অ্যালগরিদম যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে জীবন

3

এই পৃথিবীতে বর্তমানে আরেক নতুন পৃথিবী তৈরি হয়েছে যার নাম ভার্চুয়াল পৃথিবী, যেখানে আছে আকাশের মতো সীমাহীন ইন্টারনেট, ফেসবুক ও টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়া এবং গুগলের মতো বহু সার্চ ইঞ্জিন। কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের মতো ডিজিটাল সামগ্রীকে ঘিরে এই জগত আমরা তৈরি করেছি, আমাদের চারপাশের ভৌত বাস্তব পৃথিবীতে নয়, এর অবস্থান এক সমান্তরাল ভার্চুয়াল বা অপার্থিব জগতে। সেখানেই আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে: তাদের ছবি দেখছি, শুভেচ্ছা বিনিময় করছি, কথাবার্তা বলছি, এমনকি ওই জগতে নতুন নতুন বন্ধুও তৈরি হচ্ছে।
ভার্চুয়াল এই জগত পরিচালনা করার মূলে যা রয়েছে তা হচ্ছে গাণিতিক কিছু নির্দেশনা, কম্পিউটারের পরিভাষায় যাকে বলা হয় অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদমই ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সোশাল মিডিয়া এবং গুগলের মতো সার্চ ইঞ্জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সম্প্রতি এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফেসবুকের সাবেক একজন কর্মী ফ্রান্সেস হাওগেন। যুক্তরাষ্ট্রে সেনেটের এক কমিটির কাছে দেয়া বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেছেন- ফেসবুক এবং তাদের অ্যাপগুলো শিশুদের ক্ষতি করছে, বিভেদ বাড়াচ্ছে এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এবছর শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ফিলিপিনো সাংবাদিক মারিয়া রেসাও বলেছেন- ঘৃণা ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।
ফেসবুক অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অ্যালগরিদম কী
অ্যালগরিদম হচ্ছে যে কোনো কাজের প্রণালী বা ধাপে ধাপে কোনো কিছু করার প্রক্রিয়া। রন্ধনপ্রণালীর সঙ্গে এর তুলনা দিয়ে এটি সহজে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
ভাত রান্না করার সময় প্রথমে একটি পাত্রে চাল নেওয়া হয়, তার পর তাতে পানি ঢালা হয়, চাল কয়েকবার ধোওয়ার পর সেটি রাখা হয় চুলার ওপরে, তার পর চুলা জ্বালাতে হয়- এই প্রক্রিয়াটিই অ্যালগরিদম।
আয়ারল্যান্ডে তথ্য প্রযুক্তিবিদ নাসিম মাহ্মুদ, যিনি ডাবলিনে চিকিৎসা ও উদ্ভাবন সংক্রান্ত আমেরিকান একটি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড হেলথ গ্রুপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছেন, তিনি বলছেন, ‘কম্পিউটারকেও একটি কাজ করার জন্য ওই কাজটিকে বিভিন্ন ধাপে ভাগ করে দেওয়া হয়, যাতে কম্পিউটার সেটা সহজে বুঝতে পারে এবং সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। কম্পিউটার নিজে কোনো কাজ করতে পারে না। তবে তার রয়েছে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা। তাকে কিছু পদ্ধতি বলে দেওয়া হয় যাতে সে তার খুব কম বুদ্ধি দিয়ে (কিম্বা তার কোনো বুদ্ধি নেই) কাজটা সম্পাদন করতে পারে। প্রক্রিয়াগুলো সূ² ও সরলভাবে দেওয়া থাকে যেন কাজটা সে কিছু গাণিতিক ধাপের মাধ্যমে শেষ করতে পারে। এসব নির্দেশনাই অ্যালগরিদম’। খবর বিবিসি বাংলার
প্রযুক্তির সাহায্যে ভুয়া খবর ঠেকাতে বর্তমানে অনেক গবেষণা চলছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কীভাবে কাজ করে
সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যালগরিদমের ব্যবহার নিয়ে সম্প্রতি অনেক আলোচনা হচ্ছে। কারণ এসব মিডিয়াতে মানুষ কোন খবর দেখতে পাবেন বা পাবেন না সেটা এই অ্যালগরিদমের মাধ্যমেই নির্ধারিত হচ্ছে। নাসিম মাহ্মুদ বলেন, ‘অ্যালগরিদম এখন অনেক দূর এগিয়েছে, অ্যালগরিদম অনেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেসব সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা চলছি’।
একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে অনেক সময় একজনের প্রোফাইল দেখিয়ে জানতে চাওয়া হয়- তিনি কি আপনার বন্ধু? এটা কীভাবে করা হয়? ফেসবুক কেমন করে বুঝলো যে এই ব্যক্তি আমার বন্ধু হতে পারেন? অনেক জটিল কিছু অ্যালগরিদম দিয়ে এই কাজটা করা হচ্ছে’।
কিন্তু এটা কি শুধু অ্যালগরিদমের নেওয়া সিদ্ধান্ত নাকি এর পেছনে মানুষেরও কোনো ভূমিকা আছে? তথ্য প্রযুক্তিবিদ নাসিম মাহ্মুদ বলছেন, হ্যাঁ বা না- এই প্রশ্নের এরকম সহজ কোনো উত্তর নেই। কারণ যে ব্যক্তি অ্যালগরিদম ডিজাইন করছেন, তৎকালীন সময়ে তার জানা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
নাসিম মাহ্মুদ বলেন, ‘ধরা যাক ফেসবুকে আপনার যিনি বন্ধু, তার বন্ধুরাও আপনার বন্ধু হতে পারে। অ্যালগরিদমকে বলা হলো একজন ব্যক্তির যে বন্ধু রয়েছে, তার যারা বন্ধু, তাদেরকে তুমি বলো যে তারাও তার বন্ধু হতে পারে। কিন্তু ধরা যাক যিনি অ্যালগরিদম ডিজাইন করেছেন তার হয়তো জানা ছিল না যে চাকরির সূত্রে, কিম্বা একই পাড়ায় থাকার কারণে, অথবা একই স্কুলে পড়ার কারণেও বন্ধু হতে পারে’।
তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়াটি ক্রমাগতই আপডেট করা হচ্ছে যার ফলে সময়ের সাথে অ্যালগরিদমও আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে। ফলে অ্যালগরিদম নাকি মানুষ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে- সেটি স্পষ্ট করে বলা কঠিন। অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের করা ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করেই অ্যালগরিদম তার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। মানুষ যে বিষয়গুলো সহজে হিসাব করতে পারছে না অ্যালগরিদম সেই কাজটা দ্রুত করে দিতে পারছে। যেমন এক ব্যক্তি এক লক্ষ মানুষ থেকে তার বন্ধুকে খুঁজে বের করতে পারে না। কিন্তু অ্যালগরিদম মুহূর্তের মধ্যেই সেটা করতে পারছে’।
তবে বর্তমানে এমনভাবে অ্যালগরিদম ডিজাইন করা হচ্ছে যাতে কম্পিউটার নিজেও সময়ের সাথে সাথে ডিজাইনার ছাড়াই নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারছে। তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমেই এটা সম্ভব হচ্ছে যাকে বলা হয় মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং কিম্বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
অ্যালগরিদম যখন নতুন কোনো তথ্য পায় তা থেকেও সে শিখতে পারে। কারণ কিভাবে শিখতে হবে এটাও তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটা ছোট্ট শিশুকে প্রথমে আমরা কিছু শব্দ শিখিয়ে দেই, তার পর সে নিজে নিজেও কিছু শব্দ শিখতে পারে, এসময় হয়তো ভুলও করে, তখন আমরা তাকে ঠিক করে দেই, আবার সে ভুল করে- অ্যালগরিদমকে এভাবেও ভাবা যায়- বলেন নাসিম মাহ্মুদ।