আজ জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস দেশ ও জাতি গঠনে গ্রন্থাগারের ভূমিকা

16

তাহমিনা আফ্রাদ শর্মী

প্রাচীনকাল থেকে ই গ্রন্থাগার একটি “সামাজিক প্রতিষ্ঠান” হিসেবে কাজ করে আসছে। আধুনিক সমাজ গঠনে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। গ্রন্থাগার ও সমাজ উভয়ই পরস্পর সংযুক্ত এবং পরস্পর নির্ভরশীল। এটা আমাদের সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রন্থাগারকে একটি সুস্বীকৃত “সামাজিক সংস্থা” হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। পুঞ্জীভূত জ্ঞানকে বই এবং অন্যান্য উপকরণের মাধ্যমে গ্রন্থাগার মানুষের কাছে প্রেরন ও বিতরণ করে থাকে। আর এই সবকিছুর সংগ্রহশালার মূলভিত্তি ই হচ্ছে গ্রন্থাগার।
৫ ফেব্রæয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রতিবছর ৫ ফেব্রæয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয় এবং ২০১৮ সাল থেকে দেশে জাতীয়ভাবে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ ফেব্রæয়ারি কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। তাই এ দিনটিকেই জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এ বছর জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘স্মার্ট গ্রন্থাগার স্মার্ট বাংলাদেশ’। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের লক্ষ্য হচ্ছে- জনগণকে গ্রন্থাগারমুখী করার পাশাপাশি গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। এ দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ গঠনে সকল গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের একযোগে কাজ করার এটা ই প্রধান প্লাটফরম।প্রাচীনকাল থেকেই আমরা দেখে আসছি পৃথিবীর যেখানেই সভ্যতা গড়ে উঠেছে, সেখানেই গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যেদিন থেকে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় উপাত্ত গুলো সংরক্ষণের উপলব্ধি শুরু করেছে সেই দিন থেকে গ্রন্থাগারের মত সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তি শুরু হয়।আর এভাবেই আস্তে আস্তে সমাজে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে।প্রাচীন আসুরবানিপাল, আলেকজান্দ্রিয়া, পেরগামাম, বাগদাদ গ্রন্থাগার হাউস অব উইজড্, ভারতীয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারগুলোও তৎকালীন রাষ্ট্র প্রধানদের পৃষ্ঠপোষকতায় ই গড়ে উঠেছিল।
বাংলাদেশে আমরা চার ধরনের গ্রন্থাগার দেখতে পাই। সেগুলো হলো:
১) জাতীয় গ্রন্থাগার (ঘধঃরড়হধষ খরনৎধৎু)
২) গণগ্রন্থাগার (চঁনষরপ খরনৎধৎু)
৩) শিক্ষায়তন গ্রন্থাগার (অপধফবসরপ খরনৎধৎু)
৪) বিশেষ গ্রন্থাগার (ঝঢ়বপরধষ খরনৎধৎু)
একটি গ্রন্থাগারের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ ও সমাজের চিন্তা, ধারণা এবং অভিব্যক্তি উপলব্ধি করে তথ্য বিতরন ,বিভিন্ন পড়ার উপকরন এক ছাদের নিচে সহজলভ্য করা, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সাহিত্য সংরক্ষণ করা, অধ্যয়ন এবং গবেষণার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া।
গ্রন্থাগার আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা উভয়ই সমর্থন করে এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুবিধাপ্রদান করে থাকে। এটি শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে নি¤েœাক্ত সেবার মাধ্যমে সমাজ গঠনে বিকাশ সাধন করে থাকেঃ
তথ্যের বিতরণ/প্রচার সাধন: বর্তমানে ব্যবহারকারীদের আগ্রহের বিষয় অনুযায়ী সঠিক তথ্য প্রদান করাই গ্রন্থাগারগুলির প্রধান কাজ । নির্দিষ্ট তথ্যের উৎস খুঁজে পেতে ইনফরমেশন সেন্টার বা রেফারেল সেন্টার হিসেবে কাজ করে থাকে।
সংস্কৃতির প্রচার: গ্রন্থাগারগুলি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসাবে কাজ করে । পড়া এবং চিন্তা ক্ষমতার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করতে এবং সৃজনশীল বিকাশে সহায়তা প্রদান করতে সাহায্য করে। বিভিন্ন ধরনের বক্তৃতা, সেমিনার, বই প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক উন্নতিতেও অগ্রণী ভূমিকা প্রদান করে থাকে।
বিনোদন: গ্রন্থাগারগুলো কথাসাহিত্য, ম্যাগাজিন, সংবাদপত্র ইত্যাদি সকল ধরনের বই/ম্যাগাজিন সরবরাহ করে অবসর সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে সাহায্য করে। বিভিন্ন অডিও-ভিজ্যুয়াল সামগ্রীও এখন গ্রন্থাগারে ব্যবহারের জন্য স্থান পাচ্ছে।
জ্ঞান সংরক্ষণ: গ্রন্থাগার এখন আর্কাইভ হিসেবেও কাজ করে, পুরানো এবং দুর্লভ নথিপত্র সংরক্ষণ করে রাখে যাতে পরবর্তী বংশধর তাদের সাহিত্য, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারনা লাভ করতে পারে। বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম গবেষকদের সুবিধার্থে বিভিন্ন ফরম্যাটেও সংরক্ষণ করে থাকে।
গবেষণার কাজে সহায়তা: গ্রন্থাগারগুলি এখন গবেষণা কাজে গবেষকদের সহায়তা প্রদান করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। গবেষণা সামগ্রী যেমন বই, জার্নাল ইত্যাদি সংগ্রহ করা, তথ্যের সহজ প্রবেশাধিকার এবং গবেষণা উপকরণ আবিষ্কারে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে, প্রকাশনা, কপিরাইট সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করে থাকে।
শিক্ষামূলক কর্মসূচির: শিক্ষিত ও সচেতন জাতি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে এই গ্রন্থাগার।গ্রন্থাগার নানারকম শিক্ষামূলক কর্মসূচির আয়োজন করে সমাজ থেকে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূরীভূত করে থাকে। অশিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিত মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে এবং জনসাধারণের ভ্রান্ত ধারনা দুরীভূত করে আধুনিক সমাজ গঠনে গ্রন্থাগার অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
সামাজিক অবক্ষয় রোধ: সামাজিক অবক্ষয় রোধ তথা বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, যৌতুক প্রথা ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে গ্রন্থাগার অবদান রাখে।সমাজের সকল মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে সামাজিক অবক্ষয় দূর করে সমাজে উন্নতর জীবন যাপনের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
বই হচ্ছে সভ্যতার ধারক ও বাহক। বইয়ের পড়ার মাধ্যমেই মানুষ সকল অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করতে পারে। কিছু বই মানুষকে হাসায়, কিছু বই মানুষকে কাদায়,আবার কিছু বই মানুষকে নিয়ে যায় তার কাল্পনিক রাজ্যে। কবি জসীমউদ্দীন এর ভাষায়- “বই আপনাকে অতীত,বর্তম্না, ভবিষ্যৎ সকল কালে নিয়ে যেতে পারে। যে দেশে আপনার কোনোদিন যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, বইয়ের রথে চেপে আপনি অনায়াসে সে দেশে যেতে পারবেন”।
তাই বইকে-ই মানুষের জীবনে নিস্বার্থ বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেবার দরজা সব জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশ এখন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার করার ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে।কেননা গ্রন্থাগারিকগণ উপলব্ধি করতে পারছে স্বয়ংক্রিয় গ্রন্থাগার সেবা প্রদান করা ও স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগার অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশনের কোন বিকল্প নাই।
আমরা বিশ্বের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে তাকালে দেখতে পাই কড়যধ, ঘবএিবহখরন, ঊাবৎমৎববহ, ঝখরগঝ., ইরনষরড়ঃবছ, ঙচঅখঝ, খরনৎধৎরধহ ব্যাপক ভাবে ব্যবহত হচ্ছে। ডিজিটাল লাইব্রেরির ক্ষেত্রে এৎববহংঃড়হব,উঝঢ়ধপব, ঊচৎরহঃং , ঋবফড়ৎধ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ওয়েব পাবলিশিং এর জন্য ডড়ৎফঢ়ৎবংং, উৎঁঢ়ধষ জনপ্রিয়। বাংলাদেশ সেই ক্ষত্রে অনেক পিছিয়ে আছে।তবে বর্তমান সময়ে ডিজিটাল গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও কড়যধ, ঠঁভরহফ, ঝখরসং, উঝঢ়ধপব,এৎববহংঃড়হব উরমরঃধষ খরনৎধৎু ইত্যাদি সফটওয়্যার গুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।ইতিমধ্যে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়ার নিজেদের সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
গ্রন্থাগার অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশনের ফলে গ্রন্থাগারে না গিয়েও ব্যবহারকারীরা সেবা নিতে পারে। বইয়ের বিবিøওগ্রাফিক তথ্য দেখে নিজের পছন্দের বইটি নির্বাচন করতে পারে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারসমূহ ব্যবহার করছে তাদের নিজস্ব ইনস্টিটিউশনাল রিপোজিটরি। দেশের গ্রন্থাগার সেবায় নতুন যুক্ত হয়েছে আরএফআইডি প্রযুক্তি।
বাংলাদেশের বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রন্থাগার সেবা প্রদান করছে।আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কোন গ্রন্থাগার কর্মীর সাহায্য ছাড়াই নিজেরাই বই ইস্যু করে নিতে পারে আবার গ্রন্থাগার বন্ধ থাকলেও বুক ড্রপ বক্সের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা বই জমা দিতে পারেন। গ্রন্থাগার সেবাদানের ক্ষেত্রেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ফোন, ইমেইলের পাশপাশি এখন হোয়াটসএ্যাপ, মেসেন্জার এমনকি লাইভ চ্যাটের মাধ্যমেও গ্রন্থাগার সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে তাদের চাহিদার উপর ভিত্তি করে ওয়েবসাইটে ও ছোট ছোট বিষয়ের ওপর ভিডিও ক্লিপ তৈরি করে দেয়া হচ্ছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় এত সুযোগ সুবিধা থাকার ফলেও আমাদের যুব সমাজ দিনদিন গ্রন্থগার বিমুখ হয়ে পড়ছে। অপসংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। মাদক ও নেশার দিকে ঝুকে পড়ছে। সমাজে দেখা দিচ্ছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। যুব সমাজকে ধ্বংসের এই হাত থেকে বাঁচাতে গ্রন্থাগারমুখী করে তোলতে হবে। জাতি গঠনে সবার আগে প্রয়োজন সুস্থ জীবনধারা। এই সুস্থ জীবনধারার উপলব্ধি ছড়িয়ে দিতে জ্ঞানচর্চার প্রতি নজর দিতে হবে। কেননা জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন এবং সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে একটি জাতির বিকাশ ঘটে।
আর আমাদের এই চেষ্টা পরিবার থেকে ই গড়ে তোলতে হবে। বইমনস্ক জাতি গড়ে তোলতে চাইলে প্রথমে পরিবারের মানুষকে পাঠ অভ্যাসের প্রতি নজর দিতে হবে এবং গ্রন্থাগার মুখী হতে হবে। কেননা গ্রন্থাগার মানুষের মূল্যবোধ তৈরি করা ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই ক্ষেত্রে বিশেষ করে দেশের পাবলিক লাইব্রেরিগুলো ব্যাপক ভূমিকা পালন করে আসছে। সমাজের সকল স্তরের নাগরিকের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই তাদের সংগ্রহশালা গড়ে তোলেছে। তাই আমাদের সুস্থ সমাজ,সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলতে ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মকে গ্রন্থাগারমুখী করে তোলা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন বিকল্প পথ নেই। তাই আসুন সবাই গ্রন্থাগারমুখী হই এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে সাহায্য করি।

লেখক: সহকারি গ্রন্থাগারিক, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম।