আঁরার চাটগাঁ ভাষার কথা

28

চৌধুরী গোলাম রব্বানি

এক গবেষক বলেছেন, ‘বাংলা উপভাষা নিয়ে আমাদের দেশে সে সব আলোচনা দেখা যায়, তার উদ্দেশ্য ও তথ্যের যথার্থতা বা পদ্ধতির বৈজ্ঞানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া কঠিন। চট্টগ্রামী ‘উপভাষা’ নিয়ে লেখালেখি সেই ১৮৪৬ সাল থেকে একুশ শতকের প্রথম পাদ পর্যন্ত প্রলম্বিত। বেশির ভাগই বিবৃতিমূলক ও গ্রীয়ার্সনীয় আদর্শে ছকবদ্ধ।
[কথ্য ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি সম্বন্ধে ভাষা পন্ডিত ম্যাক্সমুলার একটি চমৎকার উক্তি করেছেন। তাঁর কথায় The real and natural life of Language is in its Diatects অর্থাৎ ‘ভাষার প্রকৃত ও স্বাভাবিক জীবন আছে তার উপভাষায়’। একথা যদি ঠিক হয় তবে আমাদের মানতে হবে যে, উপভাষাগুলো মূল ভাষার বিভিন্ন প্রাদেশিক রূপ হবার কারণে এগুলো ভাষার স্তর বা অবস্থান জ্ঞাপক কোন শব্দ সমষ্টি নয়; বরং বলতে পারি উপভাষা মূল বা জাতীয় ভাষা নির্মাণের ভিত্তিভূমি। উপভাষার জীবন-ঘনিষ্ঠ শব্দ, প্রবচন, উপমা-উৎপ্রেক্ষা সর্বজনীন মাতৃভাষার সাহিত্য সংস্কৃতির মূলে ভাব ও প্রাণরসের সঞ্চার করেছে। সে কথা উপভাষা বা আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় অর্বাচীন-অসংস্কৃত, মুখে বলা যায় না-সেটাই অলংকার সমৃদ্ধ প্রমিত ভাষায় প্রকাশ করে। এর মুখটা যদি ভাষার, তো তার হৃদয়টা উপভাষার। ভাষা যখন কৌলিন্যের অহংকারে উপভাষায় গ্রাম্যতার গন্ধ আবিষ্কার করে কথ্য ভাষা থেকে বিযুক্ত হতে চায়,-তখন একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংকট নেমে আসে। তার সৃজনশীলতা রুদ্ধ হয়ে যায়।
চাটগাঁ ভাষার কথা বলতে যেয়ে মান ভাষা মানে বাংলা ভাষার প্রসঙ্গ টানার কারণ হচ্ছে ভাষার ধ্বনিরূপ, শব্দ রূপ, পদবিন্যাস, বাগার্থ, বিভক্তি, উপসর্গের ভেতর আঞ্চলিক ভাষার এমন কিছু উপাদান থাকে, যার ভাষাতাত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা মূল ভাষার বংশ, উৎপত্তি ও বিকাশ সম্বন্ধে ধারণা লাভ করতে পারি। এখানে আলোচ্য বিষয় সেহেতু চাটগাঁ, তাই আমাদের আলোচনা চাটগাঁ ভাষার মাঝে সীমিত থাকছে।
মূল কথায় আসার আগে উপভাষা সম্পর্কিত আমাদের ধারণাটা একটু পরিস্কার হওয়া চাই। বাংলা বিশ্ব কোষে উপভাষাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। উপভাষা বা Dialect সাধারণতঃ একটি ভাষার বিভিন্ন রূপকে বুঝায়। একই বাক-গোষ্টির অন্তর্ভুক্ত কোন এক ব্যক্তি বা একটা দল এমন কোনো ভাষায় কথা বলে যা সেই বাকগোষ্ঠির অন্যান্য লোকের ভাষা থেকে পৃথক; তা’হলে সেই ব্যক্তি বা গোত্রের বিশেষ কথ্য ভাষাকে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক অর্থে উপভাষা বলা হয়। বাকগোষ্টি বলতে এমন একটা গোত্রকে বোঝায় যার সদস্যদের মাতৃভাষা পরস্পরের কাছে বোধ্য নয়, কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে, সে ভাষা সে গোত্রের প্রত্যেকের নিকট দুর্বোধ্য হতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ ক, খ, গ, স, হ কে একটা গোত্র ধরা যেতে পারে। পাশাপাশি হবার কারণে ক এর সাথে খ এর এবং খ এর সাথে গ এর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে অসুবিধা নাই। কিন্তু দূরবর্তী হওয়ার কারণে ক এর কথা স এর নিকট সুবোধ্য নয়, এবং ক এর কথা হ এর নিকট একইভাবে দুর্বোধ্য। যেমন ডাচ ও জার্মানরা একই বাক গোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত। ক্লেমিশ ও স্টিরিয়ান উভয় উপভাষা এই গোষ্ঠিতে প্রচলিত। কিন্তু এই উপভাষায় যারা কথা বলে তাদের কাছে পরস্পরের ভাষা দুর্বোধ্য। কিন্তু এই দুই দুর্বোধ্য বা অবোধ্য উপভাষা থেকে একটা পরিশীলিত কথ্য ভাষার উদ্ভব হয়, যা প্রধানতঃ শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের প্রয়োজনে ডাচ ও জর্মন ভাষা এ প্রকার ভাষার উদাহরণ। ফরাসী ও ইতালীয় ভাষা দু’য়ের মাঝেও ডাচ-জর্মন ভাষার পরিস্থিতি বিদ্যমান।
বাংলা ভাষায় প্রচলিত উপভাষার উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও সিলেট জেলার উল্লেখ করা যায়। এ তিন জেলা ব্যতিত অন্য সকল জেলার ভাষা অন্যান্য জেলার লোকের নিকট মোটামুটি বোধগম্য। নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপ ও শান্তিপুর অঞ্চলের প্রচলিত কথ্য ভাষার অর্জিত রূপই উভয় বাংলার শিক্ষিতজনের সাধারণ ভাষা রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উপভাষা সম্বন্ধে এ ধারণা লাভের পর আমাদের আর বুঝতে বাকী থাকে না যে, মূল ভাষা অনেক পরিশীলিত শিক্ষিতজনের উন্নত চিন্তা ও ভাব প্রকাশের ভাষা। এই ভাষার কথ্য ও লেখ্য রূপে নিজেকে প্রকাশের ক্ষমতা যার যতো বেশি তিনি শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান কাব্য, চারু ও কারু প্রভৃতিতে ততো পারদর্শী ও সম্মানিত বলে স্বীকৃত হন। সব সমাজের, সকল ধর্মের সব বয়সের সকল স্তরের, সকল অঞ্চলের মানুষজন ভাববিনিময়ে ব্যবহার করে বলে এই ভাষা যতটা স্বার্থ-বুদ্ধি সজ্ঞাত ততটুকু হৃদয়বৃত্তিক নয়। এতে ইতিহাস, ঐতিহ্য, বীরত্ব গাাথার পরিবর্তে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রশ্রয়। অন্যদিকে উপভাষা যার অপর নাম প্রাদেশিক বিভাষা তার ভেতর পাওয়া যাবে ভাষাতত্ত্বের অনেকজটিল সমস্যার সমাধান। আধুনিকতার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে মূল ভাষা সেখানে বদলাতে বলাতে জন্মের স্মারক চিহ্ন কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি; সেখানে উপভাষা যক্ষের ধনের মতো পাহারা দিয়ে আসছে অতীতের গর্ভে জন্ম নেয়া ভাষার জন্ম চিহ্ন থেকে-শুরু করে জাতির সাথে জাতির, গোত্রের সাথে গোত্রের ভাষার সঙ্গে ভাষার মিলনের ভাষাতাত্তি¡ক চিহ্নসমূহ। সীমিত গন্ডির মধ্যে স্বকীয়তা রক্ষা করে উপভাষা সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে।
আমাদের প্রতিদিন ব্যবহৃত একটি অতি পরিচিত শব্দ ‘আমি’। হিন্দি, মারাঠি, গুজরাতি প্রভৃতি ভাষার সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে এটি মূলে ছিল ‘মুই’ এক বচনে, ‘আমি’ বহুবচন। প্রাচীন বাংলায় যে এর প্রয়োগ ছিল তা’ চাটগাঁর চাকমা বুলি দ্বারা প্রমাণিত। চাকমায় মুই এক বচন এবং আমি বহুবচন। বাংলায় ‘আমি যাই’, চাকমায় ‘মুই যাং’। বাংলায় আমরা যাই চাকমায় ‘আমি যেই’। এতে একথা স্পষ্ট হয় যে, ইতিহাসের কোন এক পর্যায়ে বাংলা, গুজরাতি, হিন্দি, মারাঠি ও চাকমা (চাটগাঁ ভাষারই একটি উপশাখা) বা একটি ভাষায় কথা বলতো। রাষ্ট্রিক বা সামাজিক বিভাজনের কারণে একই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠির মাঝে সম্পর্কের ছেদ পড়ে। ফলে ভাষার শব্দ, ধ্বনি ও উচ্চারণে বিভিন্নতা দেখা দিয়েছে। চাঁটগা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস জানতে হলে গোত্রবদ্ধ এ সকল ভাষাকে এড়িয়ে গিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। আসাম বা অহমিয়া ভাষাতো বাংলারই সগোত্র। চাটগাঁ ভাষায় ক্রিয়ার পূর্বে নঞআর্থক শব্দের ব্যবহার আসামী ভাষায়ও বর্তমান। উচ্চারণ ও প্রকাশভঙ্গিতে দু’ভাষার মিল দেখে বোঝা যায় উৎসের দিক হতে চাটগাঁ ও আসামী-আত্মীয় বন্ধনে আবদ্ধ। বাঙালি, অসমিয়া, নাগা, গারো, লুসাই ও খাসিয়া অধ্যুষিত আসামের ভাষার বহু শব্দ চাটগাঁ ভাষায় আমরা ব্যবহার করি।
১৩ শতকে মঙ্গোল জাতি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা অধিকার করে এবং সেই থেকে অহোম বা আসাম নাম প্রচলিত হয়। অহোম শব্দটি চাটগাঁয় উচ্চারণে ‘আহামা’য় পরিণত হয়। অর্থ হচ্ছে এমন এক দৃঢ় সংকল্পের জেদি মানুষ-যাকে তার প্রতিজ্ঞা থেকে নিবৃত্ত করা যায় না। কে জানে অহোম লোকদের এই জেদী মনোবৃত্তিকে চাটগাঁইয়ারা ‘আহামা’ আখ্যা দিয়েছে!
চাটগাঁ ভাষার ওপর ত্রিপুরা ভাষার প্রভাবও কম নয়। যেমন ‘তায়’ বা ‘তুই’ শব্দ ত্রিপুরা ও নিজো ভাষায় ‘জল’ বা ‘নদী’। চাটগাঁয় যেমন টোয়া বলতে পুকুরের চেয়ে ছোট জলাধার বোঝায়। করতোয়া শব্দার্থ কি তবে ক্ষিপ্র ¯্রােতসম্পন্ন ধারা, একদিন যার তীরে প্রাচীন বাংলার পুন্ড্রনগর গড়ে উঠেছিল! মিজোরা চাকমাদের ‘জুই ছেক’ এবং ত্রিপুরাদের ‘তুই কুক’ নামে অভিহিত করে। এই দু’সম্বোধনের অর্থ জলতীরবাসী সাক (কাক)। কারণ হলো মিজোরা (মি=মানুষ, জো=পাহাড়, পাহাড়ী মানুষ। প্রধানতঃ পর্বতবাসী। আর চাকমা ও ত্রিপুরাগণ অপেক্ষাকৃত জলতীর বাসী। পাংখুই, বনযোই বা চাকমাদেও অনেক সময় ‘তি-কাম’ বা তা-কাম’ বলে সম্বোধন করে। তি বা তা শব্দও মূলতঃ তোয়া বা তুই, যার অর্থ জল। কাম শব্দ কম্পা শব্দজাত। অর্থ তিব্বতী লোক। চাটগাঁ ভাষায় পার্বত্যবাসীকে কোন কোন সময় কাউপ্পা (কধঁঢ়ঢ়ধ) বলে ডাকা হয়। সম্ভবতঃ শব্দটি কম্পা শব্দের পরিবর্তিত উচ্চারণ। উচ্চারণে ভিন্নতা ঘটলেও অর্থ একই রয়ে গেছে।
এ ধরনের অর্থবোধক অর একটি শব্দ কাম্পা-ছা, অর্থ-কাম্পাদের সন্তান। চাটগাঁ ও ত্রিপুরা ভাষায় ‘ছা’ শব্দের অভিন্ন অর্থ দেখতে পাই। ত্রিপুরারা নিজেদের বরো বা বরোক জনগোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত মনে করে। তারা তাদের ভাষাকে ‘কো-বরো’ বা ‘কোক-বরোক’ (কো/কোক=ভাষা) নামে অভিহিত করে। কো-বরো বা কোক-বরোকের মানে দাঁড়ায় ভাষা বরো বা বরোক। এটা বাংলা শব্দ গঠনরীতির উল্টো। ওরা নিজ দেশের নাম বলে হো-ত্রিপুরা, বাংলাদেশকে তারা বলে হো-বাংলা (হো-দেশ)। এখানে বরো’র অর্থ বড়, বাংলা বড়, চাটগাঁর উচ্চারণে ‘বর’। আমরা যাকে ‘বর’ বলে থাকি তার মূল নিহিত বরো শব্দে, আর বরোর মূল হলো ‘বদ্র’ যার অর্থ পাহাড়। (বরো-বদ্র=বদ্রিনাম=অদ্রিনাথ=আধিনাথ; বদরী ফল=বরই ফল বা কুল ত্রিপুরা জনগোষ্ঠি প্রধানতঃ বরোক নদীর কূলে বাস করতে তাই বরোক বে=বরো, রৌক-জল) এটি তিব্বতী শব্দজাত। চাটগাঁয় ‘রেক’ বলে একটা শব্দ আছে, যাকে জন¯্রােত বা জলের ধারা অর্থে বোঝানো হয়। তিব্বতী ভাষার সাথে ত্রিপুরা, আবার ত্রিপুরার সাথে চাটগাঁর শব্দ, শব্দার্থ ও উচ্চারণ গতি মিল প্রচুর। তাই মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, আর্থ-সীমাজিক, রাজনীতিক পরিবর্তনের কারণে ত্রিপুর, চাকমা, আসাম, তিব্বতী, বর্মী, আরাকানী প্রভৃতি মঙ্গোলীয় জাতি গোষ্ঠির ভাষার সাথে চাটগাঁ ভাষার ধ্বনিরূপ, শব্দরূপে অনেক পরিবর্তন ঘটতে। তিন-চারশ’ বছর আগেও এরা ভাষা-সংস্কৃতির দিক থেকে পরস্পরের খুব কাছাকাছি ছিল।
এখানে ইতিহাস খ্যাত লামা তারানাথের কথা উল্লেখ করা যায়। লামা একটি তিব্বতী শব্দ, মার মানে পুরোহিত বা ধর্মীয়ব্যক্তিত্ব। চাটগাঁর প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের অন্যতম উৎস লামা তারানাথের বিবরণ। তিনি চাটগাঁকে বাংলা এবং কোকি দেশের অংশ বলেছেন। তার দেয়া বিবরণে আমরা জানতে পাই যে, পাল আমলে চাটগাঁ ‘রমা’ বা ‘রম্যভূমি’ নামে পরিচিত ছিল। চট্টগ্রামের দক্ষিণে ছিল রাখাইন বা আরাকান রাজ্য। তিব্বত বিশারদ বাঙালি অতীশী দীপঙ্কর বাংলা প্রান্তসীমায়-চান্দিল্যাগ্রাম নামের একটি স্থানের কথা তার ‘নমোথোর’ বিবরণে উল্লেখ করেছেন। তিব্বতী সূত্রে প্রাপ্ত চান্দিল্যাগ্রামের সঙ্গে আরাকানের মন্দিরে উৎকীর্ণ লিপি (১৫০১-৪১খৃ.)’র অদ্ভুত মিল লক্ষণীয়। বান্দরবান জেলার ‘লামা’ উপজেলার এতদঞ্চলের সাথে তিব্বতের যোগাযোগের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তাছাড়াও চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রতিপত্তিতে তিব্বতী লামাদের বিশেষ অবদান সর্বজনবিদিত। বলা হয়ে থাকে, চট্টগ্রামের পÐিত বিহারকে কেন্দ্র করে এককালে ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধধর্মের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের তর্কযুদ্ধ হতো, এতে প্রায়শঃ বৌদ্ধ ধর্ম শ্রেষ্ঠতর নির্বাচিত হত। এ সবের পিছনে প্রধানতঃ তিব্বতাগত বৌদ্ধ পুরোহিতদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। ত্রিপুরি ভাষা ও বর্মী ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা প্রসঙ্গে ভাষাতত্ত¡বিদ ড. ভেন্সি বার্নো বলেন, ত্রিপুরা ও বর্মী ভাষা প্রায় নিকটতর। অতএব উভয় ভাষার মিশ্রণ তত্ত¡ ব্রহ্মদেশীয় সূত্রে জানাও সম্ভব। অপরদিকে ড. ওয়াডেল বলেন, তার বর্মী ভাষা জানার ফলে তিব্বতী ভাষা আয়ত্ত করা সহজ হয়ে যায়। অতঃপর চাটগাঁ ভাষার ইতিবৃত্ত জানতে আমরা বুঝতে পারছি যে, ত্রিপুরা, তিব্বত, বর্মা, আসাম, আরাকান প্রভৃতি তিব্বত-চায়না-মঙ্গোলিয়েড ভাষা গোষ্ঠির মাঝে চালু উপভাষাসমূহের গতিপ্রকৃতির খোঁজখবর একান্ত আবশ্যক। ভাষার বিবর্তন ধারার আরেকটু গভীরে যেতে আমরা দেখতে পাব, চাটগাঁ ভাষা মূলতঃ মাগধী প্রাকৃত থেকে উৎসারিত এবং এখানেই বাংলা ভাষার সাথে তার আত্মিক মিল ঘটেছে। সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় মাগধী প্রাকৃত থেকে উৎপন্ন ৫টি ভাষার উল্লেখ করেছেন। এগুলো বাংলা, রাঢ, বরেন্দ্রী, সমতট ও চট্টলা। বৌদ্ধের বাণী পালি ভাষা লিখিত হওয়ায় ধর্মটির বিস্তৃতির সাথে পালির বিকাশ হতে থাকে। উত্তর ভারতীয় বৌদ্ধদের হাত ধরে পালি ভাষাও দক্ষিণ পূর্বমুখি যাত্রা আরম্ভ করে চট্টগ্রাম-আরাকান অঞ্চলে বসতি গাড়ে।
চট্টগ্রাম ও পাশপাশের অঞ্চলে আর্যীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয় খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে। সেকালে এখানে ‘কিরাত’ নামের এক দুর্ধর্ষ জাতির বাস ছিল বলে মহাভারতে উল্লেখ আছে। এরা নাকি মহাভারত বর্ণিত বিখ্যাত ‘কুরু’ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। স্থানীয় প্রতিরোধের মুখে আর্যদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হলেও বেশিদিন থাকেনি। এ পর্যায়ে আমরা অনেকগুলো স্থানীয় নামের আর্যকরণ তথা সংস্কৃতায়ন হতে দেখি। তখনকার কিছু তাম্র শাসন লিপি পাওয়া গেছে। সেগুলো সংস্কৃত, আধা সংস্কৃত আধা পালি ভাষায় লিখিত। এখানে কয়েকটি অনুসর্গের উল্লেখ করবো, এতে বোঝা যাবে কি করে আদি শব্দগুলো আর্যকৃত হয়ে পরে সংস্কৃতের সাথে যুক্ত হয়েছে।
গ্রাম : গ্রাস (সংস্কৃত আর্য গ্রাম, কখনো একে বদলিয়ে গাঁও লেখা হয়) চট্টগ্রাম, চাটগাঁও, বাণীগ্রাম, হস্তীগ্রাম (হাইদগাঁও) দেবগাম(লোক মুখে প্রকাশ দেয়াং)
দন্ডি: (হিন্দি) এর অর্থ রাস্তা বা উঁচু বাঁধ। পামদন্ডি, সাগরদন্ডি, সুচক্রদন্ডি, গোমদন্ডি, কোকদন্ডি, পাঠানদন্ডি, চিকনদন্ডি, এয়াকুবদন্ডি, চৌফলদন্ডি।
দ্বীপ : (সংস্কৃত; অর্থ দ্বীপ) পরিবর্তিত রূপ ডায়া (পর্তুগীজ দিড) সন্দ্বীপ, নিঝুম দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, আলোকদিয়া।
খাইন : (আঞ্চলিক রূপ তথা কন্দ, কাজনা আদায়ের স্থান) জঙ্গলখাইন, হরিনখাইন, করণখাাইন, কচুখাইন, বারখাইন, পাঁচখাইন, নাইখাইন।
খিলা বা খিল: (সংস্কৃত পতিত ভূমি) কদুরখিল, মির্জাখীল, গোবিন্দার খিল, দাইমার খিল, খিল গোগল।
ঘাট : (অবতরণ মূল) ধলঘাট, গোরাঘাট, সদরঘাট, কস্তুরাঘাট।
ঈুব, পুরা : (সংস্কৃতি) দূর্গাপুর, রামপুর, শ্রীপুর, ইছাপুর, সলিমপুর, জেষ্ট্যপুরা, চন্দনপুরা, সাধনাপুর, জনার্দূনপুর।
নগর : (সংস্কৃত শহর) এয়াকুবনগর, মরিয়ামনগর, কাঞ্চননগর,
আর্যকরণের দূরন্ত অভিযানের নিকট ম্রিয়মান স্থানীয় সংস্কৃতি এতোটা বিপন্ন হয়ে পড়েছিল যে, নিজেদের আর্য বংশ/গোত্র প্রমাণ করার জন্য রীমিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। ত্রিপুরারা তাদের মহাভারতে উল্লিখিত চন্দ্রবংশ দাবি করলো, মগরা বলতে থাকল তারা মগদ থেকে আগত মানব গোষ্ঠির উত্তরাধিকার।
চাকমারাও নাম কুলহীন থাকবে কেন? তারা বললো তাদের আদি বাসস্থান চম্পকনগর (বিহারের চম্পরান?) সমতলবাসী রাজবংশী, বড়ুয়ারা প্রচার করলে তাদের দেহে মগধের ক্ষত্রিয় রক্ত প্রবাহিত।
এ বিষয়ে স্যার জর্জ গ্রিয়ারসনের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তাঁর মতে, যখন অসভ্য আদিবাসীরা আর্য ভাষা-সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে তখন স্বাভাবিকভাবে তারা নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতিকে ভুলে যায় এবং ধীরে ধীরে বিজয়ী শক্তির কাছে মাথা নত করে নিজেদের সমৃদ্ধির চিন্তা করতে উদ্যোগী হয়। এই মন্তব্য কতোটা সত্য, আমরা চট্টগ্রামের ইতিহাসের প্রতি লক্ষ করলে তা’ উপলব্ধি করতে পারি। আমরা দেখি যে, পার্বত্য উপজাতীয়রা নিজের ভাষা-সংস্কৃতি ছেড়ে এখন প্রমিত বাংলা এবং কথ্য চট্টগ্রামী দিয়ে তাদের দৈনন্দিন কার্য সম্পাদন করছে।
চাটগাঁ ভাষা যেমন মাগধী প্রাকৃতের মাধ্যমে ইন্দে-নূরোপিয় ভাষা গোষ্ঠির সদস্য রূপে বাংলা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার দাক্ষিণাত্য বাদে) লক্ষাক্রান্তি; তেমনি মঙ্গোলয়েড, অস্ট্রেলিয়াড, ভটিট, মুন্ডা প্রভৃতি অনার্য ভাষাগোষ্ঠির শব্দ সম্পর্কেও আকীর্ণ। আগ্রাসনের পূর্বে দীর্ঘসময় ধরে চাটগাঁর ভাষা, প্রশাসন ও সংস্কৃতিতে অনার্য বসতি ও প্রভাবের প্রমাণ রূপে এখানে কিছু স্থান ও নামের উল্লেখ করা হল। নামের প্রান্তীয় শব্দাংশ বা অনুসর্গসমূহ চাটগাঁর অনার্য বা প্রাক-আর্য অবস্থার প্রমাণ।
আইস : পাঁচলাইশ, আমিলাইস (ষ), কুয়াইশ, কালিয়াইশ, চন্দনাইশ
বিল: বিলা, (জলাভূমি) সুয়াবিল, নোয়াবিল, নলবিলা, বিবিবিলা, ধলিবিলা, পুটিবিলা।
চি : চিয়াং চুয়া (পাানি চলাচল নালা) আমুচিয়া, এঁওচিয়া, কেঁওচিয়া, পুটিচিলা, দাসুচিয়া, কচুয়া।
ডাঙ্গা-ডেঙ্গা : (উঁচু স্থান, টিলাপাহাড়) গোসাইলডেঙ্গা, করলডেঙ্গা, গাটিয়াডেঙ্গা, ডেঙ্গাপার,
ঢালা : (পাহাড়ের গিরিপথ) বারৈয়ারঢালা, কচ্চাপ্প্যারঢালা, চুড়ামনিরঢালা,
ঘোনা : (সংকীর্ণ উপত্যাকা) বড়ঘোনা, চন্দ্রঘোনা, কুমিরাঘোনা, কাহাঁরঘোনা
ঘোপ : (গভীর আবর্ত) বড়ঘোপ
জুরি : খোল/ডল চলাচল পথ) বাইনজুরি, বিনাজুরি, বাটাজুরি। এছাড়া আছে কোরা; কুম, কোলা, পালং প্রভৃতি অনার্য শব্দ। চট্টগ্রামের অর্ধেকেরও বেশি স্থানের নামের সাথে যুক্ত এসব শব্দাংশ মোট পরিমাণের সামান্য কয়েকটি মাত্র।
আর্য পূর্ব ও পরবর্তী স্থান-নামের বিবরণের মাধ্যমে আমরা চাটগাঁ ভাষার বিবর্তন সম্পর্কিত অজানা বহু তথ্য জানতে পাই; যার ভিত্তিতে এ ভাষার একটি ধারাবাহিক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব হবে।
এ পর্যায়ে চাঁটগা ভাষার একটি বংশ পরস্পরা বিবরণী আলোচনা করা সাউক। তার আগে আমরা মনে রাখব যে, বাংলা ভাষা যেভাবে আদিম প্রাকৃতিক ৩টি স্তরের মধ্যে দিয়ে গঠিত, ঠিক সেভবে চাটগাঁ ভাষাকেও বাংলা ঘরানার ভাষা হিসেবে স্তরগুলো অতিক্রম করতে হয়েছে। এর ১ম স্তর পালির, ২য় স্তর মাগধি প্রাকৃতের এবং ৩য় স্তর অপপ্রংশের সমশ্রেণীর। উদাহরণত: ঘোটক, পালি, ঘোটক, পাকৃত অপপ্রংশ। কেবল শব্দ নয়, ধ্বনিতত্তে¡ও বিচারতে বাংলা আদিম প্রাকৃত হতে উদ্ভুত। বাংলায় ড, ডু এবং ঢ এর যেরূপ পৃথক উচ্চারণ আমরা করি; সংস্কৃত ব্যাকরণে কিংবা শিক্ষাপুস্তকে তাহার কোনো নিদর্শন নাই।
সংস্কৃতের প্রভাবে আদি প্রাকৃতের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে, তবুও শব্দের গঠনে আদি প্রাকৃতর চিহ্ন লক্ষনীয়। পূর্ব বঙ্গে আসামের মতো ‘স’ এর স্থানে ‘হ’ উচ্চারিত হতো। এখানো চাটগাঁ ভাষায় তা’ ব্যবহার আছে। যাথা-সকল সময় চাটগাঁয় ‘হক্কল/অক্কল সময়’ম এখানে ‘ম’র উচ্চরণ হয় নাসিকায়; যেমন বাংলার আমি চাটগাঁয় ‘আঁই’; বাংলায় তুমি, চাটগাঁয় ‘তুঁই’, বাংলার তিনি চাটগাঁয় ‘তেঁই, তোমাকে চাটগাঁয় তোয়ারে’ ইত্যাদি নাসিকা উচ্চারণেরই প্রমাণ। কিভাবে কোন্ ভাষা-উপভাষার প্রভাবে উচ্চারণে এ তারতম্য ঘটেছে সে সম্বন্ধে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা হয়নি। অতএব স্বীকার করতেই হয় যে, সংস্কৃতের প্রভাবে প্রাকৃত ভাষার কিছু ধ্বনি পরিবর্তন হয়েছে। আসামের মতো পূর্ববঙ্গেও স র স্থানে হ হয়ে যেতো বলে সংস্কৃতে প্রবাদ চালু হয়-আশীর্বাদং ন গৃহ্নীয়া বঙ্গবদেশ নিবাসন।
শতায়ুরিতি বক্তব্য হতায়ুবিতি বা দিন। অর্থাৎ বঙ্গ দেশবাসীকে আশীর্বাদ করতে নাই, কারণ তারা শতায়ু বলতে হতায়ু উচ্চারণ করে থাকে। কিন্তু আজ আর কেউ (সাদু ভাষার প্রভাবে) শতায়ু স্থলে হতায়ু বলে না, কিন্তু চাটগাঁ ভাষায় বলা হয় : ‘হক্কল মাছে গু খায়, ঠুইট্টা মাছর নাম’। কেউ হয়তো বলবেন চাটগাঁইয়ারা সকালকে তো ‘হিকাল’ বলে না-সকাল-ই বলে। এখানে বলা দরকার যে, সকাল চাটগাঁর শব্দ নয়, চাটগাঁ ভাষায় সকাল এর মূল শব্দ ‘বেয়াইন্না’, এদিক থেকেও চাটগাঁ ভাষার সাথে অহসিয়া ভাষার মিল লক্ষ করা যায়।
চাটগাঁ ভাষায় কাল নির্দেশক এমন কিছু ক্রিয়ারূপ আছে যা বাংলা ভাসায় পাওয়া যাবে না। যেমন : ‘আঁই আইব, তুঁই যও’ অর্থাৎ আমি আসছি তুমি যাও। এই কাব্য দুােয় ক্রিয়া বর্তমান ও ভবিষ্যত উভয়ই নির্দেশ করে; কিন্তু ‘আঁই আইদ্দে’ শব্দের জন্য বাংলায় আমি আসছি ছাড়া অন্য শব্দ নাই। চাটগাঁয় এটা ঘটমান ক্রিয়া রূপে ব্যবহৃতি। বাংলায় এ বাক্যেও বিকল্প লেকা যায়-‘আমি আসছি, তুমি দেখছো না’ আসছি শব্দার্থে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দুটো বুঝানো যায়, কিন্তু আইদ্দে শব্দে শুধু ঘটমান বর্তমানকে বোঝায়। এ রকম অনেক এক্সপ্রেশন বা বাকভঙ্গি চাটগাঁ ভাষায় আছে যা বাংলা ভাষায় পাওয়া যায় না। যেমন : ‘আঁই হঈদে ন না’, ‘তুই হঈঅদে ন না’ ইত্যাদি।
এ পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত শব্দ কাঠামোর মধ্যে ব্যাপক অর্থবোধক কিছু চাটগাঁ শব্দের নমুনা উল্লেখ করা গেল :
১. মই+চালি (চালাইয়া) শব্দযোগে ‘মইচালি’ শব্দ গঠিত। কোন কিছুতে জোর খাটিয়ে তছনছ করা অর্থে মইচালি শব্দ ব্যবৃহত হয়।
২. হই (কই)+চালি-ছাই সহযোগে কই মাছ কোটার সময় মাছের যে ছটফটানি, সেই অর্থে কষ্ট বা শোক-দুঃখে অস্থির আবস্থা বুঝায়।
৩. হারমাদ : পর্তুগীজ জলদস্যুদের মানুষের নৌবহর আরমাড়া থেকে উদ্ভূত, হারমাদ শব্দ দ্বারা লুটতরাজকারী, ধ্বংসের লিপ্ত ব্যক্তিদের ভোজানো হয়।
৪. মগর মুল্লুক : অত্যাচার-অনাচারের রাজত্ব অর্থে ব্যবহৃত।
৫. অওলা : বাড়ির রান্নাঘর), ৬. ঊাইনদুয়ার : পেছনের দরজা, ৭. আড়াল : আকাড়া (চাউল), ৮. আ লাই : মাপার আগে পাল্লা পরীক্ষা করা, ৯. উরালা : পঁচা (ঘর) চালের পানি। ১০. উতঅন : কন্ডোয়ন, ১১. হচাল : অতিরিক্ত সেদ্ধ চাল (ভাত), ১২. খরান : তীব্র গরম, ১৩. উল্ফা : বাজে (ফালতু অর্থে)।
চট্টগ্রামী বুলির এই অন্তশক্তি পালি/প্রাকৃতের অক্ষর ও ছান্দিক অর্থের অনুগামী। আদি প্রাকৃতের একটা বাক্যের বিভিন্ন স্তর পার হয়ে আধুনিক বাংলা ও চাটগাঁয় পরিণত হওয়ার কিছু নমুনা নিম্নে দেখানো হয়েছে।
১ম স্তর-আর্য : সুয়ং বৃহন্তমশ্ব পশ্যত। সংস্কৃত-যুয়ং বৃহন্ত ঘোটক পশ্যত।
৩য় স্তর-(নাটকীয় প্রাকৃত শ্রেণীস্থ) তুমহে বড্ড ঘোড়ং দেক্খহ।
৪র্থ স্তর-অপ্রভ্রংশ) তুমহে বড্ড ঘোড়া দেখখহ।
প্রাচীন বাঙ্গলা-তুমহে বড় ঘোড়া দেখই।
মধ্য বাঙ্গলা-তুমি বড় ঘোড়া দেখহ।
আধুনিক বাংলা-তুমি বড় ঘোড়া দেখ।
কথ্য চাটগাঁ-তুঁই বড় ঘোড়া চঅর/দেইখতা লাইগ্গ।লাইগ্গু
এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বাংলা ভাষা বা বাংলার উপভাষা চাটগাঁ সংস্কৃতি থেকে ব্যুৎপনন হয়। সংস্কৃত সুয়ং কখনও তুমি/তুঁই’র উৎপাদক হতে পাওে না। বরং এর সাথে ইংরেজী ‘ইউ’র নৈকট্য। বৃহন্তশ্বং থেকেও যে বড় ঘোড়া আসে নাই তার জন্য কোন প্রমাণ অনাবশ্যক। ১পশ্যতে’র সাথে ‘দেখ’ এর কোন ভাষাতাত্তি¡ক ব্যাকরণিক সাজুয়া কল্পনা করা যায় না। তাই সংস্কৃত বাংলার জননীয় হওয়ার আবদার অর্বাচীন কল্পনা ছাড়া কিছু নয়।
তবুও ফোর্ট ইউলিয়াম কলেজ কেন্দ্রিক প্রাচ্য-ভাষাগ্রহী কতিপয় ইংরেজ পন্ডিত এবং তৎসহযোগী বেদান্তাশ্রয়ী প্রাচীন পন্থী একজাতের ব্রাহ্মণ বিদ্যাবিশারদ বাংলাকে সংস্কৃতানুগ করার প্রবল উচ্ছ্বাসে বাংলাভাষা থেকে সকল দেশজ লোকায়ত শব্দ ঝেঁটিয়ে দিয়ে এমন নির্মম সংস্কৃত খড়্গ চালিয়েছেন যে, বাংলাকে আজ নিজের আদলে চেনাই দূরহ হয়ে পড়েছে। বাংলা ব্যাকরণ এখন সংস্কৃত ব্যাকরণের ফটোকপি। কোলমতি শিক্ষার্থীরা বই’র বাংলা শব্দটি যে আদিতে প্রাকৃত ছিল, সংস্কৃতের মধ্যে ফেলে পরিচিত শব্দটাকেই তার অচেনা মনে হচ্ছে। এখানে দু’একটা উদাহরণে বিষয়টি বলছি। দুই+তা=দুগ্ধ, সুজা+ত=যুক্ত, ভজ+ত=ভক্ত; এ সব উৎপন্ন সংস্কৃত শব্দের সাথে উৎপাদক শব্দ বা অনুসর্গের কোন মিল নেই। আমাদের সন্তানেরা কোনদিনই উৎস শব্দ বা ধ্বনিরূপের কথা জানতে পারব না। তাই শব্দ মুখস্ত করলেও তাদের পক্ষে শব্দের সৃজনশীল ব্যবহার প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে পড়বে।
এখানে পূর্বোক্ত স্যার জজ গ্রিয়ারসনের সম্পাদিকত ‘লিঙ্গুয়িস্টিক সার্ভে অব ই্িন্ডয়া’তে উপমহাদেশের ভাষাগুলোর শ্রেণীকরণ সম্পর্কে একটু আলোকপাত করি। বৈজ্ঞানিকভাবে ত্রæটিমুক্ত না হলেও এটিই ভারতীয় উপভাষার ওপর পরিচালিত প্রথম ও সম্ভবত: একমাত্র জরীপকার্য। এতে বাংলাভাষার উপভাষাসমূহকে প্রাচ্য-পাশ্চ্যত্য দু’ভাগ করা হয়েছে। প্রাচ্যকে আবার পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব নামে আলাদা করে দেখানো হয়েছে। সেখানে চাঁটগ ভাষাকে দক্ষিণ-পূর্ব শাখায় দেখানো আছে এশাখার অন্যান্য উপভাষা হলো নোয়াখালী, আকিয়াব (রামাঙ্ক) জেলার উত্তরাংশ। চাকমা ভাষা চাটগাঁর উপভাষারূপে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপযুক্ত আলোচনায় ধ্বনিতত্বের দিক থেকে চাটগাঁ ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। যেমন (এক) এ ভাষায় ঘোষ মহাপ্রাণবর্ণ রক্ষিত রয়েছে। ঘর, ঝর (ঝড়) ধান, বারত ইত্যাদি। (দুই) এ ভাষার আদিতে হ রক্ষিত আছে। হাত, হাতী, ইত্যাদি। (৩) পদ মধ্যবর্থী ম আনুমাসিক হয়। আঁই (আমি) আঁর (আমার) তুঁই (তুমি) কুঁয়ার (কুমার) ছঁই (সিম) অঁউক (শামুক)। (চার) পদমধ্যবর্থী ব্যঞ্জনবর্ণ প্রায় লোপ পায় বা বিবৃত হয়। তঅন (তখন) ডাই (ডাকিয়া) মিঢা (মিঠে) খন্দা (খন্তা) মুর (মূল) বোগা (বক)। পাঁচ ড. এনামুল হক এর মতে এতে চ ছ ধ্বনি রক্ষিত। ছঅল (ছাগল), জাতি (ছাতা), চঅর (চারক) প্রভৃতি।
রূপতত্বে সর্বনামের প্রথম পুরুষের স্ত্রী লিঙ্গে তেঁই (তিনি) তাঁই, হিতি এবং ন অব্যয় ক্রিয়ার পূর্বে বসে। ন’ যাই, ন আছিল, ন আইলো, ন’ আই।
চাটগাঁ ভাষা বিষয়ক অন্যবিধ আলোচনা সমৃদ্ধ একটি যন্ত্র তালিকা এখানে সংযোজন করা হলো।
***
তালিকাটি ভাষাবিজ্ঞানী প্রফেসর মনিরুজ্জামান এর ‘চট্টগ্রামের উপভাষা চর্চার তথ্যক্রম’ প্রবন্ধ থেকে নেয়া হয়েছে।