আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

10

আবু তালেব বেলাল

আজ ১২ রবিউল আউয়াল, ত্রিভূবন জুড়ে আনন্দের জয়গান! অন্ধকারের সমস্ত পঙ্কিলতা ভেদ করে আরবের মরু প্রান্তরে ৫৭০ সালের ১২ রবিউল আউয়াল স্বর্গীয় প্রভাতে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন মহান প্রতিপালক আল্লাহর প্রিয় হাবিব, মানবতার মুক্তিদূত, সমগ্র সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মহামানব, নবীকুল সরদার হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
রাসুলে পাকের (সা.) মহান আগমনে পৃথিবী আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল। তিনি স্বর্গীয়দূতের বারতা আরবের দিকহারা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। রাসুলের (সা.) আগমনের পর আরবসহ বিশ্বব্যাপী বিরাজমান সমস্ত পাপাচার, অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ-নির্যাতন, মিথ্যা এবং কপটতার মূলোৎপাটন হয়। পৃথিবীতে সৃষ্টি হয় মনুষ্যত্ববোধের জাগরণ।
আরবের হাজারো তরুণের চেয়ে একেবারে আলাদা চালচলন, কথাবার্তা, চিন্তা-চেতনা ও ভাব-গাম্ভীর্যে ‘আল আমীন’ খ্যাতি অর্জন করেন রাসুলে পাক মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ। হিংসা-বিদ্বেষ, কলহ-বিবাদ, খুন-খারাবিতে ব্যস্ত আরববাসীর মধ্যে জন্ম নেওয়া এ মহাপুরুষ যৌবনের সূচনালগ্ন থেকে স্রষ্টার সান্নিধ্য পেতে ব্যাকুল থাকতেন। দয়াল প্রভুর বন্ধু মানবতার কল্যাণ ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। মক্কায় যেখানেই সংঘাত দেখা দিতো, সেখানেই ছুটে যেতেন তিনি, শান্তি আর মানবতার জয়গানে উদ্বুদ্ধ করতেন প্রতিদ্বন্দ্বীদের।
শুধু তাই নয়, যুদ্ধ, সংঘাত, অনাচার ও দস্যুবৃত্তির বিরুদ্ধে মক্কার যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘হিলফ উল ফুজুল’ নামে প্রথম সামাজিক সংগঠন। বয়স তখন ২৫, বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে চাচা তালিবের সাথে গিয়েছিলেন সিরিয়ায়। অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্যে উচ্ছ্বসিত চাচা আবু তালিব। এছাড়া হজরত মুহাম্মদের (সা.) পুত-পবিত্র চরিত্র, বিশ্বস্থতা ও ব্যবসায়িক সাফল্যে তৎকালীন মক্কার নারী উদ্যোক্তা ও আরবের বিধবা মহিয়সী খাদিজাতুল কুবরাকেও দারুণভাবে মুগ্ধ করে। খাদিজাতুল কুবরা মুহাম্মদকে (সা.) বিয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং সরাসরি আলাপ করেন। সম্মতি আদায়ের পর আবু তালিবের মধ্যস্থতায় দু’জনের মধ্যে পবিত্র বিবাহ সম্পন্ন হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এ সময় মহানবীর বয়স ছিল ২৫ বছর আর খাদিজাতুল কুবরার বয়স ছিল চল্লিশ বছর।
বন্যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত পবিত্র কাবা ঘরের সংস্কারের পর হাজরে আসওয়াদ তথা কালোপাথর পুনঃস্থাপন নিয়ে আরব গোত্রগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলো। পবিত্র এ পাথরটিকে যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করে পুণ্যলাভে ধন্য হবে? বিরোধ চরমে, সংঘাত অনিবার্য কিন্তু না দয়াল নবী থাকতে মক্কার পবিত্র মাটি কী আর রক্তাক্ত করা যায়? মক্কার সরদারদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ সংকট নিরসনের দায়িত্ব নেন এবং অত্যন্ত সহজভাবে মক্কার সকল গোত্রের অংশগ্রহণের মাধ্যমে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করে আরব গোত্রগুলোকে অনিবার্য সংঘাত থেকে মুক্তি দেন।
মুহাম্মদের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, তাঁর চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব সমাজকে আলোকিত করছে। তিনি এবার প্রভুর সান্নিধ্য পেতে কোলাহল জীবন থেকে ক্ষণিকের জন্য নির্জনতাকে বেছে নিলেন এবং মক্কা থেকে দুই মাইল দূরে হেরাগুহায় ধ্যানমগ্নতায় মনোনিবেশ করলেন। সেখানেই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় হাবিরের কাছে ফেরেস্তাক‚ল সরদার জিব্রাইলের (আ.) আগমন। আল্লাহর পক্ষ থেকে ঐশীবাণী (কোরআন নাজিল) প্রদান; সর্বশেষ নবীর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে যে মিশন ও কর্তব্য, তা অর্পণ করা হয়। শুরু হয়, নবী জীবনের মূল কার্যক্রম। নানা প্রতিকূলতা, নিজ সম্প্রদায় থেকে নানা জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে অবশেষে হেরাগুহগায় প্রাপ্ত ঐশীজ্ঞানে পুরো বিশ্বকে জয় করেন।
৬৩ বছরের জীবনকালে নবুয়ত প্রকাশের পর মাত্র তেইশ বছরের মধ্যে আরব দেশ ও জাতিকে শান্তি-সমৃদ্ধি ও সভ্য হিসাবে গড়ে তুলেন। মহানবীর ওফাত ৬৩ বছর বয়সে, তারিখ ছিল ১২ রবিউল আউয়াল, সোমবার। অর্থাৎ জন্মের একই দিনে একই তারিখে ওফাত হয়েছিল। ওফাতের পর তাঁর মহান আদর্শকে ধারণ করে খোলাফায়ে রাশেদাসহ মুসলিম খলিফাগণ মাত্র একশত বছরের মধ্যে পৃথিবীময় ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। মুসলিম সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করেন।
আজ এ মহান নবীর পবিত্র বেলাদত শরিফ তথা ঈদে মিলাদুন্নাবী (দ.)। বিশ্বের মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভির্যের মাধ্যমে নানা আনুষ্ঠানিকতায় উদ্যাপন করা হবে। বাংলাদেশ সরকার এবার দিবসটি জাতীয় দিবস হিসাবে গেজেটভুক্ত করেছে। আজ সরকারি ছুটি।
ঈদে মিলাদুন্নাবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী প্রদান করেছেন। তাঁরা মহানবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) আদর্শ অনুসরণে সবার প্রতি আহব্বান জানান।
আজ প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়িত্বশাসিত সব অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় ও তাদের অধিনস্ত জেলা-উপজেলায় ব্যাপক কর্মসূচির পাশাপাশি সব মসজিদ-মাদ্রাসায় মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল আয়োজন করা হবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনও আলোচনা সভা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের কর্মসুচি গ্রহণ করেছে। গণমাধ্যমসমূহ সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়সহ বিশেষ প্রতিবেদন, ক্রোড়পত্র প্রকাশ ও বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে।
চট্টগ্রামসহ দেশের সর্বত্র ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা জসনে-জুলুছ, আলোচনা সভা, সেমিনার, ইসলামি সাংস্কতিক প্রতিযোগিতা, মিলাদ মাহফিল, বিশেষ দোয়া ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে দিবসটি উদ্যাপন করবেন।
আজ বুধবার চট্টগ্রামে আনজুমান-এ রাহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় জসনে জুলছের আয়োজন করা হয়েছে। আওলাদে রাসুল আল্লাম সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ (ম.জি.আ) এবার জুলুসের নেতত্ব দিবেন। এ উপলক্ষে আনজুমান-এ রাহমানিয়া আহমিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট ও গাউসিয়া কমিটি ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।
জুলুসের রুট পরিবর্তন : গাউসিয়া কমিটির যুগ্ম মহাসচিব এড. মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার গতকাল মোবাইলে ফোনে জানান, দেশের পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে প্রশাসনের অনুরোধে জুলুছের নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।
আজ সকাল ৯টায় জুলুছ ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া সংলগ্ন আলমগীর খানকাহ থেকে বের হয়ে বিবিরহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর রেল স্টেশন, ২ নম্বর গেট হয়ে আবারও একই পথে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা মযদানে এসে মিলাদুন্নবী মাহফিল, মিলাদ, কিয়াম, জোহরের নামাজের পর আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে।