অশ্রুসিক্ত আগস্টের বয়ান

5

ফজলুল হক

শোকাবহ আগস্ট মাস শুরু হয়েছে। বিভিন্ন কারণে এই মাস বাঙালির জীবনে অত্যন্ত শোকাবহ। ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সকল সদস্য-বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল, মেঝ ছেলে শেখ জামাল, ছোট ছেলে শেখ রাসেল, কামাল ও জামালের স্ত্রী সুলতানা এবং রোজী, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসেরকে একই বাড়িতে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল। শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর পরিবার, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বিদেশে থাকায় বেঁচে যান। এই নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড ইতিহাসে বিরল। যেইসব সৈন্য হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু যারা এই হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলো তাদের চিহ্নিত করার কাজ এখনো বাকী আছে। আমাদের প্রশ্ন হলো বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মূল বেনিফিসিয়ারি কে? এবং কারা? এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা ১৯৭৫ সালে তৈরি করা হয়নাই। এই হত্যাকান্ডের চিন্তাভাবনা হয়েছিল পাকিস্তানের মাটিতে। এই হত্যাকান্ডের সাথে জুলফিকার আলী ভুট্টো জড়িত ছিল এবং পাকিস্তান, চীন ও আমেরিকা স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বকে মেনে নিতে রাজি ছিলো না। এই হত্যাকান্ডে কারা পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছিলো? তারা কি স্বাধীন বাংলাদেশকে পুনরায় ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলো? আমার মতো বয়সের কোন পাঠক যদি এই লেখা পড়েন আমি তাঁকে বলবো, ৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের যে অপপ্রচার চালানো হয়েছিলো সেই অপপ্রচারের মধ্যমণিরা ‘মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠার কথাও প্রচার করেছিলো। বঙ্গবন্ধুর মূল হত্যাকারী খন্দকার মোশতাক আওয়ামী লীগের ভিতরে বহাল তবিয়তে ওৎ পেতে বসেছিল। বঙ্গবন্ধুকে এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায় থেকে সাবধান করা হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু কখনো বিশ্বাস করেননি যে কোন বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে। ষড়যন্ত্রের এখানেই শেষ নয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যা করা এবং আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। এটা এখন খুবই পরিস্কার যে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পিছনে তৎকালীন বিএনপি সরকার রহস্যময় ভূমিকা পালন করেছিলো। যারা আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে চায় তাদের উদ্দেশ্য কি? তারা কি বাংলাদেশকে আবারো ইসলামী রাষ্ট্র বানাতে চায়? এই বিষয়ে আওয়ামী লীগ এবং প্রগতিশীল চিন্তার রাজনীতিবিদদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। আওয়ামী লীগ নেতারা বারবার বলছেন তাদের দলে ‘হাইব্রিড’, ‘কাউয়া’, ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘সুবিধাবাদী’রা ঢুকে পড়েছে। হেলেনা জাহাঙ্গীর, পাপিয়া, শাহেদ করিম, জি.কে শামীমরা তার প্রমাণ। আওয়ামী লীগকে যেখানে আদর্শের শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে হচ্ছে, ১৫ আগস্ট এবং ২১ আগস্টের মতো মরণঘাতি ঘটনারও মোকাবেলা করতে হচ্ছে, সে আওয়ামী লীগকে আরো বেশি সতর্ক হতে হবে। আদর্শের শত্রুরা আওয়ামী লীগের ঘাড়ের উপরে নিঃশ্বাস ফেলছে। যে ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছে, উনার পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করেছে, যেখানে ২১ আগস্টের মতো ঘটনায় আইভী রহমানসহ শতকর্মীকে প্রাণ দিতে হয়েছে, অলৌকিকভাবে বেঁচে না গেলে শেখ হাসিনাকেও সেইদিন প্রাণ দিতে হতো। সে আওয়ামী লীগ যদি সুবিধাবাদী মুক্ত না হয় তাহলে ভবিষ্যতে কি অবস্থা হবে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুর বিরোধীতা করলেও মার্কিন জনগন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ছিলো। তারা স্বাধীন বাংলাদেশকে সমর্থন করে ৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এ কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নামে একটি অনুষ্ঠান করেছিলো। যার মধ্যমণি ছিলো জর্জ হ্যারিসন, পন্ডিত রবিশংকর এবং ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁন। আবুল মাল আব্দুল মুহিতের মতো পাকিস্তানের তরুন কর্মকর্তারা পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষ অবলম্বন করে জনসমর্থন আদায়ে কাজ করেছিলো। স্বাধীন বাংলাদেশ খুব অল্প সময়ের মধ্যে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
এইবার অশ্রুসিক্ত আগস্টের সম্ভাব্য করোনা বিপর্যয়ের কথা বলি- কঠোর লকডাউনে মানুষ কেমন আছে? ঈদের পরে দুই সপ্তাহব্যাপী কঠোর লকডাউন চলছে। করোনা প্রতিরোধে লকডাউন একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা হলেও গ্রামে গঞ্জে মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করা সম্ভব হচ্ছেনা। লকডাউনের দুইটি সুফল আছে। প্রথমত-গণপরিবহন বন্ধ থাকায় গ্রামের মানুষ ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে আসতে পারেনা। শহরের মানুষ গ্রামে যেতে পারেনা। ফলে এলাকাভিত্তিক সংক্রমণের বিস্তার কমে যায়। দ্বিতীয়ত-লকডাউনের সময় জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে আসতে দেওয়া হয়না, তাই এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে সংক্রমণের আশংকা কমে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে কঠোর লকডাউনে এই দুটি সুবিধা কাজে আসেনি। মানুষ শহর থেকে গ্রামে যাচ্ছে বিভিন্ন অজুহাতে। আবার গ্রাম থেকে শহরে আসছে। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় গাদাগাদি করে ফেরি পার হচ্ছে এবং মোটর সাইকেলে, রিক্সা ও অটোরিক্সায় গাদাগাদি করে চলাচল করছে। অন্যদিকে শহরে বা গ্রামে মানুষ রাস্তাঘাটে ঘোরাঘুরি করছে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে। তার ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি লকডাউন সত্তে¡ও সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছেনা। দেশের প্রায় সবগুলি হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়ে আছে। কোথাও কোভিড রোগীর আসন খালি নাই। আইসিইউর সংকট চলছে। সংক্রমণ কমানোর ক্ষেত্রে লকডাউন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত একটি ব্যবস্থা হওয়া সত্তে¡ও আমাদের দেশে লকডাউন কার্যকর হচ্ছে না।
আমাদের দেশে অর্থনীতি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই মানুষের মধ্যে আয় বৈষম্য রয়েছে। কিছু মানুষ একবারেই হতদরিদ্র। গ্রামের এইসব হতদরিদ্ররা দিন এনে দিন খায়। কাজ না পেলে তাদের কষ্ট হয়। শহরের বস্তিতে নিম্নআয়ের মানুষেরা বাস করে। তাদের হাতেও খুব বেশি সঞ্চিত অর্থ থাকেনা। গত দেড় বছর ধরে করোনার দাপটের কারণে আরো দেড় কোটি মানুষ আয় রোজগার হারিয়েছে। সরকার দরিদ্র মানুষের জন্য সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে এটা সত্য। তারপরেও অতিবৃষ্ঠি, বন্যা, ভূমিধস এই সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষের উপরে এসেছে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। পনেরো দিন বা বিশ দিন লকডাউন চললে গণপরিবহন বন্ধ থাকে। লঞ্চ এবং মোটর শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়ে। রিক্সাচালক, ভ্যানচালক ভাড়া পায়না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বেচাবিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। দিনমজুরেরা কাজ পাচ্ছেনা। এই অবস্থায় আমরা দেখতে পাচ্ছি লকডাউন দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের জন্য দুঃখ-কষ্ট নিয়ে আসে। তাই লকডাউন না মেনে মরিয়া হয়ে গরিব মানুষ কাজের খোঁজে বের হয়। আমাদের দেশে লকডাউন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে এইসব মানুষকে খাবার দিয়ে সাহায্য করতে হবে। আমাদের দেশে কতগুলি সেক্টর গত দেড় বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। যেমন-স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার ও বিবাহের ক্লাব, বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র, রিসোর্ট এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ, লঞ্চ, বাস, ট্রাক এইসব কর্মক্ষেত্রে যেসব শ্রমিক কাজ করতো তারাও একটানা কোন কাজ ছাড়া পনেরো বিশ দিন ঘরে বসে থাকতে পারবেনা। তাদেরকেও খাদ্য সাহায্য দিতে হবে। চিকিৎসা এবং ওষুধপত্র দিতে হবে। একা সরকারের পক্ষে এতো মানুষকে প্রতিদিন খাবার দেওয়া সম্ভব নয়। তবুও তাদের জন্য সরকারি ত্রাণ কমবেশি আসছে। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি গত দেড় বছরে করোনার প্রাক্কালে বাংলাদেশ পোষাক রপ্তানি খাতে কিছুটা বেশি ক্রয়াদেশ পেয়েছে। গার্মেন্টস রপ্তানিও বেড়েছে। উন্নয়ন কাজ এবং বড়ো বড়ো প্রকল্পগুলি চালু থাকায় ঠিকাদারদের আয় রোজগারও বেড়েছে। ওষুধ এবং মেডিকেল সামগ্রীর ব্যবসা ভালো হয়েছে। প্রাইভেট হাসপাতালগুলির কার্যক্রমও চালু ছিল। অর্থনীতিবিদগণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছেন করোনাকালে ধনী আরো বেশি ধনী হয়েছে। তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়েছে। সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে। ব্যাংক হিসাব পর্যবেক্ষণ করে পর্যবেক্ষকগণ বলেছেন গত এক বছরে ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকা আছে এমন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে আমরা বলতে পারি করোনার মধ্যে বাংলাদেশে ধনী আরো ধনী হয়েছে, গরিব আরো বেশি গরিব হয়েছে। লকডাউন একটি বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা হলেও আমরা লকডাউন থেকে বেশি সুবিধা আদায় করতে পারবো বলে মনে হচ্ছেনা। সরকার ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলো কিন্তু গার্মেন্টস মালিকদের অনুরোধে ১ আগস্ট থেকে রপ্তানিমুখী শিল্প খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। বিজিএমইএর সভাপতি ৩০ জুলাই বলেছিলেন গার্মেন্টসে যেসব শ্রমিক শহরে আছে তাদেরকে দিয়ে কারখানা ৫ আগস্ট পর্যন্ত চালানো হবে। যেসব শ্রমিক গ্রামে চলে গেছে তারা দুএকদিন পরে আসলেও চলবে। তাদেরকে ১ তারিখ আসতে বাধ্য করা হবেনা। কিন্তু আমরা দেখতে পেয়েছি ৩১ জুলাই গার্মেন্টস শ্রমিকেরা দলে দলে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে শুরু করেছে। গণপরিবহন না থাকায় তাদের রাস্তায় কষ্ট হয়েছে।
হঠাৎ করে ১ আগস্ট থেকে গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার কারণে দলে দলে শ্রমিকেরা তাদের কর্মস্থলে আসতে শুরু করায় রাস্তায় রাস্তায় অমানবিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ এই পরিস্থিতিতে সড়কে যে ভোগান্তি শ্রমিকদের সহ্য করতে হয়েছে তা বর্ণনাতীত। শ্রমিকরা সাংবাদিকের কাছে বলেছে যে কিছু কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের অফিস থেকে শ্রমিকদেরকে তাদের মোবাইলে ক্ষুর্ধে বার্তা দিয়ে বলেছে ১ আগস্টের সকালে কাজে যোগদান না করলে শ্রমিকদের চাকুরি থাকবেনা। তাই বাধ্য হয়ে শ্রমিকরা ছোট যানবাহনে বেশি ভাড়া দিয়ে ঢাকার দিকে যাত্রা করেছে। সরকারের সাথে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর কথা ছিল যেসব শ্রমিক গ্রামে চলে গেছে তাদের ৫ তারিখের আগে ফিরতে বাধ্য করা হবে না। বিজিএমইএর সভাপতি নিজে টিভি সাক্ষাতকারে একথা বলেছেন। তাহলে গ্রাম থেকে ১ আগস্ট শ্রমিকদের ফিরতে বলা হলো কেনো?
লকডাউন নিয়ে অব্যবস্থাপনার কারণে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। তার মধ্যে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গু এবং করোনা একত্র হয়ে মানুষের উপর আক্রমণ চালালে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার পক্ষে সেই ভার বহন করা সম্ভব কি-না তা নিয়ে আমি চিন্তিত। করোনা যুদ্ধে ফ্রন্টলাইনে কাজ করা ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, সিস্টার, ওয়ার্ড বয়রা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাদের পক্ষে এই ভার বহন করা আর কতদিন সম্ভব? পুলিশ, সাংবাদিক, সেনাবহিনী, ম্যাজিস্ট্রেট, প্রশাসনের লোকজন ও জনপ্রতিনিধি প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের মধ্যেও অনেকে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এই আগস্ট মাস আমাদের জন্য বিপর্যয়কর হবে কিনা সেটিও একটি প্রশ্ন।

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, কলামিস্ট