অমল বড়ুয়ার অনন্য বই ‘লোকপ্রশাসনে বৌদ্ধ অনুধ্যায়’

37

 

অমল বড়ুয়া একজন ধীমান লেখক। সে বয়সে তরুণ হলেও জ্ঞানবৃদ্ধ। এই লেখকের জ্ঞানের পরিচয় আমি পেয়েছি তাঁর রচিত বইগুলো পড়ে। এরই মধ্যে অমল ১০টি বই লিখেছে। অধিকাংশ বই-ই পড়ার সুযোগ আমার ঘটেছে। বইগুলো বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত হলেও তাঁর লেখা ‘লোকপ্রশাসনে বৌদ্ধ অনুধ্যায়’ বইটি ব্যতিক্রমী। আমার ধারণা এ ধরণের বিষয় নিয়ে এর আগে অন্যকোনো লেখক কোন বই লিখেছেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিভাদীপ্ত লেখক অমল বড়ুয়া দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। বুঝতে কষ্ট হয়না যে বইটি লিখতে তাঁকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে। তিনি অনেক প্রস্তুতি গ্রহণ করেই তবে লেখার কাজে হাত দিয়েছেন। পড়তে হয়েছে অনেক বই। অমল এ বইটিতে তথ্যসূত্রগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন।
লোকপ্রশাসন কথাটার ব্যাপকতা অনেক। সংক্ষিপ্ত করে বললে বলা যেতে পারে এটা একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা যার সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা রয়েছে। জনগণের সাথে আবার সম্পর্ক রয়েছে গণতন্ত্রের। লেখক বৌদ্ধধর্মের আলোকে এ সব কথা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। ‘লোকপ্রশাসনে বৌদ্ধ অনুধ্যায়’ বইটিতে রয়েছে ৮টি অধ্যায়। এখানে সর্বমোট ৩৭টি বিষয়ের ওপর আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। বৌদ্ধ লোকপ্রশাসনের ভিত্তি হলো নৈতিকতা। গৌতম বুদ্ধ এ জন্যে ব্যক্তি চরিত্রের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। সম্রাট অশোক এ নীতি অনুসরণ করেই তাঁর কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে- ১) উদার ও স্বার্থপরহীন হওয়া ২) উন্নত নৈতিক চারিত্রিক গুণ সম্পন্ন হওয়া ৩) জনগণের হিত-সুখ-মঙ্গল প্রতিবিধানের জন্য আত্মসুখ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকা ৪) সৎ হওয়া ও সর্বোচ্চ সততা, ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা ৫) দয়ালু ও বিনয়ী হওয়া ৬) সাধারণ জীবন যাপন করা ৭) সকল প্রকার রাগ-ঘৃণা এবং পক্ষপাত মুক্ত থাকা ৮) অহিংসার অনুশীলন করা ৯) সহিষ্ণুতা ও সহনশীলতার অনুশীলন করা এবং ১০) শান্তি ও ঐক্যকে সুসংহত করার লক্ষ্যে জনমতকে শ্রদ্ধা করা।
অমল বড়ুয়া এই ১০টি বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। আমার অষ্টম অধ্যায়ের ‘সুশাসন’ বিষয়টি খুবই প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়েছে। আমরা এখন আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এর প্রয়োজনীয়তা মর্মে মর্মে উপলব্দি করছি। আজ হতে আড়াই হাজার আগে বুদ্ধ এ ব্যাপারে গভীরভাবে ভেবেছিলেন। তিনি বলেছেন, যখন রাষ্ট্রের শাসক সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হয় তখন সরকারি নির্বাহীরাও সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হয়। যখন নির্বাহীরাও সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হয় তখন জনগণও সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হয়। বুদ্ধের কালে বৃজি রাজ্যটি ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গৌতম বুদ্ধ এর প্রশংসা করেছিলেন। একসময় বুদ্ধ এখানে ‘সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম’ (৭টি অপরিহার্য সুনীতি) সম্পর্কে বৃজিদের উপদেশ প্রদান করেছিলেন। তারা এই নীতি অনুসরণ করতো। ৭টি নীতির মধ্যে প্রথম দুটি ছিলো সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক। ১) সদা সর্বদা অভিন্ন হৃদয়ে সাধারণ সভায় সম্মিলিত হওয়া, ২) একতাবদ্ধভাবে সভায় সম্মিলিত হওয়া, সভা শেষে একত্রে চলে যাওয়া এবং সভায় প্রস্তাবিত কার্যবলী একমতে সম্পাদন করা। বৌদ্ধ সংঘও পরিচালিত হতো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। উল্লেখ করা যেতে পারে গণতন্ত্র বিষয়ে অমল বড়ুয়ার ‘বৌদ্ধধর্ম ও গণতন্ত্র’ নামের একটি অনুপম বই রয়েছে। ‘লোকপ্রশাসনে বৌদ্ধ অনুধ্যায়’ বইটির চতুর্থ অধ্যায়ের বিষয় হলো ‘সংঘ বা গণ’ নামক সংগঠন। এখানে বলা হয়েছে, সংঘ হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবয়ব যারা একটি সাধারণ ইচ্ছায় একত্রিত হতো এবং নিজেরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের করণীয় বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো। ষষ্ঠ অধ্যায়ের ‘লোকপ্রশাসনের প্রকৃতি ও ব্যবস্থাপনা’ বিষয়টিতে নতুনত্ব রয়েছে। লেখক এখানে ১) পরিকল্পনা ২) সংগঠন ৩) কর্মী সংগঠন ৪) নির্দেশনা ৫) সমন্বয় ৬) প্রতিবেদন লিখন ৭) বাজেট প্রণয়ন সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেছেন, প্রশাসনের ব্যবস্থাপনা মতবাদ প্রকৃতপক্ষে তত্ত্বাবধানমূলক তৎপরতা। ব্যবস্থাপনা হচ্ছে প্রশাসনের হাতিয়ার মাত্র। লোকপ্রশাসন হলো সংগঠন ও ব্যবস্থাপনার একটি সাধারণ বিজ্ঞান। অমল বড়ুয়া যথার্থই বলেছেন, বুদ্ধ তার ধর্মকে বহুজনের কল্যাণের জন্য ও বহুজনের বিমুক্তির জন্য প্রজ্ঞাপ্ত করেছেন আর বুদ্ধের অনির্বচনীয় বিমুক্তির বাণীকে দিকে দিকে ছড়িয়ে দিয়ে মানব জাতির হিত-সুখ প্রতিবিধানের জন্য ‘সংঘ’ নামের মহাশক্তিশালী সংগঠনের সৃষ্টি করেছেন। (পঞ্চম অধ্যায়- বুদ্ধের ধর্মনগরের প্রশাসন) লেখক অমল বড়ুয়ার লেখায় মুনশিয়ানা রয়েছে। তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় লিখেছেন। জটিলতামুক্ত হওয়ায় পাঠকের বুঝতে সহজ হয়েছে। লেখকের মৌলিকত্ব হলো তিনি বুদ্ধের বক্তব্যকে তাঁর মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন। অমল বড়ুয়ার ব্যাখ্যার সাথে পাঠকরা শতভাগ একমত পোষণ করবে তা নাও হতে পারে। দ্বিমত প্রকাশ করবার অধিকার বুদ্ধ সবাইকে দিয়েছেন। বইটিতে বানান সংক্রান্ত ত্রূটি কম। ‘ছাপাখানার ভূতে’র উপদ্রব’ নেই বললেই চলে। প্রচ্ছদ সুন্দর ও আকর্ষণীয়। সবচেয়ে বড় কথা এটি গুরুত্বপূর্ণ বই। মূল্যবান এই বইটি সবার সংগ্রহে থাকা প্রয়োজন। পাঠ করলে ঋদ্ধ হবেন।