অর্ধ লক্ষাধিক শীতার্ত মানুষের জন্য বরাদ্দ ৩,৯২০টি কম্বল

5

মো. নুরুল করিম আরমান, লামা

হাড়কাঁপানো শীত পড়ছে সারাদেশে। শহর আর গ্রামে এই শীতের তারতম্য রয়েছে। আর পাহাড়ে এই শীতের কামড় অসহনীয়। শীঢতের এমন দাপট বান্দরবান জেলায়ও। পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যেতেই শীতের যেন একচ্ছত্র রাজত্ব। লামা উপজেলায় শীতের তেমনই দাপট। সন্ধ্যার পর থেকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি পল্লীগুলো। আর সেটি অব্যাহত থাকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত। কোন কোন সময় দুপুর পর্যন্ত সূর্যের দেখাও মেলে না। গত কয়েকদিন ধরে এ ঘন কুয়াশা ও শৈত্য প্রবাহে বিরাজ করছে লামায়। শীতের তীব্রতায় দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষের জবুথবু অবস্থা। আবার শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবও। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। দরিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী এখানকার অধিকাংশ অধিবাসীরা প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে রয়েছেন অতিকষ্টে। শীত নিবারণের জন্য দুর্গম পাহাড়ে বসবাসরতরা খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন বয়োবৃদ্ধ ও শিশুরা। আবার কেউ কেউ গরম কাপড়ের দোকানে দিকে ভিড় জমাচ্ছেন।
উপজেলায় অর্ধ লক্ষাধিক শীতার্ত মানুষের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯২০টি কম্বল। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। গত বছর বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৬৬৪টি কম্বল।
সূত্র জানায়, বর্তমানে লামা উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এদের মধ্যে অর্ধ লক্ষ মানুষ মানুষ দরিদ্র ও শীতার্ত। গত মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে উপজেলায় শীতের তীব্রতা শুরু হয়। আস্তে আস্তে এ তীব্রতা বেড়ে চলেছে। সমতলের চেয়ে পাহাডি এলাকা হওয়ায় এখানে শীতের তীব্রতা বেশি। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই পাহাড়ি জনপদে তীব্র শীত জেঁকে বসে। সেই সঙ্গে বাড়ে কুয়াশাও। দুপুর পর্যন্ত শীত ও কুয়াশা অব্যাহত থাকার কারণে নিম্ন আয়ের পাথর শ্রমিকরা কাজে বের হতে পারেন না। এছাড়া বাগান এলাকায় কর্মরত শ্রমিকরাও দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ঠান্ডা বাতাসের কারণে ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধরা নিউমোনিয়া ও কাশিসহ ঠান্ডাজনিত রোগে ভুগছে। শীত নিবারণে এ পর্যন্ত সরকারিভাবে পৌরসভা এলাকার জন্য ৪৯০টি ও প্রতি ইউনিয়নে ৪৯০টি করে ৭টি ইউনিয়নের জন্য ৩ হাজার ৪৩০টি কম্বল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট জানিয়েছেন। অথচ উপজেলায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় দরিদ্র সীমার নিচে বাস করছে বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
কুয়াশার কারণে বিশেষ করে রাতের বেলা ও ভোর বেলায় লামা-চকরিয়া সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।
জিপ চালক ওসমান গনি শিমুল জানান, দুপুর পর্যন্ত লামা-চকরিয়া সড়কের কয়েকটি এলাকা কুয়াশায় ঢেকে থাকে। অনেক সময় গাড়ির সামনে হেড লাইট জ্বালিয়েও ১৫-১৬ ফুটের বেশি দেখা যায় না। এমন কুয়াশায় এখন গাড়ি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
এখানকার খেটে খাওয়া মানুষগুলো জানান, প্রচন্ড শীতের তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। প্রতিবছর এভাবেই শীতের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। এতে জীবনযাত্রা হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে জ্বালিয়ে আগুনে শরীর গরম করে শীত নিবারণের চেষ্টা করেন তারা।
ছোট বমু হেডম্যান পাড়ার নারীরা বলেন, আমাদের পাড়ার সবাই গরিব। চাহিদামতো শীতের কাপড় কেনা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারিভাবে যদি আমাদেরকে কম্বল দিয়ে সহায়তা করা হয় তাহলে ভালো হতো।
পাহাড়ি নারী হ্লামাউ মারমা, উমে মারমা বলেন, অন্যবারের চেয়ে এ বছরে বেশি শীত পড়ছে। শীত থেকে রক্ষা পেতে আমরা আগুন জ্বালিয়ে তাপ নিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, বেশি শীত পড়লেও আমরা এখানে যারা বসবাস করছি তাদের খবর কেউ রাখে না। আমরা চাই সরকার আমাদের শীতবস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করুক।
পাহাড়ি মংহ্লা চিং মারমা, বাবু মং মার্মা ও জয় মার্মা বলেন, বেশি শীত পড়ছে। আমাদের গরম কাপড় যা আছে, তা দিয়ে শীত ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
লামা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মিন্টু কুমার সেন বলেন, আমার ইউনিয়নে আনুমানিক দুই হাজারেরও বেশি গরিব ও দুস্থ শীতার্ত মানুষ রয়েছে। কিন্তু ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ মিলে শীত বস্ত্র কম্বল বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র ৬৫০পিস। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনো অনেক মানুষ শীতার্ত রয়েছে। একই অবস্থা অন্য সব ইউনিয়নগুলোতেও বিরাজ করছে বলে জানান জনপ্রতিনিধিরা। তারা শীতার্তদের শীত নিবারণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসার আহবান জানান।
এ বিষয়ে লামা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, চলতি শীত মৌসুমে উপজেলার একটি পৌরসভা ও সাত ইউনিয়নের দুস্থ ও গরিবদের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার থেকে ৩ হাজার ৯২০টি কম্বল বরাদ্দ দেয়া হয়। ইতিমধ্যে এসব কম্বল শীতার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তরও করা হয়েছে।