আগুন লাগলে ‘উৎসুক জনতা’ ঠেকাতে করণীয় কী

6

পূর্বদেশ ডেস্ক

রাজধানীর বেইলি রোডে বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে আগুন লাগার পর ভিড়ের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কাজ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কেবল ঘটনাস্থলেই নয়, আগুনের ঘটনায় হতাহতদের বহন করা অ্যাম্বুলেন্স যখন গভীর রাতে হাসপাতালে পৌঁছে, সেখানে জরুরি বিভাগে প্রবেশ করতে সংশ্লিষ্টদের হিমশিম খেতে হয়েছে। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশের সুবিধার্থে জরুরি বিভাগের বাইরের গেটে থাকা অস্থায়ী দোকানগুলো পুলিশ ও আনসার সদস্যরা তুলে দিয়েও ‘উৎসুক মানুষের’ ভিড়ে অ্যাম্বুলেন্সকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে অনেকক্ষণ। এ সময় আনসার সদস্যরা হ্যান্ড মাইকে বারবার সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও জনতা তাতে গুরুত্ব দেয়নি।
সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কয়েকটি জায়গায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের আগুন নেভাতে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ‘উৎসুক জনতা’। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও তেমন তৎপর দেখা যায় না। দাঁড়িয়ে ভিডিও করা, সাহায্য করার আগ্রহ থেকে ভিড় জমানো- এ যেনো স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু মূল কাজটি যে ব্যাহত হচ্ছে, তা কারোর চিন্তাতে নেই।
ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে- ভোর, সকাল কিংবা মধ্যরাত যখনই আগুনের ঘটনা ঘটে, তার পরপরই উৎসুক জনতার ভিড়ে আগুন নেভানোর স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। আগুন লাগার পর কত দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, সেদিকেই বেশি তৎপর থাকেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হয় আগুন নেভানোর কাজ। ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে মাইকে কিংবা স্থানীয় ব্যক্তিরা, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উৎসুক জনতাকে ভিড় না করতে বললেও তারা শোনে না।
সম্প্রতি বেইলি রোডের ঘটনায় দেখা যায়, আগুনের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবনটির সামনে ভিড় করতে শুরু করেন ভেতরে আটকে পড়াদের স্বজনরা। এসময় উৎসুক মানুষের অতিরিক্ত ভিড়ে আগুন নেভানোর কাজ ব্যাহত হয় বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ের কারণে উদ্ধার কাজ বিঘ্নিত হওয়ায় এক পর্যায়ে ভবনটির সামনে থেকে সবাইকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেও দেখা গেছে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের।
কেন সরছেন না প্রশ্নে একদল তরুণ বলেন, যদি আমরা কোনো কাজে আসি, সেজন্যই ছুটে এসেছি। আমাদের আশেপাশে সবাই কী হচ্ছে দেখতে এসেছে। এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভিড় ঠেলে ঘটনাস্থলে কাজ করতে ফায়ার ফাইটারদের সমস্যা হয় মনে করেন কিনা, প্রশ্নে এক তরুণ বলেন, তারা ঠিকমতো কাজ করছে কিনা সেটাও দেখে রাখার বিষয় আছে। আর যারা এখানে আসেনি, তাদের ভিডিও’র মাধ্যমে বিষয়টা দেখানোর চেষ্টাও করছেন অনেকে, কেউ কাউকে বিরক্ত করছে না। খবর বাংলা ট্রিবিউনের
ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট একটা সায়েন্স উল্লেখ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় উৎসুক জনতা দুরকমের হয়ে থাকে। এক হলো, ঘটনার পরপর আশেপাশের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তারা দাঁড়িয়ে থেকে পরিস্থিতি দেখতে থাকে। আরেক ধরন হলো, আটকে পড়াদের আত্মীয়স্বজন। যতজন স্বজন আশেপাশে থাকেন- একজনের জন্য সবাই হাজির হবেন, এটাই স্বাভাবিক। পুলিশ দিয়ে তাদের ঠেকানো যাবে না। এটা একটা ব্যবস্থাপনার দাবি রাখে। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে যদি একটি দক্ষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ করে দেওয়া যায়, যেখানে মানুষ সব তথ্য পাবে। তাহলে আর উটকো ক্রাউড হবে না। ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট শিখতে হয়’।
তিনি বলেন, ‘আমাদের নগর-স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা কম না। তারা কোথায়। আবার হাসপাতালের ভিড়ের কথা যদি বলি— আহতরা কিছু না কিছু কথাতো বলতে পারে। হাসপাতালে কে আসলো, কোথায় তাদের রাখা হয়েছে, এসব যদি মাইকে ঘোষণা করা হয় কোন বুথ থেকে, তাহলেই অযথা ভিড় কমে। এধরনের ঘটনায় কেবল জনতাকে দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই’।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রেসপন্স টাইম যদি ফায়ার সার্ভিসের রেসপন্স টাইমের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়- তাহলে ভিড় সামলাতে সুবিধা হবে উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক (চট্টগ্রাম) দিনমনি শর্মা বলেন, ‘যেকোনো দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় যাওয়ার আগে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাই। তারা সেখানে পৌঁছানোর আগে ভিড় হয়ে যাওয়ায় আমাদের কাজ ব্যাহত হয়। এরকম প্রায়ই হয়ে থাকে। আমরা আগুন নেভানো, উদ্ধারের দায়িত্ব পালন করি। ভিড় সামলানোর দায়িত্ব আমাদের নয়’।
যে লক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাদের কাজে লাগানো সম্ভব কিনা- প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তারাতো নিজেদের উদ্যোগে আসে। তাদেরকে আনার ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে তারা ঘটনা জানার পরে নিজ উদ্যোগে আসতে সময় লাগে’।
তবে ঢাকার মতো যানজটের শহরে ফায়ার সার্ভিসের আসতে কিছুটা সময় লাগে উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘উৎসুক জনতাকে শৃঙ্খলায় আনতে পুলিশ সচেষ্ট থাকে। ঘটনাস্থলে অশিক্ষিত, শিক্ষিত নানা ধরনের মানুষ আসেন। তাদেরকে সচেতন হতে হবে। যেখানে আমার করণীয় নেই, সেখানে কেবল কৌত‚হলবশত ভিড় বাড়ানো ঠিক না, সেটা বুঝতে হবে। সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। শৃঙ্খলায় রাখতে পুলিশ দুর্ঘটনাস্থলে ব্যারিকেড দেয়, হিউম্যান চেইন তৈরি করে ঘিরে রাখতে চেষ্টা করে। মাইক দিয়ে ভিড় দূরে সরানো হয়। আবার অনেকে আপনজনের জন্যও আসে। ফলে সেই সতর্কতাও রাখতে হয়। মানুষকে সচেতন হতে হবে’।