অরক্ষিত রেলক্রসিং দেখার কেউ নেই!

3

রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক হচ্ছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হচ্ছে, রেললাইন সম্প্রসারণ হচ্ছে, নতুন নতুন স্টেশন হচ্ছে, ভারতের সাথেও যুক্ত করা হচ্ছে- এমনটি সংবাদ দেশবাসীর মন আশা ও উচ্ছ¡াসে ভরে গেলেও রেলক্রসিংগুলোতে প্রায়সময় দুর্ঘটনার খবর অনুরূপ আশাহত করে। মন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর রেলের সেই পুরনো উপাখ্যান সামনে আসে। একেকটি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবহেলার চিত্র সংবাদপত্রে উঠে আসে। অবস্থা দেখে মনে হয়, রেলের আধুনিকায়ন কাজির খাতায় আছে গোয়ালে নেই দশা! গত শুক্রবার দুপুরে মিরসরাই মাইক্রোবাস ও রেলের ভয়াবহ সংঘর্ষে যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে তাতে ১১জন তরুণ ঘটনাস্থলে মারা যান। যে কয়জন আহত হন, তাদের অনেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। এ দুর্ঘটনা তদন্তে বেশ কয়েকটি কমিটি কাজ করছে। তবে এর আগে গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ চলছে। গতকাল সোমবার দৈনিক পূর্বদেশে এ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাঁশ দিয়ে বেরিকেড, পতাকা দেখিয়ে সিগন্যাল সাথে গেটম্যানের উদাসীনতাই রেলক্রসিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এককথায় অরক্ষিত ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটে চলেছে। অথচ এগুলো সুরক্ষিত করার কোনো তাগিদ নেই।
বাংলাদেশের রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা পশ্চাদপদতায় রয়েছে, কতটা অরক্ষিত এবং এর নিরাপত্তাব্যবস্থা যে কত ঠুনকো, তার এক মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে মিরসরাই এর এ দুর্ঘটনা। জানা গেছে, ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় হাজারো মানুষ মারা গেলেও তার মধ্যে শুধু লেভেল ক্রসিংয়ে মৃত্যু হয়েছে ৬৩৬ জনের। কী ভয়াবহ পরিসংখ্যান। এমন মৃত্যু কখনো কাম্য নয়। তারপর নিয়তির কাছে আমাদের হার মানতে হচ্ছে। রেলসূত্র বলছে, সারাদেশে রেল নেটওয়ার্কে সর্বমোট ২ হাজার ৮৫৬টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ১ হাজার ৭৬১টিই অনুমোদনহীন। এর মধ্যে মাত্র ২৪২টিতে রেলের স্থায়ী রক্ষী রয়েছে, আর ৮২০টিতে রয়েছে চুক্তিভিত্তিক রেলরক্ষী, যা মাত্র ৩১ শতাংশ। রক্ষীবিহীন ক্রসিং আছে ১ হাজার ৭৯৪টি। অর্থাৎ ৬৯ শতাংশ ক্রসিংয়ে রক্ষী নেই, আর অনুমোদনহীন ক্রসিং ৬২ শতাংশ। এই অবৈধ ক্রসিংগুলো পুরোপুরিই অরক্ষিত। শুধু তাই নয়, প্রধান শহর এলাকার রেল গেটগুলো কিছুটা সাইরেন ও সিগন্যাল লাএট নিয়ন্ত্রণ করা হলেও অধিকাংশ রেলগেটে কোন আধুনিক সিগন্যাল বক্স, সাইরেন এমনকি লোহার বেরিকেডও নেই। মিরসরাই খৈয়াছড়া ঝর্নার রেল গেটের মত অধিকাংশ রেলক্রসিং এ ট্রেন আসার সময় হলে বাঁশ ও পতাকা দেখিয়ে বেরিকেড দেয়া হয়। অরক্ষিত এসব রেলক্রসিং দিয়ে যানবাহনসহ সাধারণ মানষের পারাপার, রেললাইনের ওপর দিয়ে অবাধে চলাচলসহ নানা কারণে প্রতি বছর গড়ে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। এটাই যখন বাস্তবতা, তখন রেল কর্তৃপক্ষের করণীয় কী? দেশে রেলপথে রেলক্রসিং স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধ করার দায় আইনত কোন কর্তৃপক্ষের? বর্তমান বাস্তবতায় তাদের ভূমিকা কী। পূর্বেই বলছি, রেল স¤প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বহু প্রকল্প গ্রহণের কথা আমরা শুনে আসছি। কিন্তু রেলের অন্যতম প্রধান একটি সমস্যা রেলক্রসিং সুরক্ষিত করার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে না। বৈধ রেলক্রসিংগুলোতে গেটম্যান নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা কেন? আর অবৈধ রেলক্রসিংগুলোর ব্যাপারে জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারা এগুলো স্থাপিত হয়। কিন্তু এগুলোতে অরক্ষিত মৃত্যুফাঁদ হয়ে তো থাকতে পারে না। অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধের ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতার কথাও শোনা যায়। অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের ব্যাপারে আইন কী বলছে তা আমরা জানি না। তবে না জেনেও আমরা বলতে পারি, এসব ক্রসিংকে ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে। রেল দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে রেলক্রসিংগুলোকে অবশ্যই সুরক্ষিত করতে হবে। বৈধ রেলক্রসিংগুলোতে অবশ্যই গেটম্যান থাকা নিশ্চিত করতে, যেখানে নেই সেখানে দ্রæত নিয়োগ দানের ব্যবস্থা করতে হবে।
অবৈধ রেলক্রসিংগুলো আইনানুগভাবে বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে, নেহাত বন্ধ করা না গেলে যথাযথ অবকাঠামো ও গেটম্যান দিয়ে এগুলো সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে রেলগেট মরণফাঁদ হয়েই থাকবে। আমরা আশা করি, ১১জন তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পর রেল কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিবে। মনে রাখতে হবে রেল পথের নিরাপত্তা এবং এপথগুলো দিয়ে জনসাধারণের পারাপারের সুবিধা নিশ্চিত করার দায় রেল কর্তৃপক্ষের।