অসুস্থ ও বয়স্ক বুথ; অতঃপর !

6

যুগে যুগে মানবজাতি অসুস্থ ও প্রবীণদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত বিশ্বে অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষের প্রতি দরদ ও মানবিকতা আরও বেশি বেশি বেড়েছে। আজকে অসুস্থদের নিয়ে লিখতে চাই না। অসুস্থদের নিয়ে লিখতে হলে হালনাহাদ তথ্য উপাত্ত যেমন প্রয়োজন তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কিত তথ্যাবলীও সন্নিবেশিত করা আবশ্যক। এ কথা সত্য যে প্রবীণদের মাঝে অসুস্থতার হার বেশি। প্রবীণ বয়সে সকল জীব মাত্রই শারীরিক নানাবিধ জটিলতায় আক্রান্ত হতে দেখা যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের অবহেলিত প্রবীণগণ নানা অসুস্থতায় জর্জরিত শুধু নয়। সামাজিক ও আর্থিকভাবে হাজারা জটিলতার সম্মুখীন। অতি সাম্প্রতিক জনগণনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের সতের কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় দুইকোটি প্রবীণ জনগোষ্ঠি আছেন। প্রতি বৎসর জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী পহেলা অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসটি বাংলাদেশেও পালিত হয়। চলতি বৎসরের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের থিম ছিল প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার প্রতিশ্রæতি পূরণ করা। বিশ্বব্যাপী প্রবীণদের গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ১৯৯১ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সূচকে উন্নতি করায় দেশে প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমেক্রমে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য হিসাবে দেশে বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু ৭১ বছর ছয় মাস। আর দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের জনগোষ্ঠি প্রবীণ হিসাবে গণ্যকরা হয়। তথ্যমতে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠির সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় চার কোটি। দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, দেশের প্রবীণদের ৬০ শতাংশ দারিদ্রের কারণে মৌলিক চাহিদা পূরণের সামর্থ্যহীন। সঙ্গত কারণে প্রবীণবয়সে তাঁরা সেবা শুশ্রæষাসহ খাদ্য বাসস্থান ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। অথচ দেশে প্রবীণদের স্বার্থ রক্ষার্থে কয়েকটি আইন বিদ্যমান।
যে শিরোনামে আজকের লেখা শুরু সে প্রসঙ্গে আশা যাক। বাংলাদেশি নাগরিক হিসাবে আমার একটি বৈধ পাসপোর্ট আছে। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাসপোর্ট অফিসে যেতে হয়। যাওয়ার আগে লোকজন জানালো যে, আপনার অফিসে গিয়ে লাইন ধরতে হবে না। ওখানে সিনিয়র সিটিজেনদের নামে আলাদা বুথ আছে। গিয়ে দেখলাম বুথটি হচ্ছে ‘ অসুস্থও প্রবীণবুথ’ নামে। দেখা গেল বুথ আছে ঠিক তবে সেখানে দায়িত্বরত কর্তা অপ্রবীণ ও অসুস্থদের সেবাদান করেছেন। কার্যত: ঐ বুথে অসুস্থ ও প্রবীণদের সাথে জোয়ানতাগড়া ব্যক্তিও লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা গ্রহণ করছেন। পাসপোর্ট অফিসের শত নিয়ম অনুযায়ী যাঁর পাসপোর্ট তাঁকেই লাইনে দাঁড়াতে হবে। অতএব জোয়ানদের সাথে কোন অসুস্থ বা প্রবীণ ছিল না। অতএব বোঝা যায় ‘ডালকে কুছ কালা হায়’। যাই হোক গড়াতে গড়াতে কাউন্টারে যাওয়া মাত্রই সেবাদানকারী ব্যক্তির কর্কস ভাষণ ও নানাবিধ ছতা নাতায় জর্জরিত হতে থাকি। এর কারণ হলো প্রবীণ কাউতে অপ্রবীণদের দেখে আমার আপত্তি জানানো। প্রবীণগণ কারো দয়া বা সাহায্য চান না। তিনি দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ন্যায্য দাবি রাখেন।
যাইহোক ফরম জমা দেওয়ার পর ছবি ও ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়ার পালা। বর্ণিত কক্ষের সামনে গিয়ে দেখি শতাধিক মানুষের লাইন। প্রবীণ ও অসুস্থদের জন্য আলাদা কোন লাইন বা কেউ নেই। হায়রে কষ্ট। প্রবীণগণ দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম নয়। ফলত দেখা গেল ফ্লোরে বসে, লাঠিতে ভর দিয়ে তিনবাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সেখানে অসুস্থ ও প্রবীণদের জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা নাই।
এশুধু চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিসের ক্ষেত্রে নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাস বিল, ব্যাংকে টাকা তোলা, ট্রেন বাসের টিকেট ক্রয়সহ সামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবীণদের প্রতি অসৌজন্য ও অবহেলা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে অহরহ। এ যেন আমাদের সামাজের দৈনন্দিন চিত্র। বিশেষ করে চিকিৎসা বা ল্যাবে সেম্পল দেওয়ার ক্ষেত্রে তা আরও বেশি দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। এ সকল ক্ষেত্রে প্রবীণদের জন্য কোন ডিসকাউন্ট বা ছাড় নেই। অথচ আমাদের পাশের দেশগুলোতে তা আদৌ প্রবীণগণ কারো দয়া দাক্ষিণ্য চায়না। তাঁরা সমাজের প্রতি যে সেবা দিয়েছেন, আজ অসামর্থ্য সময়ে তাঁর অধিকার বাস্তবায়ন চান। আসুন প্রবীণদের যথাযথ মূল্যায়ন করি। তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করি।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব)