আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডের মধ্যেই লকডাউনে শিথিলতা সতর্ক হতে হবে সকলকে

6

রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙছে করোনা ভাইরাস। আগ্রাসী ভূমিকায় এ মহামারিতে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার দুটিই বেড়ে চলছে। রবিবার ও সোমবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে মৃত্যু হয়েছে যথাক্রমে ২৩০ ও ২২০ জন। অপরদিকে সংক্রমিত হয়েছে প্রায় ১৪ হাজারের কাছাকাছি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, গত রবিবার সকাল ৮টার আগের ২৪ ঘণ্টায় ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৮৭৪ জনের এবং মৃত্যু হয়েছে ২৩০ জনের। সোমবার ১৩ হাজার ৭৬৮ জন আক্রান্ত আর মৃত্যু হয়েছে ২২০ জনের। এরমধ্যে ঢাকা, খুলনার পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম। সোমবার চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৮২১ জন আর মৃত্যু ৯জনের। স্বাস্থ্য বিভাগ আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণের এই ধারা চলতে থাকলে দিন দশেকের মধ্যে হাসপাতালে আর রোগীদের স্থান সংকুলান হবে না। অক্সিজেন সংকট চরমে উঠতে পারে। চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। রীতিমতো বিনা চিকিৎসায় মানুষের মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু তারপরও অধিকাংশ মানুষ লকডাউন মানছে না, স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। মাস্ক পরছেনা, সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি অনুল্লেখই থাক। সবচেয়ে তাজ্জবের বিষয়টি হচ্ছে এবারের কঠোর লকডাউনে গ্রেফতার, জরিমানা করেও মানুষ ও প্রাইভেট গাড়ির অযথা ঘোরাঘুরি ও রাস্তায় চলাচল বন্ধ করা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে আসছে কোরবানির ঈদ। এ সময় গরুর বাজার আর মানুষের ঘরে ফেরার সংস্কৃতির রীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিপর্যয় ভযাবহ হতে পারে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞমহল। আমরা শুনতে পেয়েছিলাম, কোরবানীর মানুষের বাড়ি ফেরা ও গরুর বাজারে সমাগম নিয়ন্ত্রণ করতে লকডাউনকে আরো কঠোর বা কার্ফ্যু জারি করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ পরামর্শক কমিটি। কিন্তু সরকারের কাছে তা বিবেচিত হয়নি, বরং পশুর বাজার আর মানুষের ঘরে ফেরা নির্বিঘœ করতে লকডাউন শিথিল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে শিথিল লকডাউনের প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে। তাতে গণপরিবহনে দুই সিটে একজন যাত্রী বসানোসহ পরিবহনের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানাসহ মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আগামীকাল ১৫ জুলাই বৃহস্পতিবার থেকে ২২ জুলাই বৃহস্পতিবার পর্যন্ত লকডাউন শিথিল থাকবে।
সূত্র জানায়, এরপর বর্তমান অবস্থার চেয়ে আরো কঠোর লকডাউনের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিয়ে চরম আপত্তি রয়েছে সচেতন মহলে। কিন্তু দেশের হতদরিদ্র, নি¤œ ও মধ্য আয়ের মানুষগুলো কথাতো সরকারকে ভাবতে হবে। বিশেষ করে যারা কোরবানীর পশুর বাজারকে টার্গেট করে পশু লালন-পালন ও মোটাতাজা করেছে সেইসব খামারিদের নিয়ে সরকারের ভাবনার বিষয় আছে। তদুপরি গত ঈদে লকডাউন ও যানবাহন বন্ধ করার পরও যেভাবে মানুষ বাড়ি ফিরছে-তাতে সরকারের কাছে যুক্তি রয়েছে, লকডাউন শিথিল করার। আমরা লক্ষ্য করেছি, ঈদুল ফিতরের সময় কঠোর লকডাউনের মধ্যেও গ্রামমুখী মানুষের স্রোত যেভাবে শহর-নগর ছেড়েছে, অনেক চেষ্টা করেও তা ঠেকানো যায়নি। বরং সেই যাত্রা ছিল আরো বিপজ্জনক। ছোট ছোট যানবাহনে গাদাগাদি করে মানুষ গ্রামে গেছে। তার তুলনায় ট্রেনে-বাসে যাওয়া বরং কম বিপজ্জনক। সরকার মনে করছে, মানুষকে গ্রামে বা ঈদে বাড়ি যাওয়ার বিষয়ে অনুৎসাহিত করতে হবে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে। তারপরও যারা যেতে চায় তারা যেন গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে। তবে এতোসব হতাশার মাঝে আশার কথা হলো, দেশে টিকাদান কার্যক্রম আবারও শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে মানুষের উদাসীনতা ও সচেতনতার অভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, করোনা প্রতিরোধে ব্যাপক হারে টিকা প্রদানের কোনো বিকল্প নেই।
জানা যায়, এখন পর্যন্ত ৯০ লাখের বেশি মানুষ টিকার জন্য নিবন্ধন করে আছে, যারা টিকা পায়নি। গত কয়েক দিন দৈনিক গড়ে ২০ হাজারের মতো মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এই হারে টিকা দেওয়া হলে এই ৯০ লাখ মানুষকে টিকা দিতে এক বছরের বেশি সময় লেগে যাবে। নিবন্ধন আবার চালু হওয়ার পর প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন লাখ মানুষ নিবন্ধন করছে। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো বিরতি ছাড়া দৈনিক কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া প্রয়োজন। তাতেও কমপক্ষে ১২ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে আরো আট মাস লেগে যাবে। আমরা মনে করি, করোনা ভাইরাস নির্মূল করতে হলে সরকারকে স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োগ করতে জনগণকে সতর্কতার সাথে বাধ্য করতে হবে, পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রমও বৃদ্ধি করতে হবে। তবে শেষ কথাটাই হলো সরকারও জনগণকে সতর্ক হতে হবে।