অস্থির মানুষ বাড়ি-বাসায় অবস্থান করার বিকল্প পথ বের করতে হবে

17

কোভিড-১৯ এর আগ্রাসন থেমে নেই। লাফিয়ে লাফিয়ে একদেশ থেকে বহু দেশ এ ভাইরাসের কবলে। যার আরেক নাম করোনা। এ ভাইরাসটি প্রতিরোধে কোন প্রতিষেধক এখনও বাজারে আসেনি। ফলে এর সংক্রমণ ঠেকাতে বদ্ধ ঘরে অবকাশ যাপনই একমাত্র উপায়। ভাইরাস মোকাবেলায় ঘরে থাকার বিষয়টিকে বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু পরিভাষায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যেমন লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স বা ‘সামাজিক দূরত্ব’ প্রভৃতি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর বাংলাদেম সরকারসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সরকারগুলো জোর দিচ্ছে, ব্যবস্থাও নিচ্ছে, যাতে সংক্রমণ সর্বনিম্ন মাত্রায় রাখা যায়। সময়ের অভিজ্ঞতা বলছে, সামাজিক দূরত্ব মেনে চললে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ অনেকাংশে সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা কী! গত দুইদিন ধরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘সামাজিক দূরত্ব’ মানা হচ্ছে না, মানা যাচ্ছে না। বিশেষ করে দুস্থ গরিব ও অসহায় মানুষগুলোর মধ্যে সরকারি কোন কোন পর্যায়ে বেসরকারি উদ্যোগে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সময় এ বিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। চট্টগ্রামে বন্দর থানায় এমন এক বিশৃঙ্খলার চিত্র ইলেকট্রিক মিডিয়াগুলো প্রকাশ করেছে। আবার বিপরীত চিত্রও আছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ত্রিপুরা পাড়ায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সুশৃঙ্খলভাবে ত্রান বিতরণ করছেন-তাও গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে। একইসাথে নগরীর কোতায়ালি থানার উদ্যোগও প্রসংশিত হচ্ছে।
কয়েকটি ভালো দৃষ্টান্তের বাইরে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বিপন্ন, শঙ্কিত মানুষ সরকারি খাদ্যসামগ্রী হাতে পেতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ছে। ফলে শুরু হয় ঠেলাঠেলি, হুড়োহুড়ি। সামাজিক দূরত্বে থাকা তখন সম্ভব হচ্ছে না। এটা আসলে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাগত সমস্যা। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবা উচিত এবং খাদ্যসামগ্রী বিতরণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা উচিত। সরকারের উদ্যোগ শুভচিন্তাপ্রসূত হলেও মাঠ পর্যায়ে বিষয়টিতে যথাযথ মনোযোগ না দিলে সংক্রমণের ঝুঁকি না কমে বরং বাড়বে। গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ ধরণের আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে।
বলার অপক্ষো রাখেনা যে, নিম্ন আয়, হতদরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে আয়-রোজগারের তাগিদও আছে। এ কারণে তাদের ঘর থেকে বের হতে হয়। ফলে সাধারণ মানুষকে ঘরে বদ্ধ করে রাখা দায় হয়ে পড়েছে। আবার দেশ ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিরা যেখানে দুস্থদের ডেকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন, সেখানে গণমাধ্যমের লোকজন গেলে ফটোসেশনের জন্য নেতাকর্মীদের ভিড় লেগে যাচ্ছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। দৃশ্যত তাঁরা মানুষকে সহায়তা করছেন, প্রকৃত বিচারে মানুষকে আরো ঝুঁকিতে ফেলছেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোও মহাসড়কে বা অলিগলিতে গিয়ে মানুষ জড়ো করে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে। কারো মাথায় ঝুঁকির বিষয়টি কাজ করছে বলে মনে হয় না। এছাড়া ধর্মীয় মসজিদ, উপসনালয়, এমনকি বরুনী ¯ম্লান এর কোন কর্মসূচি পালন না করতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানোর পরও ভক্তরা তা মনে নি। ভারতের তাবলীগের ইজতেমা নিজাম উদ্দীন মারকাজ ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলোকে কী এক খারাপ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে-তা আমাদের ভাবার বিষয়। আমরা লক্ষ্য করেছি, শুরুতে কয়েকদিন সরকারের দেয়া বিধি মান্য করা হলেও এখন মানুষ অস্থির হয়ে পড়েছে, বাইরে বেরোতে শুরু করেছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষও নানসা অজুহাতে বের হচ্ছে । নগরের রাস্তায় বেড়েছে ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল। গ্রামাঞ্চলের বাজারগুলোতে মানুষের পদচারণ বেড়েছে। হাট-বাজারে চায়ের আড্ডা চলছে।
সামগ্রিক চিত্রটি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃস্টি করছে। সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের সতর্কতা আগে দরকার। সরকারি প্রশাসন, রাজনীতিকদের, জনপ্রতিনিধিদের মাঠে থাকতে হবে, ফটো তোলার জন্য নয়, বরং বিধি কার্যকর করার জন্য। খাদ্যসামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের জন্য নগদ অর্থ বরাদ্দ করার কথাও ভাবতে হবে।