অবেলায় ঝরেপড়া ফুল: মোসারত জাহান মুনিয়া

20

এমরান চৌধুরী

গত সোমবার ২৬ এপ্রিল ২০২১ তারিখে মোসারাত জাহান মুনিয়া নামে এক কলেজ ছাত্রী গুলশানের এক অভিজাত ফ্লাটে আত্মহত্যা করে। পরবর্তীতে আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়। মামলায় এমন একটি নাম আসে নামটি এদেশের আমজনতার কাছে পরিচিত না হলেও তাদের প্রতিষ্ঠানের নামটি কিন্তু সবার পরিচিত। বসুন্ধরা। আর সেই প্রতিষ্ঠানের এমডি সায়েম সোবহান আনভির- বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষত ফেসবুকে ঝড় ওঠে। যার লেখার কথা নয়, বলার কথা নয় তিনিও লিখছেন। যা-ই খুশি লিখে যাচ্ছেন। করছেন যাচ্ছেতাই মন্তব্য। কেউ কেউ মেয়েটির চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছেন। আর কেউ কতিপয় পত্রিকা এবং টেলিভিশন কেন ভাসুরের নাম মুখে নেয় নাই এই বলে ধিক্কার জানাচ্ছেন। তথাকথিত সুশীলদের নীরবতা দেখেও অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করছেন। মেয়েটির পরিবারের শিক্ষাদীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বাবা-মা হারা পরিবারে সত্যিকার গাইডেন্সে ঘাটতি থাকতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিষ্ঠাচার বহির্ভূতভাবে মেয়েটিকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে তাতে মেয়েটির যতটা সহমর্মিতা পাওয়ার কথা তার চুল পরিমাণও পায়নি। তার বদলে তার নামে ছড়ানো হয়েছে যত সব নেতিবাচক কথা। এই অবস্থা দেখে আবারও মনে পড়ল পুরনো সেই কথা আমরা শক্তের ভক্ত নরমের যম। যে মেয়েটি দুনিয়া থেকে চিরকালের জন্য চলে গেছে তার চরিত্রহননের জন্য এত মহা আয়োজন কেন? আমরা কি কেউ জানি মেয়েটি কেন এই অবস্থার শিকার হলো। পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া হুট করে কোনো মন্তব্য করা কোনো বিবেক ও বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়। এজন্যই কালজয়ী কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কোনো এক ছোটগল্পে লিখেছেন, ‘না জানিয়া না শুনিয়া বিশ্বাস করার চেয়ে অবিশ্বাস করিয়া ঠকাও ভালো।’
মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। কেন করেছে? কোন পরিস্থিতিতে করেছে? এসব বিষয় মানুষ হিসেবে আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করা উচিত। মানুষ কি জন্ম নেয় নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য। কেউ কি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে আগুনে আত্মাহুতি দিতে চায়? নিশ্চয় নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহুকাল আগেই বলে গেছেন ‘মরিতে চাহিনা আমি এই সুন্দর ভুবনে।’ অনেক প্রাজ্ঞজন পুরনো একটা প্রবাদকে বার বার উদ্ধৃত করে বলতে চেয়েছেন, লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। তবে এ কথাটি মুনিয়ার বেলায় কতটা যৌক্তিক সেটা আমরা বলতে পারব না। তা ছাড়া লোভে পাপ পাপে মৃত্যু আমাদের সমাজে খুব একটা দৃশ্যমান হয় না। আর হচ্ছে না বলেই সারা বাংলাদেশে দিন দিন বেড়ে চলেছে ভূমিদস্যু, লুটেরার দল। এদের লোভের ডালপালা এতই বিস্তৃত যে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করতে এরা এক মিনিটও চিন্তা করে না।
যারা মুনিয়াকে লোভী বলছেন তাদের কাছে বিনীতভাবে জানাতে চাই লোভী মানুষ কখনো আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা কোটি কোটি টাকা কামাতেই থাকে। সাত খুন করেও তারা বহাল তবিয়তেই থাকে। এসব লোভী মানুষ সমাজের শত্রু, দেশের শত্রু, জাতির ঘোর দুশমন। এদের কারণে দেশের অর্থনীতির স্বাভাবিক রক্ত প্রবাহ যেমন বাধাগ্রস্হ হয়, তেমনি নীতি ও নৈতিকার অনুশীলন সঠিকভাবে হওয়া দূরের কথা বরং তাতে ধস নামে। যে সীমাহীন লোভ করে তারা সম্পদের মালিক হয়েছেন তাতে যে পাপ করেছেন তা কোনো বাটখারায় পরিমাপযোগ্য নয়। তাদের তো প্রতিদিন আত্মহত্যা করা উচিত। কিন্তু না, তা তারা করবে না। কারণ তাদের আত্মসম্মানবোধ বলতে কিছুই নেই। যারা আত্মসম্মান বোঝে, তাদের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তারা যখন নিশ্চিত হয় বেঁচে থাকলে সমাজ তাদের নিরাপত্তা দেবে না তখনই তারা আত্মহননের মতো কঠোর পথ বেঁচে নেয়। মোসারাত জাহান মুনিয়াও তাই করেছে।
দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি মেয়ের বয়স কত হতে পারে? বড় জোর আঠারো উনিশ। এই বয়সের একটি মেয়ে প্রেমে পড়তে পারে, অস্বাভাবিক কিছু নয়। যদি প্রেমে পড়ে থাকে সেটা ছিল তার অপরিপক্বতার ফল। মেয়েটি যদি বুদ্ধিমতী ও পরিপক্ব হতো তাহলে একজন বিবাহিত ও তার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি বয়সের মানুষের প্রেমে পড়ত না। তাছাড়া মেয়েটি যদি প্রেমে পড়েই থাকে সেটা ছিল অসম।
আমাদের সমাজ-সংসারে অসম প্রেম কখনো বিয়ে পর্যন্ত গড়াতে পারে না। আমাদের ধারণা মেয়েটা প্রেমে নয়/ প্রেমের ফাঁদে পড়েছে তা থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাই বলেছেন, ‘প্রেমের এই ফাঁদ পাতা ভুবনে কখন কে ধরা পড়ে কে জানে?’ আসলেই তাই উঠতি বয়সের মেয়েরা কোনটা প্রেম কোনটা ফাঁদ তা সহজে বুঝতে পারে না। যখন বুঝতে পারে তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। মোসারত জাহান মুনিয়ার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সে প্রেমের নামে, বিয়ের নামে প্রতারিত হয়েছে। অন্য কথায় বলতে গেলে মেয়েটির সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে ব্যবহার করে তারপর ছুঁড়ে ফেলা দেওয়া হয়েছে।
লেখাটি শেষ করার আগে নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক Mili sultana- এর টাইম লাইন থেকে নেওয়া একটি স্ট্যাটাস। উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি লিখেছেন, ‘মেয়ে তুমি মরেও শান্তি পাওনি। কেন অন্যের দ্বারা মেনুপুলেট হতে গেলে? আমার একমাত্র কন্যাটিও একদিন তোমার বয়সী হবে। যতবার সোশাল মিডিয়ায় আমার চোখের সামনে তোমার মায়াবী মুখটা ধরা পড়ে, তোমার চমৎকার টিক টক ভিডিও দেখি, ততবারই আমার অস্থিমজ্জা অবশ হয়ে আসে। এমন মনে হয়, আমার বুকের অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছে। আমি আবেগের দাপটে ভেবে বসি, তোমার মত এমন সম্ভাবনাময় তারুণ্যের অপমৃত্যু আর না হোক। মুনিয়া, তোমাকে আমার মেয়ের জায়গায় কল্পনা করে আমি অশ্রু বিসর্জন দিয়েছি। কেউ কেউ তোমাকে বাজে মেয়ে বলে। কেউ কেউ ৫৭০ সাবান দিয়ে তোমাকে ধুয়ে দিচ্ছে। মুনিয়া, বেহিসেবি আবেগ নিয়ে তুমি করুণ পরিণতির শিকার হয়েছ। অন্যের বেলায় আমরা জজ ব্যারিস্টার হয়ে যাই। যত নোংরামির ধারা আছে, তার সব ক্যাটাগরিতে তোমাকে ফেলা হয়েছে। তোমাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন ফতোয়ার ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। গরু ছাগল বলাৎকারকারীও ফেসবুকে হাকিম হয়ে তোমার মরণোত্তর বিচার করছে। মুনিয়া, তোমার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে, তুমি প্রপার গাইডেন্স পাওনি বলে। প্রপার গাইডেন্স না পাওয়ায় তোমাকে নিষ্ঠুর পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। অনন্তলোকে শান্তিতে থেকো। আমার কাছে আজ পর্যাপ্ত শব্দ বাক্য নেই। শব্দরা আজ আমার সাথে বিদ্রোহ করেছে….!!’ সত্যই তাই। মুনিয়ারা আছে প্রতিটি ঘরে। আজ এক মুনিয়ার কপাল পুড়েছে, কাল যে আরেক মুনিয়ার কপাল পুড়বে না এই নিশ্চিয়তা কী আমাদের সমাজ দিতে পারবে? পারবে না। আর তাই মোসারাত জাহান মুনিয়ার ব্যবচ্ছেদ না করে নিজের প্রিয়জনকে আগলে রাখুন পরম মমতায়। তাদের ভবিষ্যত, তাদের নিরাপত্তা, তারা যাতে এরকম প্রতারকের হাতে না পড়ে সেদিকে নজর রাখুন।
মুনিয়ার আত্মহত্যা সমাজের কাছে একটা চরম বার্তা। আর সেই বার্তাটি হলো সমাজ এখনো রাঘব বোয়ালদের হাতে জিম্মি। রাঘব বোয়ালদের ছানাপোনারা যা খুশি তা করে যাবে আর সমাজ তা নির্বিকার থাকবে তা হতে পারে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রতিটি পরিবার, সমাজ ও দেশ হুমকির মধ্যে থাকবে। বাংলাদেশের আটষট্টি হাজার গ্রামের কোনো গৃহকোণ নিজেদের নিরাপদ বলে দাবি করতে পারবে না। এ জিম্মি অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজা জরুরি। তা যদি না হয় পেট ভরে ভাত খাওয়ালেও রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। আমরা চাই না বার বার এ জাতীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক। এক সাগরে রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশের সুনাম দেশের কিছু কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের কারণে ক্ষুণ হোক। আমরা চাই না বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মোসারত জাহান মুনিয়ার মতো আর কোনো মেয়ে অবেলায় ঝরে পড়ুক। আমরা যদি যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হই তাহলে সমাজ থেকে এসব নোংরামি অনেকাংশেই হ্রাস পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

লেখক : শিশুসাহিত্যক ও প্রাবন্ধিক