর জীবন যাপন করে যখন আজীবন সংগ্রামী মানুষটি পরম তৃপ্তির সঙ্গে প্রশান্ত মনে পরলোকে প্রস্থান করছেন, তখন তাঁর জীবনে কোন অপ্রাপ্তি ছিলো না।
তবুও নুরুল আলম চৌধুরী সম্পর্কে আসল কথাটা সম্ভবত বলা হলো না। তিনি যে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, সেটাকেই আমি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে গণ্য করতে চাই। মাতৃভূমির উঠানিবেশিক শৃঙ্খলা মুক্তির জন্য, পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করে জাতিকে স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়ে দেবার জন্য কাজ করার সৌভাগ্য সকলের হয় না। নুরুল আলম চৌধুরী সেই বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পেরেছিলেন। একজন ব্যক্তি জীবনের জন্য সেটি একটি বড় ঘটনা।
নুরুল আলম চৌধুরীরা রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন ষাটের দশকের প্রথমভাগে। ১৯৬১ সালে তিনি কলেজে ভর্তি হন। কলেজের ছাত্র হওয়ার পর থেকেই তাঁর চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত হতে থাকে এবং তাঁর রাজনৈতিক বিস্তার পরিপক্ক হয়ে উঠতে থাকে। মুসলিম হাইস্কুলে অধ্যয়নের সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ইদরিস আলম, জহুর আহমদ চৌধুরীর পুত্র শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরীরাও একই সময়ে মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন। যদিও তিনি বয়সে বছরখানের বড়, তথাপি তারা বন্ধু হয়ে যান। ইদরিস আলমের বড় ভাই-ই নুরুল আলম চৌধুরীর সহপাঠী ছিলেন। এই সময় মাধ্যমিক স্কুল ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে একটি ছাত্র আন্দোলন হয়েছিলো। নুরুল আলম চৌধুরী ও ইদরিস আলম ও সাইফুদ্দিন উক্ত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ছাত্র রাজনীতির কর্মী হয়ে ওঠেন। কিন্তু কলেজই তাঁদের রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের প্রকৃত ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
নুরুল আলম চৌধুরী কলেজিয় জীবনে প্রবেশ করতে না করতেই বাংলার আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে আসে। ঈশান কোণে সিঁদুরে মেঘের আনাগোনা আসন্ন বিপদের আশংকা জাগ্রত করে। বস্তুত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য কুখ্যাত বাংলাদেশ এই সময় থেকে ঘন ঘন রাজনৈতিক দুর্যোগেরও সাক্ষী হতে থাকে এবং ষাটের দশক শেষে সত্তরের প্রদোষকালে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক বিবর থেকে নবজাতক বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে। ষাটের দশকের মধ্যভাগেই বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা (১৯৬৬ সাল) কর্মসূচি ঘোষণা করার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বায়ত্তশাসনের কথা প্রবল হয়ে ওঠে। বাঙালি তাতে আত্মসচেতন হয়ে ওঠে এবং জাতিচেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে অচিরেই স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা জেগে ওঠে।
নুরুল আলম চৌধুরী ও তাঁর বন্ধু ইদরিস আলম, এসএম ইউসুফ, আশরাফ খান, মৌলভী সৈয়দ, মহিউদ্দিন চৌধুরী, বদন বদি, নূর মোহাম্মদ চৌধুরী, জয়নাল আবেদিন প্রধান, খায়রুল আনোয়ার প্রমুখ ৬ দফা ভিত্তিক নতুন রাজনীতির ভিত্তিতে জনগণের বিপ্লবী চেতনায় শান দিতে থাকেন।
তাঁরা জনতার কানে কানে ৬ দফার বাণী পৌঁছে দিতে কী কঠিন সংগ্রাম ও কঠোর পরিশ্রমই না করেছেন। ভীষণ বৈরি সময়, প্রতিকূল পরিস্থিতি। পুলিশের ধরপাকড় ও মামলার ভয়, এনএসএফ-এর হামলার আশংকাÑ৬ দফার বাণী তখনো জনতার কানে পৌঁছেনি। কিন্তু জহুর আহমদ চৌধুরী ও ডা. ছৈয়দ রহমান চৌধুরীর পাবলিসিটি টিম তাতে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার পাত্র ছিলেন না। তারা পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে চারণের বেশে বিনা পয়সায় ৬ দফার বড়ি বিক্রি করতে থাকলেন। এইভাবে ৬ দফার আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো, স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিলো। ইদরিস আলম, আশরাফ খান, নুরুল আলম চৌধুরীসহ ৬ দফা প্রচার টিমের প্রায় সব সদস্যই প্রয়াত, শুধু নুর মোহাম্মদ চৌধুরী ও শাহ বদিউল আলম বেঁচে আছেন। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য তাঁদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে জাতির ইতিহাসে।
নুরুল আলম চৌধুরী ১৯৪৫ সালের ২১ মে ফটিকছড়ি থানার চাড়ালিয়া হাট ইউনিয়নের গোপালঘাটা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত চৌধুরী বংশে জন্মগ্রহণ করেন। নুরুল আলম চৌধুরীর পিতার নাম আলহাজ মতিউর রহমান চৌধুরী, মাতার নাম ওয়াজুন্নেসা খাতুন। তাঁরা চার ভাই, সকলেই উচ্চ শিক্ষিত। ভ্রাতাদের মধ্যে প্রথম আহমদ কবির চৌধুরী ছিলেন প্রসিদ্ধ বীমাবিদ, দ্বিতীয় আহমদ দবীর চৌধুরী ছিলেন নামকরা ডাক্তার, তৃতীয় মাহবুবুল আলম চৌধুরী ছিলেন বিদেশি ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত, চতুর্থ নুরুল আলম চৌধুরী। ডা. দবির আহমদের পুত্র ডা. মহসিন চৌধুরী পলাশও চিকিৎসক, তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (পিজি হাসপাতাল) কর্মরত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামের সাবেক সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের পুত্রের সঙ্গে তাঁর কন্যার বিয়ে হয়েছে।
নুরুল আলম চৌধুরী আপসহীন সংগ্রামী নেতা ছিলেন। ছাত্র জীবনেও আপস করেন নি, বৃহত্তর জাতীয় রাজনীতি যখন করছেন, তখনো আদর্শের প্রশ্নে অবিচল, অটল ছিলেন। পঁচাত্তরের দুর্যোগেও দলের প্রতি তাঁর আনুগত্যে এতটুকু চিড় ধরেনি। মিজান চৌধুরী আওয়ামী লীগ ভেঙে উপদল করলে তাঁর বন্ধুদের কেউ কেউ যখন তাঁর সঙ্গে ভিড়ে যান নুরুল আলম চৌধুরী তখনো বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে আঁকড়ে ধরে পড়ে ছিলেন। তাঁর সামনে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে কারো পার পাওয়ার জো ছিলো না। প্রতিপক্ষের মুখের ওপর দাঁতভাঙা জবাব দিতে তাঁর জুড়ি ছিলো না। এমনিই আদর্শবান, সৎ, সাহসী মানুষ ছিলেন নুরুল আলম চৌধুরী।
তিনি বন্ধুবৎসল, আড্ডাপ্রিয়, মজলিশি লোক ছিলেন। আড্ডায়, মজলিশে কখনো কখনো গাম্ভীর্যের মুখোশ পড়ে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতেন। এটা নিছকই পরিহাস করার জন্যই করতেন, পরক্ষণেই হো হো করে হেসে গড়াগড়ি খেতেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নির্বাচনে প্রথমবারের মত স্বতন্ত্র নির্বাচিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত ফটিকছড়ি আসন থেকে তাঁকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে দেশের কনিষ্ঠ সাংসদ হিসেবে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৬ সালেও সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তাঁকে ফটিকছড়ি আসনে মনোনয়ন দেওয়া হলে তিনি আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এসময় তিনি বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য নিযুক্ত হন।
তিন জোটের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নুরুল আলম চৌধুরী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। এসময় তিনি অত্যাচার-নির্যাতনের সম্মুখিন হন।
নুরুল আলম চৌধুরী ওমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি সেখানে তিন বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে স্বীয় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রূপালী ব্যাংকে সরকারের নিযুক্ত পরিচালক হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেন।
নুরুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে পূর্বকোণের একটা স্মৃতি আছে, সেটা বলছি। ১৯৮৬ সালের ১০ ফেব্রæয়ারি পূর্বকোণ প্রকাশিত হয়। আর সে বছরই নুরুল আলম চৌধুরী পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। তো পূর্বকোণের ডিএফপির বিজ্ঞাপনের রেট ও ভলিউম নিয়ে একটা সমস্যা হচ্ছিলো। পূর্বকোণের এই সমস্যাটা কিভাবে সমাধান করা যায়, সেটা নিয়ে আমি নুরুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন, দাঁড়ান, আমি সংসদে বলে দেখি। অধিবেশন শুরু হলে তিনি মনোযোগ আকর্ষণী নোটিশ দিয়ে পূর্বকোণের বিষয়টা তুলে ধরলেন। তথ্যমন্ত্রী উত্তর দিতে বাধ্য হলেন এবং পূর্বকোণের সমস্যাটা সমাধান করে দিলেন।
এমনই সহৃদয় ও সহযোগিতাপরায়ণ মানুষ ছিলেন নুরুল আলম চৌধুরী। অনাগত আগামীতে অনেক রাজনীতিবিদ আসবেন, যাবেন, কিন্তু একজন নুরুল আলম চৌধুরীর আর জন্ম হবে না। তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটা সম্মোহন ছিলো, চরিত্রে দুর্নিবার আকর্ষণ ছিলো, তাঁকে দেখে উপেক্ষা করার বা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় ছিলো না। তাঁর একটা ক্যারিশমা ছিলো, এক অনুপম বর্ণময় জীবন যাপন করে গেলেন তিনি।
নুরুল আলম চৌধুরীর নানার বাড়ি ফটিকছড়ি থানার শাহনগর, নানার নাম সুলতান আহমদ চৌধুরী। তিনি জমিদার ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কাঠের দোতলা বাড়ি ১৯০৩ সালে সুলতান আহমদ চৌধুরীর পিতা নুর আলী চৌধুরী তৈরি করেন। তাঁর বড় ভাই মোখলেছুর রহমান চৌধুরী বার্মায় অগাধ অর্থ রোজগার করেন। তাঁর বড় ছেলে আদালত খান চট্টগ্রামের প্রবাদ পুরুষ। তিনি সম্পর্কে নুরুল আলম চৌধুরীর মামা।
নুরুল আলম চৌধুরীর নানা সুলতান আহমদ চৌধুরীর দুই পুত্র ও সাত কন্যা। পুত্রদ্বয় মোহাম্মদ ইসলাম চৌধুরী ও জাকিরুল হক চৌধুরী।
তাঁর সাতকন্যার প্রথম নুরুল আলম চৌধুরীর মাতা ওয়াজুন্নেসা খাতুন। সুলতান আহমদ চৌধুরীর দ্বিতীয় কন্যা ও নুরুল আলম চৌধুরীর খালা জোলায়খা বেগম চৌধুরীর তিনপুত্র যথাক্রমে এবিএম এজহার মিঞা, অ্যাডভোকেট একেএম এমদাদুল ইসলাম ও এএমএম শহীদুল্লা। অ্যাডভোকেট এমদাদুল ইসলাম প্রথম জীবনে শিক্ষকতা ও পরে চট্টগ্রাম আদালতে আইন পেশায় নিযুক্ত হয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি একাধারে রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, লেখক ও সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। এএমএম শহীদুল্লাহ ষাটের দশকের প্রখ্যাত ছাত্রনেতা। সাপ্তাহিক ‘প্রতিরোধ’ নামে একটি পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করতেন।
নুরুল আলম চৌধুরীর পঞ্চম খালা সায়রা খাতুন-তাঁর একমাত্র পুত্র মোহাম্মদ মুসা চৌধুরী পশ্চিম ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
নুরুল আলম চৌধুরী প্রথিতযশা আইনজীবী অ্যাডভোকেট বদরুল হক খানের একমাত্র কন্যা মনফুজা খাতুন রোজিকে বিয়ে করেন। তাঁদের ২ পুত্র, ১ কন্যা।
জনাব নুরুল আলম চৌধুরীর পুত্র-কন্যারাও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন এবং ইতিমধ্যে ফটিকছড়ি থানা ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন।
নুরুল আলম চৌধুরীর সন্তানদের মধ্যে কন্যা বড়, তাঁর নাম তানজিনা জামান চৌধুরী। তিনি ইউএসটিসি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স কোর্স সম্পন্ন করেছেন। চট্টগ্রামের একটি প্রধান ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ও রাজনৈতিক পরিবারে তাঁর বিয়ে হয়েছে। দেশখ্যাত শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ, সাবেক এমপি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামের সাবেক সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু তাঁর শ্বশুর। জনাব বাবুর কনিষ্ঠ পুত্র জামান গ্রæপ, আরামিট গ্রæপ ও ইউসিবিএল-এর সম্মানিত পরিচালক, দানবীর ও শিল্পপতি আসিফুজ্জামান চৌধুরী জিমি তানজিনার বর। জনাব আসিফুজ্জামান চৌধুরী জিমি পারিবারিক ঐতিহ্যের দ্বারায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর জেঠা বশরুজ্জামান চৌধুরী চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ, তাঁর পিতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামের সদস্য ছিলেন। তাঁর চাচা বশরুজ্জামান চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাৎ বরণ করেন। তাঁর বড় ভাই সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা এবং বাংলাদেশ সরকারের ভূমিমন্ত্রী। জিমির মেজ ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী রণি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক, জামান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ইউসিবিএল নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান।
মরহুম চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র সাবেকুন রাহাত জিসান- বিবিএ, এমবিএ তাসমেনিয়া ইউনিভার্সিটি অব অস্ট্রেলিয়া থেকে এমবিএ পাস করেছেন। তিনি কানাডায় বসবাস করলেও তিনি সেখানে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের নানা কাজকর্মে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা হাসান নাওমী, শ্বশুর চন্দনাইশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাসান, বহুদিন যাবত সপরিবারে কানাডায় থাকেন।
মরহুম চৌধুরী দ্বিতীয় পুত্র কনিষ্ঠ পুত্র হাসিবুন সুহাদ চৌধুরী সাকিব নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ পাস করেছেন। চট্টগ্রাম মহানগরের সুবৃহৎ অ্যাপার্টমেন্ট কাম মার্কেট কমপ্লেক্স ভিআইপি টাওয়ারের স্বত্বাধিকারী জনাব আবুল হোসেনের কন্যাকে সাকিব বিয়ে করেছেন। জনাব হাসিবুন সুহাদ চৌধুরী সাকিব ফটিকছড়ি আওয়ামী লীগ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সদস্য।
নুরুল আলম চৌধুরী ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রয়াত হন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা