অবৈধ যান চালাতে অবৈধ রুট তৈরি, চাঁদায় নিয়ন্ত্রণ

22

মনিরুল ইসলাম মুন্না

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) অনুমোদন ছাড়া নতুন কোন রুট করে গাড়ি চলাচলের সুযোগ নেই। এরপরও লাইসেন্স-রেজিস্ট্রেশনবিহীন, পুরনো লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা ট্যাক্সি ও মাহিন্দ্রা চলাচল করছে বিভিন্ন রুটে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও জনবল সংকটের কারণে সবসময় অভিযান চালানো সম্ভব নয় ট্রাফিকের পক্ষে। তাই একাধিক চক্র লাইন নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশকে রেকি করে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে এসব নতুন রুট তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মাসুদ আহাম্মদ পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমরা আরটিসির মিটিংয়ে প্রত্যেকটি রুট নিয়ে যাচাই-বাছাই করেছি। কিছু গাড়ি বাদ পড়েছে আবার কিছু গাড়ি সংযুক্ত করা হয়েছে। আমাদের কড়া নির্দেশ আছে অবৈধ কোন গাড়ি রাস্তায় চলাচল করতে পারবে না। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
গত শুক্রবার নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর এবং আগ্রাবাদ এলাকায় গেলে অবৈধ গাড়ির রুট তৈরি এবং চলাচলের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়।
বহদ্দারহাট পুকুরপাড় এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, অনুমোদন ছাড়াই বহদ্দারহাট পুকুর পাড় হতে বাকলিয়া বলিরহাট পর্যন্ত চলাচল করছে দেড় শতাধিক সিএনজি ট্যাক্সি। এসব গাড়ির চালকদের নেই কোন বৈধ লাইসেন্স। যেসব গাড়ি চলাচল করছে সবগুলো গ্রাম সিএনজি ট্যাক্সি আর টু স্ট্রোকের বাতিলকৃত ট্যাক্সি। অথচ এসব সিএনজি ট্যাক্সি নগরীর অভ্যন্তরে চলাচলের কোন অনুমতি নেই। পুলিশের সোর্স পরিচয়দানকারী এবং কিশোর গ্যাং নেতার নিয়ন্ত্রণে এসব গাড়ি চলাচল করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন চালক বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন ৮০ টাকা করে ১০০ সিএনজি ট্যাক্সি থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। বাকি ট্যাক্সিগুলো চলে পুলিশ, তথাকথিত সাংবাদিক ও নেতাদের নামে। তাদের কোন টাকা দিতে হয় না। তথাকথিত সাংবাদিকদের একজন হলেন মো. সালাউদ্দিন সোলায়মান। তিনি ‘জাতীয় দৈনিক গণতদন্ত’ পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান নামে সাধারণ মানুষ ও চালকদের ভয়-ভীতি প্রদান করেন। এ সাংবাদিকের ট্যাক্সি রয়েছে সাতটি। প্রতিটি ট্যাক্সি থেকে তিনি মাসে তিন হাজার টাকা করে আদায় করেন। এসব গাড়ির মধ্যে বাদ পড়েনি পুলিশ কনস্টেবলও। চান্দগাঁও থানার সাবেক কনস্টেবল আলমগীরের আছে দুইটি ট্যাক্সি আর বাকি ট্যাক্সিগুলো পুলিশের সোর্স মো. ফরিদ এবং আবুল কাশেমের নিয়ন্ত্রণে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন একশো ট্যাক্সি থেকে আট হাজার টাকা তোলেন লাইনম্যান মো. রাহাত। টাকা তোলার পর মো. রাকিবের হাতে টাকাগুলো জমা রাখা হয়। চান্দগাঁও থানা পুলিশ এবং ডিবির সোর্স পরিচয়দানকারী মো. কাশেম টাকাগুলো বন্টন করেন। বন্টনকৃত টাকার মধ্যে চান্দগাঁও থানার চার মামলার আসামি মো. রাজু বাদশা প্রকাশ হামকা রাজুকে দিতে হয় দৈনিক দুই হাজার টাকা। হামকা রাজুর পিএস পরিচয়দানকারী সৈয়দুল করিম এবং মো. আরাফাতকে দিতে হয় দৈনিক ৫০০ টাকা, থানা পুলিশের মোবাইল টিমকে দৈনিক ৫০০ টাকা, পুলিশের সোর্স ফরিদকে ৫০০ টাকা, ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পাহারাদার মো. আনোয়ার প্রকাশ সালমানের বাপকে দৈনিক এক হাজার টাকা প্রদান করতে হয়। বাকি টাকা কাশেম নিজেই রেখে দেন। এভাবে দিনের টাকা দিনেই ভাগ-বাটোয়ারা করে লাইন পরিচালিত হয়ে থাকে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে সোর্স মো. কাশেমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু টাকা তুলি। সেটা লাইন চলাচল ও মেনটেন করতে শেষ হয়ে যায়। তাছাড়া কোন নেতা বা পুলিশকে টাকা দিই না’।
চান্দগাঁও ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) বিপুল কুমার পাল পূর্বদেশকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি কে বা কারা করে তা আমি জানি না। আমরা অবৈধ লাইন চলার খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই সব খালি হয়ে যায়। তাই সব গাড়ি একসাথে ধরতে পারি না। তারপরও আমাদের সামনে কোন গাড়ি পড়লে আমরা ছাড় দিই না। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
আগ্রাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বাবু গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণে ২০ থেকে ২৫টি মাহিন্দ্রা-ম্যাক্সিমা চালানো হচ্ছে মাত্র চার কিলোমিটার দূরত্বের সড়কে। এসব গাড়ি চলাচল করে আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড় থেকে বড়পোল মোড় পর্যন্ত, যার কারণে ১৭ ও ৯ নং রুটের হিউম্যান হলার চালকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ তুলেছে। তাদের মতে- বাবু, হেলাল ও দেলোয়ারের নেতৃত্বে আমাদের রুটে অবৈধ মাহিন্দ্রা-ম্যাক্সিমা চলাচল করাচ্ছে। প্রতিদিন তারা এসব গাড়ি থেকে ১৬০০ টাকা করে আদায় করে।’
তবে অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাবু, হেলাল ও দেলোয়ারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা এসব গাড়ি নিজেদের বলে দাবি করেন। গাড়িগুলো তারা পুলিশের অগোচরে চলাচল করান এবং ট্রাফিক পুলিশের হাতে পড়লে জব্দ হয়ে যায় বলে জানান।
বিষয়টি নিয়ে ডবলমুরিং এর ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) মো. মোশাররফ হোসেন এবং হালিশহরের টিআই মো. সালাউদ্দিন মামুন পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমাদের সামনে কোন অবৈধ যান চলাচলের সুযোগ নেই। আমরা নিয়মিত অভিযানে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছি।’
মুরাদপুর মক্কা হোটেলের পাশের গলিতে রয়েছে হাটহাজারী-ফটিকছড়িগামী আরও একটি অবৈধ সিএনজি ট্যাক্সি লাইন। যেখানে গাড়ি আছে শতাধিক। এসব ট্যাক্সির নিয়ন্ত্রক মো. কামরুল। তিনি প্রতিটি গাড়ি থেকে লাইনে ঢুকাতে নেন ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। পরে প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ওয়েবিল আদায় করেন ৫০ টাকা। তবে কামরুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে দেখা করবেন বলে এড়িয়ে যান।
শুধু এ তিনটি এলাকা নয়। নগরীর খুলশী জালালাবাদ, বায়েজিদ আরেফিন নগর এবং বাইপাস সড়ক, মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজ, অক্সিজেন মোড় থেকে কুয়াইশ সংযোগ সড়ক, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, কাস্টমস থেকে আনন্দবাজার পর্যন্ত, পতেঙ্গা ইপিজেড এলাকা, টাইগার পাস আমবাগান হয়ে ঝাউতলা, কাটগড় এলাকাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় চলাচল করছে অবৈধ সিএনজি ট্যাক্সি ও মাহিন্দ্রা।