অভিনয়

12

রোকন রেজা

আশেপাশে কতো ছেলে নকল করলো। কিছুই হলো না। অথচ এক্সফেল্ড হয়ে গেলাম। একেই বোধহয় ভাগ্য বলে।
পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই খবরটা মৌসুমীর কানে পৌঁছে গেলো। মৌসুমী ধমক দিয়ে বললো, আজকে নকল করতে গেলি ক্যানো? দেখলি না আজ কড়াকড়ি! আজ বাদ দিতি!
কিন্তু বাদ দিলে আমার পাস হবে কি করে? আমার কোনো প্রশ্নের উত্তরই ঠিকমতো পড়া নেই। পরীক্ষার আগে বই খুলে দেখি গাদা গাদা প্রশ্ন। রেখে দিয়েছিলাম। ভরসায়। এস এস সিও তো ভালো রেজাল্টে পাস করে গেছি। বন্ধুরা বলে আমি নাকি বেশ টেকনিক্যাল। পড়ি না লিখি না অথচ পাস করে যায়। কথা সত্য, কিন্তু লোকে বিশ্বাস করে না।
আমি একটা ফাউল টাইপের ছেলে। এটা আমি যেমন জানি,বন্ধুরাও জানে। আমি গাঁজা, ফেন্সি, হিরো সবই খাই। বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারি। রাস্তায় মেয়েদের টিজ করি। আর যেটুকু সময় ঘরে থাকি মৌসুমীর মুখটা নিয়ে গবেষণা করি।
ধনী বাপের একমাত্র মেয়ে। অথচ কি নিপুণ কৌশলে আমি তাকে পটিয়ে রেখেছি। আমার প্রেমে সে গদগদ। সে আমাকে নিখাঁদ ভালো মানুষ মনে করে। এই জায়গাতেই বন্ধুরা আমার সঙ্গে পেরে দেয় না। ঈর্ষা করে। আমি কিভাবে কিভাবে যেন সবকিছু ম্যানেজ করে ফেলি। মৌসুমী কিছুই টের পায় না। সে আমাকে মাঝে মধ্যে টাকা-পয়সাও দেয়।
আমি এক্সফেল্ড হওয়াতে আমার বাসার লোকজন তেমন একটা উদ্বিগ্ন না। চিন্তিতও না। যেন তারা জানতোই আমি এক্সফেল্ড হবো। এটা এমন কিছু অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু মৌসুমী?
শুধুমাত্র ঐদিনই সে আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলেছে। বোধহয় সান্ত¡না দেবার জন্য। তারপর থেকেই সে আমাকে এ্যাভয়েড করে চলছে। আমি বুঝতে পারছি। আমার অনুভব শক্তি প্রখর। যারা ধান্দবাজি করে খায় তাদের অনুভব শত্তি প্রখর হয়। তারা খানিকটা ভবিষ্যতও দেখতে পারে। আমি আমার ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছি।
মৌসুমী কি আমার কাছ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে? ইদানিং সে একটা ছেলের সঙ্গে ঘুরছে। আমারই বন্ধুহ্যাবা টাইপেরবদরুল। যে বদরুল পড়াশুনা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। পরীক্ষায় ওদের দু’জনার সিট পাশাপাশি পড়েছে।
এখন প্রতিদিন সকালে আমি খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে পড়ি। এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াই। যে যেখানে যেতে বলে চলে যাই। তারপর দুপুরে আবার ফিরে আসি।
আজ দুপুরে যখন হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসেছি মা তখন মাছের তরকারিটা পাতে তুলে দিতে দিতে বললো, তোর মামার অসুখ নাকি খুবই বেড়েছে। আরিফ রইসুলের কাছে মোবাইল করেছিল। বিকেলের ট্রেনেই যেতে বলেছে। খেয়ে দেয়ে রেডি হয়ে নে।
আহারে মামা! মরার আর সময় পেলে না। আমার প্রেমের যখন টানাপোড়ন চলছে তখন আযরাইলও মামারআত্মা নিয়ে টানাপোড়ন শুরু করলো।
পরের দিন মামা মরলো। অগত্যা আমাকে আড়াইদিন থাকতেই হলো।
ফিরে এসে শুনি মৌসুমী কোচিং করতে রাজশাহী গিয়েছে। সঙ্গে বদরুল। বদরুলের সঙ্গে তার নাকি খুব লটর পটর শুরু হয়েছে। হাসান বললো, বদরুল নাকি পরীক্ষায় তার খাতা ওপেন করে দিয়েছিল। মৌসুমী দেখে দেখে লিখেছে।
হায়রে মৌসুমী! আমার সিট যদি তোর পাশে পড়তো আমি কি আর খাতা ওপেন করে দিতাম না! কোচিং তো নামেই। তাই বলে বদরুলের সঙ্গে চলে যাবি!
অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম আমার বোধহয় একটু দুঃখ হবে। অন্ধকারের অন্ধকারে আমার চোখেও জল আসবে। কিন্তু তেমন কিছুই অনুভব করলাম না। কষ্ট হলো না। মনের কোথাও কোনো যন্ত্রণা টের পেলাম না। কল-কব্জা তাহলে ঠিকই আছে। বিগড়াইনি।
শুয়ে শুয়ে তাই ভাবছিলাম আমার মন বোধহয় আগেই জেনে গিয়েছিল মৌসুমী একদিন চলে যাবে। ঠিকই চলে যাবে।
আমার মন বলছে আমি যে দুই নাম্বার মাল মৌসুমী তা আগেই জানতো। তারপরও সবদিক সামলে কি অপার মহিমায় আমার সঙ্গে নিখুঁত অভিনয় করে গেছে।