আগ্রাবাদ টিএন্ডটি উচ্চ বিদ্যালয় এলামনাইদের প্রাণোচ্ছ্বল মিলনমেলা

65

“আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে/ তাই হেরি তায় সকল খানে। আছে সে নয়নতারায় আলোকধারায়, তাই না হারায়— ওগো, তাই দেখি তায় যেথায় সেথায়, তাকাই আমি যে দিক-পানে।” সেই প্রানের মানুষ শৈশবের হারিয়ে যাওয়া স্কুল বন্ধুদের আবার খুঁজে পাওয়ার নেশায় গত ২৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল আগ্রাবাদ টিএন্ডটি উচ্চ বিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন আয়োজিত দিনব্যাপী প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ণিল মিলন উৎসব। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম আগ্রাবাদের সাফল্য আর গৌরবের বাতিঘর আগ্রাবাদ টিএন্ডটি উচ্চ বিদ্যালয়।
২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯। এলামনাইদের অনুষ্ঠান ছিল ফেলে আসা সেই প্রিয় স্কুল প্রাঙ্গনে। পৌষের হিম হিম ঠান্ডায় কুয়াশা জড়ানো সেদিনের সেই সকালে আগ্রাবাদ টিএন্ডটি কলোনি সহ আশেপাশে যে প্রান্তেই চোখ গেছে, দেখা গেছে শুধুই এলামনাই পরিবারের প্রিয় সতীর্থদের মুখ। সকালের অনুষ্ঠান, উৎসব আর র্যা লি শুরুর আগে পুরো স্কুল প্রাঙ্গন যেন পেয়েছিল অন্য এক রুপ! রংয়ে-ঢংয়ে, আড্ডাবাজি, হুল্লোড় আর একসাথে বন্ধুদের পেয়ে সকাল থেকেই নষ্টালজিক ছিলেন সকলে! তাঁদের এই এক সাথে হারানো বন্ধুকে কাছে পাওয়ার আনন্দ আরও রঙ্গীন করেছে এলামনাইদের টি-শার্ট আর মেয়েদের উজ্জ্বল শাড়ি! এলামনাই এসোসিয়েশনের উদ্যোগে এলামনাইদের লেখা এবং তাঁদের পরিচিতিতে আর কিছু এলামনাই’র অক্লান্ত পরিশ্রম ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ম্যাগাজিন “স্মৃতি কথা”।
আজ থেকে প্রায় ৪৬ বছর আগে টিএন্ডটি উচ্চ বিদ্যালয় নামে যে বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু, তা আজ এক বিশাল মহিরুহ! এই দীর্ঘ ৪৬ বছরের পথ চলায় আজ স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ ছাড়িয়ে সারা বিশ্বেও সমুজ্জ্বল। এলামনাইদের কত শত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এর প্রতিটি পরতে পরতে। আনন্দ-দুঃখ, রাগ, মান-অভিমান, ক্ষোভ, তৃপ্তি, আশা-নিরাশা, সাফল্য-ব্যার্থতা, আইসক্রিম, চটপটির ডালি, বরফওয়ালা, টেবিলের নিচে লুকোনো খেলার সরঞ্জাম, তখনকার স্যারদের পান্ডিত্য, বিখ্যাত কিল, চিকন বেতের মার, স্কেলের বাড়ি, স্কুল পালানো আর এর মাঝেই পড়তে পড়তে একটু একটু করে বড় হওয়া, জীবনকে বুঝতে শেখা- এমন আরো কত কী মিশিয়ে প্রিয় স্কুল। সেইসব স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ভীষন আবেগ আর উত্তেজনায় শিহরিত আর নস্টালজিক হয়েছেন এলামনাইগন।
বর্ণাঢ্য র্যাহলি, স্মৃতিচারণ আর জমজমাট গানে আনন্দ বহুগুন; ভোরের আলো ফুটতেই নগরীর মূল আগ্রাবাদ বাদামতলি সড়ক যেন থমকে দাড়িয়েছিল! স্কুল প্রাঙ্গন হতে বিচিত্র রঙ আর ঢংয়ে, বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের গায়ে বর্ণিল টি শার্ট , বাঁশি আর বাহারি বিভিন্ন উপকরনে বের হওয়া র্যা লি নজর কেড়েছে পুরো আগ্রাবাদবাসীর। র্যা লি শেষে দিনভর স্কুল প্রাঙ্গনেই বিভিন্ন ব্যাচের স্মৃতিচারণা আর গানে সতীর্থরা মেতে উঠে নির্মল আড্ডায়।
আর্থিক ও নানা প্রতিকূলতার মাঝেও উৎসবকে সফল ও প্রানবন্ত করতে এলামনাইদের অদম্য ইচ্ছা শক্তি ও ঐকান্তিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন ব্যাচ বিশেষ করে বিদ্যালয়ের ’৮৪ ব্যাচের নাসিরুল হক, শালিমার আক্তার স্বপ্না ও মো. মিজানুর রহমান, ’৮৬ ব্যাচের মো. মঞ্জুর ও মো. তসলিম, ’৮৭ ব্যাচের সৈয়দ ছবিউল আলম ও কোরেশি, ’৯০ ব্যাচের জাহেদ সরওয়ার, মো. সাখাওয়াত ও ফরহাদ হোসেন, ’৯১ ব্যাচের হেলাল সরকার, সহীদুল ইসলাম টিপু ও আবদুল জলিল মিলন, ’৯২ ব্যাচের সৈয়দ মুরাদুর রহমান ও টিটু, ’৯৩ ব্যাচের জসিম উদ্দিন, ’৯৪ ব্যাচের মো. নাদিম পাটওয়ারী ও মো. সেলিম, ’৯৬ ব্যাচের আজিজুর রহমান আজিজ, হারুনুর রশিদ রবি, মো. ইলিয়াস ও জালাল উদ্দিন পিন্টু, ’৯৮ ব্যাচের মিজান, ২০০০ ব্যাচের কিরন ও হাসিনা, ’০১ ব্যাচের মো. বিল্লাল সহ এমন আরও অনেক এলামনাইদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় সেই সাথে বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকদের উজাড় করা ভালোবাসায় এমন সার্থক আয়োজন সম্ভব হয়েছে বলে জানান আয়োজক কমিটি। আবেগ বুঝাতে গিয়ে ’৯২ ব্যাচের এলামনাই মেহেদি হাসান রুবেল ও মাঈনুল হক মিঠু বলেন, “আমাদের সেই সময়ে মোবাইল/ ফেইসবুক হয়তো ছিলো না, তাই সেলফি তোলা বা ফেবুতে আলোচনাও ছিলো না, কিন্তু প্রানের আবেগ আর নির্মল আড্ডা কতটা প্রানবন্ত ছিলো তা আজ আবার অনুভব করছি।” পুরনো সেইসব দিনের কথা বলতে গিয়ে ’৯৯ ব্যাচের এলামনাই ও আয়োজকদের একজন মো. নুর হাকিক আফ্রেদি রিংকু বলেন, “জীবনের চলতি পথে আমরা অনেকের সাথেই সম্পর্কে/ বন্ধুত্বে জড়াই, কিন্তু সব সম্পর্ক/ বন্ধুত্বই জীবনে যৌবন আনতে পারে না, যতটা এনে দেয় স্কুলের বন্ধুরা! আর তাইতো বন্ধুদের কাছে পেয়ে আমরা আজ ভীষন নষ্টালজিক।”
টিএন্ডটি স্কুল এলামনাই কর্তৃপক্ষের আয়োজনটি ছিল সত্যিকার অর্থেই মনে রাখার মতো, অনেক গোছানো আর প্রানবন্ত। সকলেই নিশ্চিত, প্রানের উৎসব হয়তো ফুরালো, কিন্তু স্কুল এলামনাইদের মাঝে মিলনের যে বান এসেছে তাতো সহজে ফুরোবার নয়! আবার দেখা হবে আর ভুলে যাওয়া নয়, এই কামনায় অশ্রæ সজল চোখে সমাপ্তি ঘটে অসাধারন এক মিলনোৎসব। আমাদের বিশ্বাস, এলামনাই এসোসিয়েশন আগামী দিনে আরও এগুবে ইন শা আল্লাহ। কারন, এগিয়ে যাওয়ার আর বিকশিত হওয়ার উপাদানগুলো এলামনাইদের মাঝে প্রবলভাবেই উপস্থিত। ধন্যবাদ ও ভালোবাসা নিরবে বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করে যাওয়া এলামনাইদের মাঝে সেই সব সংগঠকদের প্রতি।
লেখক : বিতার্কিক ও কলাম লেখক