অভিযোগ মোবাইল অপারেটরদের সেবার দুর্বলতা নিয়ে

21

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রথমবারের মতো রাজধানীর বাইরে এসে চট্টগ্রামে গণশুনানির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম-এ গণশুনানির আয়োজন করা হয়। অনলাইন প্ল্যাটফরম জুমেও অনুষ্ঠানটিতে অংশ নেন অনেকে। অনুষ্ঠানে সরাসরি ৮ জন এবং অনলাইনে ৫ জন অভিযোগকারী কথা বলার সুযোগ পান। কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা অভিযোগকারীর প্রশ্নের উত্তর দেন।
গত ১৫ নভেম্বর থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে শুনানিতে অংশ নিতে বিটিআরসির ওয়েবসাইটে অভিযোগ নেওয়া হয়। গণশুনানিতে অংশে নিতে অনলাইনে নিবন্ধন করেছেন ৮৪৮ জন, এর মধ্যে স্বশরীরে ১৮২ জন, অনলাইনে ৯৪ জন এবং অন্যান্য ১৭ জন অংশ নেন। তবে প্রশ্নোত্তর পর্বে মাত্র ১৩ জনকে সুযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগের বেশিরভাগই ছিল মোবাইল অপারেটরদের সেবার নানা দুর্বলতা নিয়ে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে জাওয়াদুল করিম নামে বেসরকারি চাকরিজীবী গ্রাহক বলেন, তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানে একজন তথ্য কর্মকর্তা থাকার কথা। কিন্তু মোবাইল অপারেটরদের ওয়েবসাইটে এমন কোনো কর্মকর্তার তথ্য নেই। যার কারণে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তাছাড়া তিনি সর্বনি¤œ মোবাইল রিচার্জ ২০ টাকার স্থলে পূর্বের নিয়মে ১০ টাকা করার দাবি জানান।
জবাবে বিটিআরসি’র সিস্টেমস এন্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসিম পারভেজ বলেন, নিজের তথ্য অপারেটরের কাছে জানা যাবে। তবে অপরের তথ্য দিতে অপারেটর বাধ্য নয়। রিচার্জ এর বিষয়ে বিটিআরসি পুনরায় বিশ্লেষণ করে যদি ১০ টাকা রিচার্জে গ্রাহক সাড়া মেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আবদুল্লাহ আল কায়সার নামের এক গ্রাহক নেটওয়ার্ক সমস্যা এবং ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ে নিয়মিত সমস্যার কথা জানান।
জবাবে ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. এহসানুল কবীর বলেন, ইতোমধ্যে সকল অপারেটরদের বেশকিছু টাওয়ারের নেটওয়ার্ক দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অপারেটরদেরকে সে সব টাওয়ারে নেটওয়ার্কের গতি বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এসকে আবিদ হোসেন নামের এক গ্রাহক ফিশিং ট্রলারের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে অনলাইনে আবেদন ও লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তির কথা জানান। জবাবে বিটিআরসির পক্ষ থেকে এটি আরো সহজতর করার পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়।
মোহাম্মদ সায়েম নামে আরেক গ্রাহক বলেন, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রিচার্জ করলে অটোমেটিক ডাটা ও বান্ডেল ক্রয় হয়ে যায়। জবাবে সিস্টেম এন্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসিম পারভেজ এমন সার্ভিস চালুর আগে অনুমতি নেওয়ার বিষয়টি কিভাবে যুক্ত করা যায় সেটা নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানান।
আশিক চৌধুরী নামে এক শিক্ষার্থী টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন নতুন সেবা চালুর মাধ্যমে চাকরির ক্ষেত্র বাড়ানোর উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চান। জবাবে লিগ্যাল এন্ড লাইসেন্সিং বিভাগের কমিশনার আবু সৈয়দ দিলজার হোসেইন বলেন, বিশ্বে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন প্রযুক্তি ও সেবা চালু হচ্ছে এবং বিটিআরসি’র লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ও টেলিযোগাযোগ খাতের স্টেকহোল্ডার বাড়ার ফলে এ খাতে চাকরির সুযোগও বাড়ছে।
আইটি বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল আলম চৌধুরী অ্যামেচার রেডিও লাইসেন্স চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে জবাবে স্পেকট্রাম বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল আউয়াল উদ্দীন আহমেদ নতুন করে অ্যামেচার রেডিও চালুর কথা জানান।
নাসিমুল হক নামে এক শিক্ষার্থী ডাটা শেষ হলে পে ফর ইউজ চালু হলে সাধারণ রেটে ইন্টারনেট সেবা চালুর বিষয়ে জানতে চান। জবাবে সিস্টেম এন্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসিম পারভেজ বলেন, গ্রাহকের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই পে ফর ইউজ সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা করা হয়েছে। গ্রাহক চাইলে পে ফর ইউজ বন্ধ করার বিষয়টি নিয়ে পরিক্ষা করে দেখা হবে।
মুঠোফোন কাস্টমার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মহিউদ্দিনের এক প্রশ্নের জবাবে বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদার বলেন, মোবাইল অপারেটর ও গ্রাহকের বাইরেও পেছনে অনেকে কাজ করে। মাঝখান থেকে যারা সেবা দিচ্ছে তাদেরকেও আমরা জবাবদিহিতিার আওতায় আনছি।
অনুষ্ঠানে অনলাইনে জুমে কানেক্ট হয়ে প্রশ্ন করেন ওয়াসিফ বিল্লাহ, কামরান মুস্তফা, আমিনুল ইসলাম, তানিম খান ও ডা. ইমরান। ফাইভ জি চালু, এমএনপি সিম তিনমাস বন্ধ থাকলে পূর্বের অপারেটরে চলে যাওয়াতে সমস্যা, দুর্বল নেটওয়ার্ক, প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নোটিফিকেশন দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
গ্রাকদের প্রশ্নের জবাবে ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. এহসানুল কবীর বলেন, সকল অপারেটর ফাইভজি চালুর কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু করেছে।
বন্ধ থাকা সিম বিক্রির ফলে নিরাপত্তা সমস্যার জবাবে সিস্টেমস এন্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসিম পারভেজ বলেন, সিম একটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। রিপ্লেসমেন্ট এর আগে পত্রিকায় দিয়ে, ওয়েবসাইটে নোটিশ দিয়ে গ্রাহককে এ বিষয়ে অবগত করা হয় এবং সিম চালুর কথা জানানো হয়। গ্রাহক সাড়া না দিলে সেটি বন্ধ রিপ্লেস করা হয়।
বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদার বলেন, গণশুনানিতে যেসব অভিযোগ পাওয়া যায়, সেগুলো আমাদের পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণে সহায়ক হয়। ভুল ধরিয়ে দিলে কাজের সুযোগ হয়। বিটিআরসি সরাসরি কোনো সেবা দেয় না, রেগুলেট করে। রেগুলেটর হিসাবে আমাদেরও দায় আছে। গ্রাহকের সমস্যা জানার জন্য আমরা আজকে চট্টগ্রামে এসেছি। ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষমাত্রা নিয়ে বিটিআরসি কাজ করে যাচ্ছে। এ দেশ গঠনে সকলকে সহযোগিতা করতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে কমিশনের ভাইস-চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতিটি গণশুনানি যেকোনা প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ায়। গ্রাহকদের অভিযোগ আমলে নিয়ে টেলিযোগাযোগ খাতে আরো কতটুকু উন্নয়ন করা যায় সে বিষয়ে কাজ করবে বিটিআরসি।
তিনি জানান, চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট গ্রাহক ১২ কোটি ৬২ লাখ, মোবাইল সিম গ্রাহক সংখ্যা ১৮ কোটি ১৬ লাখ এবং ইন্টারনেট ডেনসিটি ১০৪.১৭ ভাগ এবং নভেম্বর ২০২২ সাল ব্যান্ডউইথ তথা ডাটার ব্যবহার হয়েছে ৪,৪১৯ জিবিবিএস।
সিস্টেম এন্ড সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল এস এম রেজাউর রহমান এর সঞ্চলনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে কমিশনের লিগ্যাল এন্ড লাইসেন্সিং বিভাগের কমিশনার আবু সৈয়দ দিলজার হোসেন, স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার প্রকৌশলী শেখ রিয়াজ আহমেদ, প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মো. দেলোয়ার হোসাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. এহসানুল কবীর, লিগ্যাল এন্ড লাইসেন্সিং বিভাগের মহাপরিচালক আশীষ কুমার কুন্ডু, স্পেকট্রাম বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল আউয়ালউদ্দীন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।