আগেভাগেই জাতীয় নির্বাচনমুখী আ.লীগ

30

রাহুল দাশ নয়ন

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৩ সালের শেষে কিংবা ২০২৪ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেসময়কে টার্গেট হিসেবে ধরেই অনেকটা আগেভাগেই সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করাচ্ছে আওয়ামী লীগ। দল ও সরকার পৃথক রাখার ফর্মূলার প্রতিফলন এবারো ঘটাতে চাইছে দলটি। দেশব্যাপী তৃণমূলে চলমান সম্মেলনের সেই দিকটি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইশতেহার তৈরির ঘোষণার মধ্যদিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতির বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। প্রস্তুতি হিসেবে সংসদ সদস্য ও জেলার শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বিভাগীয় কর্মশালাও শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দলীয়ভাবে এবং বিভিন্ন সংস্থা দিয়ে জাতীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দিকেও নজর রাখছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।
গত মঙ্গলবার সংসদ ভবনের এলডি হলে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রামের বিভাগীয় কর্মশালায় উপস্থিত মন্ত্রী, এমপি ও জেলার নেতারা জনমুখী কর্মকান্ডে দলকে আরো সম্পৃক্ত হওয়ার কথা বলেছেন। তাঁরা বলেন, পুরোদমে আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। এরমধ্যে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে গুছিয়ে নিতে হবে। যেখানে আওয়ামী লীগের দুর্বলতা আছে সেখানে সংগঠনের নেতাদের আরো মনোযোগী হওয়ার কথা কর্মশালায় বলা হয়।
কর্মশালায় বক্তব্যকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সম্মেলন করে দলকে সুসংগঠিত করতে হবে। আওয়ামী লীগে সুবিধাবাদীদের কোনো স্থান নেই। তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই আওয়ামী লীগের প্রাণ। তাই সৎ, দক্ষ এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে। আগামী নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে উন্নয়নের কথা বেশি বেশি প্রচার করতে হবে।’
এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনে ইশতেহারে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা হালনাগাদের নির্দেশনা দেন। বিশেষ করে ইশতেহারে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে জোর দেয়ার কথা বলা হয়।
জানা যায়, টানা চতুর্থবারের মতো জয় পেতে আগামী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। টানা ক্ষমতায় থেকে দেশের ধারাবাহিক উন্নয়নের এই সময়ে বিচ্যুতে হওয়ার পক্ষে নেই দলটি। জনগণের চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়েই আবারো ক্ষমতায় যেতে খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। নিজ দলের বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী যারা তাঁদের বিষয়ে গোপন জরিপ চালানো হচ্ছে। এমনকি সেসব প্রার্থীদের দলীয় কর্মকাÐের দিকেও নজর রাখছে হাইকমান্ড। ক্ষমতাসীন দলটি আগামীতে প্রার্থী হিসেবে ক্লিন ইমেজধারী ত্যাগী, শিক্ষিত ও স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী তরুণ নেতাদেরকেই পেতে চাইছে। বরাবরের মতো এবারো দুই ক্যাটাগরীতে প্রার্থী বাছাইয়ের চিন্তাভাবনা করছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াতের ঘাঁটি নিয়ে ভিন্ন চিন্তাধারাও আছে দলটির। সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উত্থানকে গুরুত্বের সাথে নিয়েই জাতীয় নির্বাচনের কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
দলের শক্তি পরখ করতে চলমান ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচনকে গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন না দিয়ে সুশৃঙ্খল দল গঠনের পক্ষেই জনমত বাড়াতে চায় আওয়ামী লীগ। জনগণের আস্থা হারালে কঠিন মূল্য দিতে হবে। এমন অবস্থায় বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় বিতর্কিত ব্যক্তিদের পরিবর্তে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাসম্পন্ন ইমেজধারী নেতাদের দিকেই দৃষ্টি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যেসব নেতা বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম কেন্দ্রে পাঠাবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।
ইতোমধ্যে সারাদেশের মতো চট্টগ্রামের মেয়াদোত্তীর্ণ সবক’টি উপজেলায় সম্মেলনের তাগাদা দিয়েছে কেন্দ্র। আগামী মার্চের মধ্যে এসব উপজেলার সম্মেলন শেষ করে দ্রুত জেলা ও মহানগর কমিটি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটিও গঠন করতে বলা হয়েছে। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিভাগের কর্মশালার পর আগামীতে একই বিভাগের আওতাধীন সবক’টি উপজেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে দু’দিনব্যাপী আরেকটি কর্মশালা আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলেছেন চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা।
দলীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় থাকায় সবখানেই স্থবিরতা বেড়েছে। নেতারা বিভিন্নভাবে বিত্তশালী হওয়ার দিকেই ঝুঁকে পড়েছে। একশ্রেণীর নেতারা ক্ষমতার চেয়ারকে ‘টাকা কামানোর মেশিন’ বানিয়েছেন। যে কারণে দলের মনোনয়ন ভাগিয়ে নিতে দেদারছে টাকা বিলিয়ে যাচ্ছেন। সংগঠনে গ্রæপিং বেড়েছে কয়েকগুণ। ক্ষমতার স্বাদ নেয়ার দ্বন্দ্বে প্রতিটি ইউনিটেই বেড়েছে কোন্দল। সংগঠনের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। ‘মাইম্যান’ রাজনীতিতেই বেশি মনযোগী হয়েছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। দলের উপর ভর করেছে আমলাদের চাপ। একদম তৃণমূল পর্যায়ে সৃষ্ট এমন জটিলতা নিরসন করা না গেলে আগামী নির্বাচনে মাসূল দিতে হবে আওয়ামী লীগকে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনমুখী দল হিসেবে পরিচিত। প্রতিবারের মতো এবারো আওয়ামী লীগ আগেভাগেই নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে তৃণমূলকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দল মিটাতে কেন্দ্রের কঠোর নির্দেশনা আছে। আওয়ামী লীগ সরকার দেশব্যাপী যে উন্নয়ন করেছে তা জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দিতে দলের নেতাকর্মীদের ভূমিকা রাখতে হবে। নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে আগামীতে আবারও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে।’