অব্যাহত সড়ক দুর্ঘটনা সমস্যার গোড়ায় হাত দিন

18

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানা যাচ্ছে না। সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ সড়ক দুর্ঘটনারোধে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও দুর্ঘটনার ব্যাপকতা কমছে না, বরং বাড়ছে। সম্প্রতি করোনা ভাইরাস, টিকা ও নির্বাচন ইস্যুতে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি গণমাধ্যমে তেমন গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ না পেলেও দৈনিক কমপক্ষে ৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, যাতে ন্যূনতম পক্ষে ৩ থেকে ৭জন যাত্রী বা পথচারীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গত দুই বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে ছাত্র ও তরুণদের এক ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এসময় ছাত্রসহ বিভিন্ন সুধি সমাজ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করা হয়েছিল। সরকারও দাবি বা প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিক বলে সেইসময় আমাদের প্রতিয়মান হয়েছিল। এরপর সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ আইন, সড়ক আইন ইত্যাদি প্রণয়ন করা হলেও প্রস্তাবনা ও সরকারের গৃহীত আইনগুলো বাস্তবায়নে কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি চট্টগ্রামে বিভিন্ন মফস্বল সড়ক ও মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে। বিশেষকরে আনোয়ারা-বাঁশখালী ও কক্সবাজর সড়কে। এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অপ্রশস্থ সড়ক ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো ও এক গাড়ি আরেক গাড়িকে ওভারটেক করে যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা করা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি দ্রুত গতিতে চলা বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩জন যাত্রী মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। গত সপ্তাহে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে ৭টি। যাতে একই পরিবারের একাধিক সদস্যও রয়েছে। বস্তুত, প্রতিদিনই দেশের কোথাও-না-কোথাও এমন দুর্ঘটনা ঘটছে।
এ ধরনের নির্মম পরিণতি থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে হলে আইন প্রয়োগে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় কোন নীতি গ্রহণ করা হলে বেশি ফলদায়ক হবে, তা বহুল আলোচিত। এখন দরকার দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে গোড়ায় হাত দেয়া। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং তা দ্রæত কার্যকর করা। মূলত চালকের অদক্ষতার কারণেই যে দুর্ঘটনা বাড়ছে, তা বলাই বাহুল্য। এক্ষেত্রে অবস্থা এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, একজন যাত্রী নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রতি মুহূর্তে উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে আর কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাত হাজির করবে-এটা কতদিন চলবে? সড়কে নৈরাজ্যের কথা সর্বজনবিদিত। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজটি এখন এক ‘জাইগ্যানটিক টাস্কে’ পরিণত হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে যত মহাপরিকল্পনাই গ্রহণ করা হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ করা না গেলে কাক্সিক্ষত ফল মিলবে না। দেশে বিপুলসংখ্যক গাড়ির ফিটনেস নেই। লাইসেন্স নেই অথচ গাড়ি চালাচ্ছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়। চালকের পরিবর্তে তাদের সহকারী গাড়ি চালাচ্ছিলেন এমন তথ্যও জানা যায় দুর্ঘটনার পর।
বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো রোধ করা না গেলে যত পদক্ষেপই নেওয়া হোক, কাক্সিক্ষত ফল মিলবে না। কাজেই দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ চালক তৈরি করা যেমন জরুরি, তেমনি দরকার তাদের মানবিক বোধের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনও নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহন শ্রমিকদের সার্বিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়াটাও জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মানুষ শুধু জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনতে চায় না, সবাই চায় এর প্রতিকার। সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা যে বাড়বে-এতে কোনো সন্দেহ নেই। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধানে চলমান প্রকল্পের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি দুর্নীতির আশ্রয় নিলে তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াই সমীচীন।