অসচেতনতায় বজ্রপাতে প্রাণহানি বাড়ছে

6

তুষার দেব

কৃষিকাজসহ জনজীবনে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং অসেচতনতা বা সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণেই চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে বজ্রপাতে প্রাণহানি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধির বিপরীতে উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াকেও বজ্রপাতে প্রাণহানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। চলতি বছরের কেবল গত দশ মাসেই বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা অতীতের যে কোনও বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। বজ্রপাতের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ঠেকাতে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ছাড়াও সচেতনতা তৈরির উপরই বেশি গুরুত্বরোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, সর্বশেষ গতকাল বুধবার দুপুর একটার দিকে হাটহাজারীর ফতেয়াবাদ পূর্ব ছড়ারকুল এলাকায় বজ্রপাতে মো. মহসিন নামে এক যুবক প্রাণ হারিয়েছেন। পেশায় নির্মাণশ্রমিক মহসিন উপজেলার চিকনদন্ডী ইউনিয়নের মৃত নাছের আহম্মেদের ছেলে। এর আগে গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকালে উপজেলার দোহাজারী পৌরসভা এলাকায় মো. মারুফ (১৬) নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর প্রাণ কেড়ে নেয় বজ্রপাত। নিহত মারুফ দোহাজারী পৌরসভার জামিজুরী ঘোড়াপাড়া এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে। সে জামিজুরী রজবিয়া আজিজিয়া সুন্নিয়া ফাজিল মাদ্রাসার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিল। ক্ষেতে পরিচর্যার কাজ শেষে ওইদিন বিকাল আনুমানিক পাঁচটার দিকে বাড়িতে ফেরার সময় বৃষ্টির সাথে বজ্রপাত হলে মারুফ তাতে আক্রান্ত হয়। বজ্রাঘাতে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দোহাজারীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে গত ১১ বছরে দুই হাজার আটশ’ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বজ্রপাত। প্রাকৃতিক এ দুর্যোগে যাদের জীবন-প্রদীপ নিভে গেছে, তাদের বেশিরভাগই আক্রান্ত হওয়ার সময় খোলা মাঠ কিংবা বিল-হাওরে কৃষিকাজ করছিলেন। এর মধ্যে বিগত ২০১১ সালে বজ্রপাতে একশ’ ৭৯ জন, ২০১২ সালে দুইশ’ এক, ২০১৩ সালে একশ’ ৮৫, ২০১৪ সালে একশ’ ৭০, ২০১৫ সালে দুইশ’ ২৬, ২০১৬ সালে তিনশ’ ৯১, ২০১৭ সালে তিনশ’ সাত, ২০১৮ সালে তিনশ’ ৫৯, ২০১৯ সালে একশ’ ৯৮ এবং ২০২০ সালে দুইশ ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি বছরের কেবল গত প্রায় সাড়ে দশ মাসের মধ্যেই দেশে বজ্রপাতে মানুষের প্রাণহানি আগের যে কোনও বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। সরকারি হিসাবে, জানুয়ারি থেকে গত ১১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে প্রাণ গেছে তিনশ’ ২৯ জনের। পরবর্তী দু’দিনে প্রাণহানির তালিকায় আরও কয়েক হতভাগ্যের নাম যুক্ত হয়েছে।
বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের গত ৬ জুন চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে এক দিনেই দুই নারীসহ ছয়জনের প্রাণ কেড়ে নেয় বজ্রপাত। আহত হন আরও চারজন। আর সারা দেশে নিহত হন ১৭ জন। এর মধ্যে ফটিকছড়ি ও সীতাকুন্ড উপজেলায় দুই জন করে এবং বোয়ালখালী ও মিরসরাইয়ে একজন করে মারা যান। নিহতরা হলেন, সীতাকুন্ডের আব্দুল জলিল (৪০) ও এসকান্দার আলী (৬০), ফটিকছড়িতে লাকী দাশ (৩৮) ও ভানু শীল (৪০), মিরসরাইয়ে মো. সাজ্জাদ হোসেন (১৬) এবং বোয়ালখালীতে মো. জাহাঙ্গীর (৩৯)। আহতরা হলেন, মালতী রাণী দাশ (৫০) ও শোভা রাণী দাশ (৪৫), মোশারফ হোসেন (৫০) ও বদিউজ্জামান (১৮)। নিহতদের মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন স্কুল শিক্ষার্থী আর আব্দুল জলিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের শ্রমিক ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সীতাকুÐের সমুদ্র উপক‚লে প্রিমিয়ার শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন জলিল। ঘটনার দিন বিকালে তিনি ইয়ার্ডের গেটে দাঁড়ানো ছিলেন। এসময় হঠাৎ করে বজ্রপাতে আক্রান্ত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার পর তিনি মারা যান। এছাড়া, উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের গুপ্তাখালী বাঁধে এসকান্দার আলী নামে একজন বজ্রপাতে মারা যান এবং বদিউজ্জামান নামে একজন আহত হন। বিকালে দুইজনকে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক এসকান্দার আলীকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত এসকান্দার ও বদিউজ্জামান বিকালে গুপ্তাখালী বেড়িবাঁধের কাছ থেকে গরু আনতে গিয়েছিলেন। একইদিন সকালে ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর ওয়ার্ডের ডলু পাড়ায় বজ্রপাতে লাকী দাশ ও ভানু শীল নামে দুই নারী মারা যান। সকালে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে লাকী, ভানু শীল, মালতী রাণী ও শোভা রাণী ক্ষেত থেকে মরিচ তুলতে গিয়েছিলেন। এ সময় সেখানে বজ্রপাতে তারা দগ্ধ হন। চারজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে লাকী দাশ ও ভানু শীলকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। অন্য দুইজনকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিয়ে সারিয়ে তোলা হয়। তারা সকলেই পরস্পরের প্রতিবেশি। ওইদিন মিরসরাই উপজেলার সায়েরখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব ডোমখালী গ্রামে সাজ্জাদ হোসেন নামে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী মারা যায়। বজ্রপাতে আক্রান্ত হওয়ার সময় সাজ্জাদ তার বাবা মোশারফ হোসেনের সঙ্গে আবাদি জমিতে ধানের চারা রোপণ করছিল বজ্রপাতে তার বাবাও আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বোয়ালখালী উপজেলার জ্যৈষ্ঠপুরা এলাকায় পাহাড়ে লেবু বাগানে কাজ করার সময় জাহাঙ্গীর হোসেন নামে একজন বজ্রপাতে মারা যান। তারও আগে গত ২৩ মে রাতে আনোয়ারায় উপজেলার রায়পুরে নির্মাণকাজ শেষে বটতলি ইউনিয়নের পশ্চিম বরৈয়া গ্রামে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রঘাতে দুই শ্রমিক প্রাণ হারান। তারা হলেন, উপজেলার বটতলী ইউনিয়নের পশ্চিম বরৈয়া গ্রামের মো. ইলিয়াছ (৪০) ও মো. আবুল কাশেম (৩৮)।
দেশের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রণীত প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধসের মত ঘটনাগুলো আগে থেকেই তালিকাভুক্ত ছিল। বজ্রপাতে প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার বিগত ২০১৬ সালে এটাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। বজ্রপাতজনিত জানমালের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সারা দেশে তালগাছ রোপণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু তাতে বজ্রপাতে মানুষের প্রাণহানি খুব একটা কমেনি। বর্তমানে সরকার বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের মত ‘বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র’ করার পরিকল্পনা করেছে। চারশ’ ৭৬ কোটি টাকার ওই প্রকল্প মূলত দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে বাস্তবায়ন করা হবে।
বজ্রপাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ডিজাস্টার ফোরামের সমন্বয়কারী মেহেরুন নেসা ঝুমুর পূর্বদেশকে বলেন, আমাদের দেশে বজ্রপাতের ঋতু ও এলাকাভিত্তিক ভিন্নতা আছে। যেমন বর্ষা মৌসুমের আগের সময়টাতে দেশের হাওর এলাকায় বেশি বজ্রপাত হয়। বর্ষাকালে সারা দেশেই কমবেশি বজ্রপাত হয়, আর বর্ষার শেষে দেশের পাহাড়ি এলাকায় বেশি বজ্রপাত হয়। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিনা, সেটা খতিয়ে দেখা জরুরি। তা না হলে প্রকল্পের কার্যকর সুফল অর্থাৎ বজ্রপাতে প্রাণহানির মিছিল ঠেকানো যাবে না।