অরক্ষিত রেলক্রসিং গেটের নিরাপত্তা জোরদার করুন

13

বাংলাদেশের রেলপথগুলো কতটা অরক্ষিত এবং এর নিরাপত্তাব্যবস্থা যে কত ঠুনকো, তা​র এক মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হলো নগরীর জাকির হোসেন সড়কস্থ খুলশী রেল ক্রসিং-এ গত শনিবারের দুর্ঘটনা। ডেমু ট্রেনের সঙ্গে বাস ও সিএনজি অটোরিকশার ত্রিমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিনজন। আহত হয়েছেন আরও দশজন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আহতদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা সংকটাপন্ন। দৈনিক পূর্বদেশসহ সহযোগী সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রেললাইন ক্রসিংয়ে গেটম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আলমগীর। নিয়মমাফিক রেল আসার আগে ব্যারিয়ার ফেলে গাড়ি আটকানোর কথা থাকলেও ওই সময় উপস্থিতই ছিলেন না তিনি। ব্যস্ততম এ গেটে প্রায় সময় ব্যারিয়ার গেট না ফেলে হাতের ইশারায় ট্রেন আসার সংকেত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, রেলওয়ে ট্রাফিক বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকা এ গেটে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের কথা তিন জন গেটম্যানের। কিন্তু মর্মন্তিক এ দুর্ঘটনাকালে কোন গেটম্যান ওই স্থানে ছিলেন না। ফলে গাড়ি থামানোর দায়িত্ব নিতে হয়েছে ট্রাফিক পুলিশ মনিরকে। গাড়ি এবং মানুষ বাঁচাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকেই প্রাণ দিতে হল। সূত্র জানায়, সকাল ১০টার দিকে রেললাইনের পাশে একটি বাস আসলে ট্রাফিক পুলিশ মনির সংকেত দিয়েছিলেন। ওই সময় নাজিরহাট থেকে ডেমু ট্রেনটি বটতলীর দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু বাসটি ট্রাফিক পুলিশের সংকেত মানেনি। এ সময় ট্রেনটি বাসের সামনের অংশে সজোরে আঘাত করে। এতে পাশে থাকা একটি সিএনজি অটোরিকশাকে বাসটি পেছন দিক দিয়ে ধাক্কা দেয়। ওই ধাক্কায় পুলিশ মনির ও সিএনজি অটোরিকশার চালক এবং কলেজে পড়–য়া এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী ঘটনাস্থলেই মারা যান। এঘটনায় রেলওয়ের জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা জানি, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়, ঘটনার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ একটু নড়েচড়ে বসলেও তদন্ত, বিচার ইত্যাদি হবে হচ্ছে করতে করতেই একসময় সবকিছু খবরের আড়ালেই থেকে যায়। বিচারও হয় না, গেটের নিরাপত্তাও জোরদার হয় না। অতীতের ধারাবাহিকতায় এ ঘটনার তদন্ত ও দোষীদের বিচার হতাহতদের পরিবার দেখে যেতে পারবে কিনা, সময়ই বলে দিবে! উল্লেখ্য যে, গত ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রামের ফৌজদার হাটের বাংলাবাজার এলাকায় স্ক্র্যাপবাহী (লোহা) ভারী ট্রাক রেললাইনে তুলে দেওয়ায় দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয় যাত্রীবাহী ট্রেন মেঘনা এক্সপ্রেস। চালকের দক্ষতায় সেদিন রেলক্রসিংয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পান মেঘনা এক্সপ্রেসের শত শত যাত্রী। ৫ সেপ্টেম্বর নগরের কদমতলী এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় আহত হন সিএনজি চালিত অটোরিকশার তিন যাত্রী। ওইদিন আনুমানিক রাত ১১টার দিকে কদমতলীর সংলগ্ন রেলক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তাছাড়া গত বৃহস্পতিবার রাতে আখাউড়া থেকে ঢাকা ফেরার পথে সরারচর স্টেশন এলাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রলি। এতে আহত হন বিভাগীয় রেলওয়ে কর্মকর্তা সাদেকুর রহমানসহ কয়েকজন রেল কর্মকর্তা। ঢাকা রেলওয়ে কন্ট্রোল অফিস থেকে জানানো হয়েছে-ব্যারিয়ার গেটের নিচে দিয়ে মোটরসাইকেল ঢুকে পড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, চট্টগ্রামে বিগত ৪ বছরে দ্রæত ক্রসিং পার হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুবরণ করেন ১ হাজার ৬৯ জন। এরমধ্যে গত বছরেই মারা যান ৩৩৭ জন। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে গেটম্যান ও লিভার না থাকার করণে। থাকলেও বেয়ারার একদিকে ফেললেও অপরদিকে গেট খোলা রেখে গেটম্যান নির্লিপ্ত থাকেন। ফলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও মৃত্যু ঘটে চলছে। এখন প্রশ্ন এসব দুর্ঘটনার দায় কার? রেলওয়ের সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিং আছে ২ হাজার ৫৪১টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৪১৩টি রেলওয়ের অনুমোদিত। বাকি ১ হাজার ১২৮টি ক্রসিং অনুমোদনহীন। গতকালের আরেক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, অনুমোদিত ও অনুমোদনহীন মোট রেলক্রসিংয়ের মধ্যে আবার ২ হাজার ১৭০টিতে কোনো গেট নেই, যান নিয়ন্ত্রণের লোক বা কোনো সংকেত বাতি নেই। মানে ৮৫ ভাগ ক্রসিংই অরক্ষিত! এটা বিস্ময়কর যে রেলওয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনব্যবস্থা এভাবেই চলছে। এটা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা ছাড়া আর কী! ফলে মাসে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে।