আজকের মধ্যে পদত্যাগের নির্দেশ তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে

11

পূর্বদেশ ডেস্ক

বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসৌজন্যমূলক বক্তব্য ও অডিও ফাঁস হয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান পদ হারাচ্ছেন। আজকের (মঙ্গলবার) মধ্যে তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা ওবায়দুল কাদের গতকাল রাতে তাঁর বাসভবনে ডা. মুরাদ হাসানের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সন্ধ্যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে এবং আমি আজ (সোমবার) রাত ৮ টায় প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকে বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছি।
বেশকিছু দিন ধরে বিভিন্ন কারণে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। কখনও বিরোধী দলের নেতাকর্মী নিয়ে আবার কখনওবা চলচ্চিত্র জগতের লোকদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করছেন। তবে এবার আরও বিব্রতকর তথ্য ভেসে ভেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
সম্প্রতি খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তথ্যপ্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানের বক্তব্য সংবলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমান সম্পর্কে ‘অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য করতে শোনা যায়। তাঁর ওই বক্তব্যের সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছিলেন নারী অধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে মুরাদ হাসানকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবিও উঠেছিল।
এরমধ্যে চিত্রনায়িকা মাহির সঙ্গে তথ্যপ্রতিমন্ত্রীর টেলিফোন কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে মাহির উদ্দেশ্যে তাকে ‘অশালীন’ কথা বলতে শোনা গেছে। এই কথোপকথন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা চলছিল।
ফাঁস হওয়া ওই কথোপকথনে তথ্য প্রতিমন্ত্রী মাহিকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সহায়তায় তুলে আনার হুমকি দেন। পুরো বক্তব্যে ‘অশ্লীল’ কিছু শব্দ উচ্চারিত হয়েছে। বিষয়টি এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’।
মুরাদ হাসান সেই ফোনটি করেন চিত্রনায়ক ইমনকে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা এখন কোথায় আছে। পরে এক পর্যায়ে মুরাদ হাসান জানতে চান, তার সাথে কে কে আছে? ইমন তাকে জানান, এক পরিচালকের সঙ্গে তিনি ও মাহিয়া মাহি কথা বলছেন। পরে ফোনটি মাহিকে দেন ইমন। তখন মাহির সঙ্গে অশ্লীল ভাষায় কথা বলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। সেই সঙ্গে মাহিকে নিয়ে হোটেল সোনারগাঁওয়ে দেখা করতে বলেন প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। চিত্রনায়ক ইমনকে তিনি বলেন ঘাড় ধরে যেন মাহিকে তার কাছে নিয়ে যান।
ভাইরাল হওয়া ক্লিপটি তার স্বীকার করে ইমন বলেন, ফাঁস হওয়া ফোনালাপটি সত্যি। তবে এটি সা¤প্রতিক নয়, বছর দুই আগের।
এই পরিস্থিতিতে রাতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তথ্যপ্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদকে পদত্যাগ করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা জানালেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আজ (সোমবার) সন্ধ্যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে এবং আমি রাত ৮টায় প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকে বার্তাটি পৌঁছে দিই।’

সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবো : আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, আমি পুরোপুরি তার বক্তব্য শুনিনি। তবে যতটুকু শুনেছি, তাতে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য, এই ধরনের বক্তব্য কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়। যে অডিওগুলো এসেছে এগুলো যদি সত্যি হয়, বানানো না হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা সুপারিশ করবো।

প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি ফখরুলের : গতকাল দুপুরে এক কর্মসূচিতে বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী, তা জানতে চেয়েছিলেন। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানের করা মন্তব্যকে ‘হীন রাজনৈতিক দূরভিসন্ধিমূলক, নারী ও বর্ণবিদ্বেষী, বিকৃত’ বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির মহাসচিব। সেইসঙ্গে অবিলম্বে তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জনসমক্ষে ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করার আহব্বান জানান তিনি। মির্জা ফখরুল বলেন, শুনেছি তথ্য প্রতিমন্ত্রী নাকি এক সময় ছাত্রদল করতো। দুঃখের কথা, দুর্ভাগ্যের কথা। আগে সে ছাত্রদল করতো। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রচার সম্পাদক ছিলো। পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগে যোগ দিয়েছে। ধিক্কার দেই আমি তাকে।

৪০ নারী অধিকার কর্মীর প্রতিক্রিয়া : এদিকে জাইমা রহমানকে নিয়ে বক্তব্যের জন্য তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের পদত্যাগ দাবি করে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়া হচ্ছিল। বেসরকারি সংগঠন নারীপক্ষ এবং ৪০ নারী অধিকার কর্মী আলাদা বিবৃতিতে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। নারীপক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার দাবি করেন যে তারা নারীবান্ধব। নারীর প্রতি ন্যূনতম সম্মান রেখে কথা বলতে পারেন না সেই ব্যক্তি তারপরও কি করে পদে বহাল থাকেন? এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নারীপক্ষের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে আইনি ব্যবস্থা : তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকে অবিলম্বে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে করা অবমাননাকর বক্তব্য প্রত্যাহার করে জাতির সামনে ক্ষমা চাওয়ার আহব্বান জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (এসসিবিএ) সম্পাদক মো. রুহুল কুদ্দুস।
গতকাল সোমবার এসসিবিএ হলে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ দাবি জানান। রুহুল কুদ্দুস বলেন, মুরাদ হাসান বিভিন্ন অবমাননাকর মন্তব্য ও কর্মকান্ড করে তার সাংবিধানিক শপথ লঙ্ঘন করেছেন, যা জাতির জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি যদি তার মন্তব্য প্রত্যাহার না করেন এবং ক্ষমা না চান তবে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মুরাদ হাসান যা বলেছেন : এর আগেও নানা রকম বক্তব্যের জন্য আলোচনা উঠে এসেছেন জামালপুর-৪ আসনের এমপি ডা. মুরাদ হাসান। তিনি বলেন, তিনি বক্তব্য দেয়ার আগে তাকে ‘নোংরা ভাষায়’ আক্রমণ করে কথা বলেছেন তারেক রহমানের কন্যা।
আমার মেয়ের বয়সের চেয়ে সে এক বছরের বড়। আমার কন্যার মতো বয়সী হয়ে যে নোংরা ভাষায় আমাকে নিয়ে ট্রল করেছে, সেটা তো কুচিন্তনীয়। এটা আমার কাছে খুব দুঃখজনক মনে হয়েছে। তার সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমের অনেক ছবি আমার কাছে চলে এসেছে।
আর টকশোতে হাজির হয়ে বিএনপি নেত্রী সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়াকে আক্রমণ করে মন্তব্য করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনি যদি ওই টকশোটা দেখেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন আমি কেন বলেছি।
আমি একজন চিকিৎসক। সেই হিসাবে তার সম্পর্কে আমার যে অবজারভেশন, সেটা আমি বলেছি। সেটা ভুল হলে আমি দুঃখিত।
যেসব বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, সেগুলোকে ভুল বলে স্বীকার করেন কি না কিংবা প্রত্যাহার করবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি আরো বলেন, তার বক্তব্য নিয়ে নানারকম সমালোচনা হলেও তার ওপর দল বা সরকারের তরফ থেকে বক্তব্য প্রত্যাহারের কোন চাপ নেই।

মুখ খুললেন মাহি : সম্প্রতি ফাঁস হওয়া অডিও সংলাপ নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি। এই অডিওকলে একটি পুরুষকণ্ঠ তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের বলে দাবি করা হচ্ছে। মক্কায় ওমরাহ পালন করতে যাওয়া মাহি সেখান থেকেই এক ভিডিও বার্তায় নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানান। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সৌদি আরব থেকে তিনি ভিডিওবার্তাটি নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে পোস্ট করেন।
মাহি বলেন, আমার আসলে সেদিন আদৌ বলার কোনো ভাষা ছিল না। সেজন্য আমি প্রতিবাদ করিনি। আমি নিজের মতো আমার মনে হয়েছে, আমার পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিৎ। আমি চুপ থেকেছি, পাশ কাটিয়ে গিয়েছি। ঠিক দুই বছর আগের একটা ঘটনা ছিল এবং বরাবরে মতো আমি আল্লাহর কাছে বলি, আল্লাহ আমি কষ্ট পেয়েছি। যার মাধ্যমে আমি কষ্ট পেয়েছি, কোনো না কোনোভাবে তার রেজাল্টটা তিনি পেয়েছেন। এটা প্রমাণিত।
মাহি ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের সঙ্গে দুই বছর আগে তার ফোনালাপ হয়েছিল।
চিকিৎসাশাস্ত্রের ডিগ্রিধারী মুরাদ হাসান জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী, মেস্টা ও তিতপল্যা) আসন থেকে প্রথমবার সংসদে যান নবম সংসদে। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে দ্বিতীয়বার জয়ী হওয়ার পর তাকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ দফায় সরকার গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় ২০১৯ সালের মে মাসে স্বাস্থ্য থেকে সরিয়ে মুরাদকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী করা হয়।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় ২০০০ সালে ছাত্রলীগের কলেজ শাখার সভাপতি হন মুরাদ হাসান। তিন বছর পর আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পান।
৪৭ বছর বয়সী মুরাদ তার নিজের এলাকা জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের ‘স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক’। তার বাবা অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার ছিলেন জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।