অসম্ভবকে সম্ভব করলো নারী ফুটবলার এবং একটি ঐতিহাসিক জয়

11

সুপ্রতিম বড়ুয়া

ফুটবলে হিমালয় জয় করা আমাদের মেয়েরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল অনেক মেয়েই জীবিকার তাগিদে ফুটবলে নাম লিখিয়েছেন। সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও ছিল। কিন্তু এই মেয়েরা যে অদম্য। সব বাধা পেরিয়ে আসা সানজিদা-শিউলিরা জানেন কীভাবে জীবন যুদ্ধে জিততে হয়। নেপালকে তাদেরই মাঠে হারানো যুদ্ধ জয়ের মতোই। সেই যুদ্ধ জয়ে প্রতিটি নাম খোদাই করা থাকবে বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসের পাতায়। এক সময় দেশের মহিলা ফুটবল নিয়ে হাসাহাসি করা হতো! অথচ এখন চারিদিকে প্রশংসা। অদম্য নারীরা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, কুসংস্কার বিভিন্ন ধরনের বাধা-বিপত্তি জয় করে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের স্বপ্নকে বড় করেছেন। এরা পরিচিত হয়েছেন সাহসী সংগ্রামী নারী হিসেবে। ক্রীড়াঙ্গনে তাদের সাফল্য অগ্রযাত্রার ইতিহাস। নানা কুসংস্কারের কারণে আমাদের দেশের ক্রীড়াঙ্গন থেকে মেয়েরা প্রায় নির্বাসিত। এটাকে বলা যায় ‘সুপরিকল্পিত কুসংস্কার’, ক্ষমতা ধরে রাখার একচ্ছত্র অবলম্বন। এমন ভাবনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের নারী ক্রীড়া। এ দেশের মেয়েদের খেলার মধ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থা ফুটবলের। স্বাভাবিক। যে দেশে মেয়েদের পর্দা আর রান্নাঘরের মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয় সেখানে মেয়েদের ফুটবল নিতান্তই ‘অলীক’। প্রগতিশীল সামাজিকতার আড়ালে আটপৌরে সংস্কৃতি চিরকালীন বৈষম্যের প্রতীক; সেখানে নারীদের খেলায় অংশগ্রহণ মানেই সামাজিক অবরোধ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করলেও আমাদের দেশের মানুষের মানসিকতা এখনও মেয়েদের খেলাধুলাকে তেমনভাবে সমর্থন করে না। মেয়েদের ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট এমনকি ভারোত্তোলনও সামাজিক সমর্থন পায় না। সেখানে নারী ফুটবলারদের অত্যন্ত কৃতিত্ব দেখিয়ে সাফ পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা নিঃসন্দেহে গৌরবময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। নিষ্ঠুর সামাজিক পরিবেশ থেকে উঠে এসে মেয়েরা যখন বিশাল অতিক্রমণের ইতিহাস তৈরি করেন তখন তারা হয়ে ওঠেন নারীত্বের আলাদা অভিজ্ঞান।
ফুটবলে বাংলাদেশে নারীদের উত্থানও তেমনই এক অবিস্মরণীয় আখ্যান। দেশের জন্য এই অনন্য গৌরব বয়ে আনা এই ফুটবল দলের সদস্যদের এই পথ চলাটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। অন্তত আমাদের মত পশ্চাদপদ, মৌলবাদী ধ্যানধারণাপুষ্ট বাংলাদেশে। একটি মেয়ে এবং তার শরীর এমনই নিরাপত্তার বলয়ে পরিবেষ্টিত, যা শেষ পর্যন্ত রক্ষণশীলতার নামান্তর। জার্সি পড়ে মেয়েরা খেলবে, দৌড়াবে, শরীর দোল খাবে, অংসখ্য লোলুপ দৃষ্টি তাকিয়ে দেখবে-অভিভাবকরা তা মানবেন কীভাবে? পুরুষ কোচও একটা বিরাট সমস্যা। যদি গায়ে হাত দেয়! কানে ফিসফিসিয়ে মন্ত্রটি পড়ে দেওয়ার জন্য বহু খালা-ফুপু মজুত থাকে। কী হবে খেলে? সেই তো বিয়ে করে বাচ্চা মানুষ করতে হবে! বেশি খেলাধুলা করলে মেয়েদের স্বাভাবিক শ্রী যদি নষ্ট হয়ে যায়!মেয়ে বলেই ‘হার্ডল’ এসেছে পদে পদে। ঘরে, বাইরে, জীবনের সর্বত্র। সমাজ, সংস্কার, পিছুটান অনবরত সামনে এগিয়ে চলার গতির পায়ে লাগাম পরানোর চেষ্টা করেছে। থমকে দিতে চেয়েছে এগিয়ে চলার গতি। কিন্তু অদম্য জেদ, অফুরান উৎসাহ-উদ্দীপনার কাছে তা হার মেনেছে বার বার। ‘মুখোশ’- এর যাবতীয় চক্রান্ত ভেস্তে দিয়ে মেয়েরাই হয়ে উঠছেন ‘মুখ’। আশা করি ভবিষ্যতও এই ধারা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশে নারী ফুটবল এখনও অস্পৃশ্য। অথচ নারী ফুটবলের সাফল্য আমাদের দেশে গর্ব করার মতো। নারীর ক্ষমতায়নের স্বার্থেও নারী ফুটবলকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া দরকার। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ফুটবলকে মেয়েদের জন্য পক্ষপাতমুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ সাফল্য ধরে রাখতে হলে উন্নত প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে মেয়ে ফুটবলারদের মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সারা দেশে তৃণমূল পর্যায় থেকে কিশোর-কিশোরীদের বাছাই করে নিয়মিত ফুটবলের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। ক্রিকেটে এ ধরনের উদ্যোগের সুফল পাচ্ছি আমরা। ফুটবলের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেওয়া হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ খেলায় আমাদের ব্যর্থতা ঘুচবে অবশ্যই। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় খেলা ফুটবলকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। আশা করি, কর্তাব্যক্তিরা এবার আরেকটু উদার ও মনোযোগী হবেন নারী ফুটবলের ব্যাপারে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে এভাবেই এগিয়ে যাবে আমাদের নারীরা। এগিয়ে যাবে লাল সবুজের আমাদের প্রিয় সুন্দর দেশটিও।কয়েক বছর আগেও জাতীয় নারী দলের প্রতি কর্তৃপক্ষের অনাদর বুঝিয়েছে। এটা এমন যৌথ পরিবার যেখানে বেশিটা পাওয়া, বড়টা খাওয়া, ভালোটা পরার অগ্রাধিকার পুত্রসন্তানটির। জাতীয় দলের মেয়েদের ডায়েট, ট্রেনিং, কিটস সবেতেই কার্পণ্য। কোনও বাণিজ্যিক সংস্থা মেয়েদের জার্সিটি পর্যন্ত স্পনসর করত না। অথচ আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং -এ বরাবর নারী দল পুরুষ দলের থেকে অনেক সন্তোষজনক স্থানে। জাতীয় পুরুষ দলের বিলাসের পাশে মেয়েদের ফুটবলের প্রতি এই অবহেলা দেশের সমাজচিত্রে পৌরুষের জয়গান। আমাদের দেশে মেয়েদের খেলাধুলা করাটা মোটেও সহজ কোনো ব্যাপার নয়। কারণ অনেক জায়গায় মেয়েদের খেলার কোনো সুযোগই নেই। অনেক ক্ষেত্রে তারা ফুটবল শিখতে চাইলেও বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষকদের তেমন উৎসাহ থাকে না। গ্রামের মাঠেও মেয়েরা খেলার জায়গা পায় না। অনেক মেয়ে আছে যারা জীবনে ফুটবলে একটা লাথি দেয়ার সুযোগ পর্যন্ত পায়নি। এই সমস্যা সমাধানে কী করা উচিত? ছোট থেকে ফুটবল চর্চার সুযোগ তৈরি করা। স্কুলগুলোতে মেয়েদের খেলার সুযোগ করে দেওয়া। ছোট থেকে মেয়েদের মাঠে আনার কাজটিও সেই সঙ্গে করতে হবে। আন্তঃস্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুলপর্যায়ে প্রতিযোগিতা শুরু হলে মেয়েদের ফুটবল খেলায় আগ্রহ বাড়বে। উপজেলা, জেলা, ও বিভাগীয় পর্যায়ে ফুটবল প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকলে মেয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাটাও চালিয়ে যেতে পারবে। খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খেলার মাধ্যমে মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। এতে মেয়েদের সামাজিক উন্নতি ঘটবে। সমাজের সর্বাঙ্গীন উন্নতিতে সাহায্য করবে। সুযোগ বাড়ালে অংশগ্রহণ বাড়বে। আর অংশগ্রহণ বাড়লে সাফল্যও আসবে। পরিশেষে আবারও স্যালুট জানাই বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলকে! তারা অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। এখন প্রয়োজন নারী ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন মহলের সর্বাধিক সমর্থন এবং সহযোগিতা। এ ক্ষেত্রে যে উপাদানটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো সরকারের আর্থিক অনুদান এবং বড় বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক