অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি হতাশাজনক

6

 

বাংলাদেশ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল নজির; যেখানে সব ধর্মের লোকরা যুগ যুগ ধরে শান্তিতে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে প্রশংসিত। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলাদেশে চমৎকার একটা পরিবেশ বিরাজ করছে বহু বছর ধরে। সবার মাঝে গড়ে উঠেছে ভাতৃত্বের বন্ধন। ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই দেশের স্বাধীনতার জন্য ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ঢেলে দিয়েছিল বুকের তাজা রক্ত। এ দেশের মুসলমানরা বিপদে হিন্দুদের আশ্রয় দিয়েছে, প্রাণ বাঁচিয়েছে। এ দেশে ঈদ ও পূজা পাশাপাশি পালিত হয়। এই দুই উৎসব এখন সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিদেশ থেকে যারাই এসেছেন তারা আমাদের এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করেছেন। এমন নজির পৃথিবীতে বিরল।
অপ্রিয় হলেও সত্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এ দেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। উগ্রপন্থিরা সামান্য অজুহাতে তাদের ওপর হামলা করছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এ নিয়ে শোরগোল হয়। আবার একসময় তা মিইয়ে যায়। আবার হামলা হয়। বারবার হামলা হওয়ার কারণ, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হয় না। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’র প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মন্দিরে হামলা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং নির্যাতনের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে সমাবেশ করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় চোখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক। সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্যের সামনে প্রতিবাদ জানিয়ে কিছু সময় অবস্থান করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান।
তিনি বলেন, দেশজুড়ে গত কয়েক দিন ধরে হিন্দু স¤প্রদায়ের জানমাল, ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জ্ঞাপন করি।
এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, রংপুরে পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের উত্তর করিমপুর কসবা মাঝিপাড়া গ্রামে রোববার রাতে (১৭ অক্টোবর) দুর্বৃত্তের দেওয়া আগুনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ৩০টি বাড়ির ৬০টি ঘর পুড়ে গেছে। এ সময় নগদ অর্থ, মূল্যবান দ্রব্য, গরু-ছাগল লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় পুলিশ ২০ জনকে আটক করেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের খাবার ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কুমিল্লা, রংপুর ও নোয়াখালীতে যে ঘটনা ঘটানো হয়েছে তা একই সুতোয় গাঁথা বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নয় বছরে হিন্দুদের ওপর সাড়ে ৩ হাজারের বেশি হামলার তথ্য দিলেও প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বলে দাবি করেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত। দুর্গাপূজার মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার একটি মন্ডপে কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে বেশ কয়েকটি মন্ডপ ও স্থাপনা ভাঙচুর হয়। তার জের ধরে তিন দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭০টি পূজামÐপে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ হিসাব দেয়। অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেজনক। এর অবসান হওয়া জরুরি। ধর্মীয় বিবেচনায় নয়, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। জাতীয় কবি সাম্যের কবি মানবতার কবি নজরুল তার কান্ডারি হুঁশিয়ার কবিতায় বলেছেন, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারি বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র।’
সংখ্যালঘুদের ওপর এসব হামলার পেছনে আছে সাম্প্রদায়িক শক্তি। তারা এসব হামলার মাধ্যমে তাদের শক্তির জানান দিতে চায়। এটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য হুমকি। এসব হামলা রুখতে প্রশাসনের ব্যর্থতা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। হামলা রুখতে সব অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে এক হতে হবে। এসব হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, পরিকল্পিত। ঘটনা ঘটলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সেটি আর হয় না। প্রকৃত ব্যবস্থা নিলে এভাবে হামলার পুনরাবৃত্তি হতো না। দেশের সংখ্যালঘুদের মূল্যহীন করে রাখতে চায় একটি উগ্রবাদী চক্র। এই চক্র সবসময় সক্রিয় রয়েছে। এদের প্রতিহত করতে হবে।
বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য সরকারকে আরো উদ্যোগী ও আন্তরিক হতে হবে। কোনোভাবেই কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠীর দ্বারা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। যারা আমাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাচ্ছে তারা দেশ, জাতি ও সব ধর্মের শত্রু। এই ধরনের উদ্বেগজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
১৯৯২ সালে যখন ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়, তখন এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। ওই সময়ে দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০০১ সালে নির্বাচনের পরও এ দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করা হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর পূর্ণিমা শীল ধর্ষণসহ সারা দেশে সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের ওপর ঘটে যাওয়া বীভৎস ঘটনাগুলো। এ ছাড়া কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধদের বাড়িঘর, উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ-ভাংচুর, যশোরের পালপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘু নির্যাতন, গাইবান্ধায় আদিবাসীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের সম্প্রীতির ক্ষেত্রে কলঙ্কজনক আঁচড় হয়ে আছে, এ বিষয়গুলোও বহুল আলোচিত। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, বাড়িঘর দখলের বিষয়টিও কম আলোচিত নয়। অবশ্য শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ব্যাপারে তৎপর রয়েছে। যেখানেই ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে সেখানেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হস্তক্ষেপ করেছেন। বিশেষ করে পূজা হ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একটা অসা¤প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশকে গড়তে চাই। উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই। সোনার বাংলাদেশ গড়তে চাই। যে দেশে কোনো অন্যায় থাকবে না, অবিচার থাকবে না, মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচবে; সেটাই আমি চাই। তার এই চাওয়ার প্রতিফলন ঘটুক।
মনে রাখতে হবে, বর্তমানে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে শামিল হতে চলছে, বিশ্বের কাছে মানবতার রাষ্ট্র হিসেবে প্রশংসনীয় হয়েছে মিয়ানমার সরকারের ভয়াবহ নির্যাতনে আশ্রয়হীন ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে তাদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করে ‘বিশ্ব মানবতার বিবেক’ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে বাংলাদেশ। একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার অবদান আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইতোমধ্যে তিনি শান্তি, গণতন্ত্র, স্বাস্থ্য ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, দারিদ্র্য বিমোচন, উন্নয়ন এবং দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ভূষিত হয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ অসংখ্য পদক, পুরস্কার আর স্বীকৃতিতে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক, বিশ্বে প্রভাবশালী নারী প্রধানমন্ত্রী, অনুকরণীয় অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশে রেকর্ড পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে। শুধু আর্থিক বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, দেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল হয়েছে, বাল্যবিয়েসহ বিভিন্ন রকমের সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। শুধু দেশেই নয়-আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার কাজের স্বীকৃতি মিলেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি এবং গণতন্ত্র বিকাশে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার অবদান অপরিসীম ও অতুলনীয়া। তার দূরদৃষ্টি, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমুখী কার্যক্রমে দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি বিনষ্ট হয় তা হলে দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে আন্তর্জাতিক বিশ্বে। এটা হতে দেয়া যাবে না।
বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষা ও দেশের সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি রক্ষার জন্য সরকারকে আরও উদ্যোগী ও আন্তরিক হতে হবে। আমাদের এটা মনে রাখতে হবে একটি বিশেষ মহল বাংলাদেশ বিরোধী অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। এরা একাত্তরের পরাজিত শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। তারা সুযোগ পেলেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাদের সফল হতে দেওয়া যাবে না। ‘সম্প্রীতি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের বিকল্প নেই’ এ কথা বলা হচ্ছে বারবার। আমিও তাই মনে করি। দেশে সম্প্রীতি রক্ষা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এদের মোকাবিলা করতে হবে। কারণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো ঘটনা বাংলাদেশে ঘটতে দেয়া যাবে না। কারণ এর ক্ষত ভারতীয় উপমহাদেশের গায়ে লেগে আছে কলঙ্কতিলক হিসেবে। এ জন্য সবার মধ্যে দেশপ্রেমকে জাগ্রত করতে হবে। অর্জন করতে হবে উদার মানসিকতা ও সংস্কৃতি। এটাই হোক সকলের প্রত্যাশা।

লেখক : প্রাবন্ধিক